প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

‘দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সিএফওদের ভূমিকা রয়েছে’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইওর সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিকস কোম্পানি সুপার স্টার গ্রুপের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ও কোম্পানি সচিব মো. শফীকুল আলম এসিএস, এফসিএমএ, এফসিএ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

মো. শফীকুল আলম এসিএস, এফসিএমএ, এফসিএ বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিকস কোম্পানি সুপার স্টার গ্রুপের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ও কোম্পানি সচিব। তিনি ‘সিএফও বিডি’র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অ্যাকাউন্টিংয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পাশাপাশি এলএলবি, চার্টার্ড সেক্রেটারি, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং ও কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টিংয়ে পেশাদারী ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি আইসিএসবি’র অ্যাসোসিয়েট মেম্বার। একইসঙ্গে আইসিএবি ও আইসিএমএবি’র সম্মানিত ফেলো।

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই।

মো. শফীকুল আলম: আমি ৩২ মাসে সিএমএ শেষ করে সানোফি বাংলাদেশে ইন্টার্নশিপ করি। ইন্টার্নশিপ শেষে সিএ পড়ার জন্য ‘এ. কাশেম অ্যান্ড কোং ফার্ম’-এ আর্টিকেলশিপ করি। সেখানে আমি অডিট অ্যান্ড অ্যাসুরেন্স ম্যানেজার হিসেবে কাজ করি। আমি ১৮ মাসে সিএ পাস করেছি। এরপর আইসিএসবি থেকে সিএস পাস করি। আমি শান্তা হোল্ডিংসে ডিজিএম ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে দুই বছর কাজ করে কল্লোল গ্রুপে সিএফও হিসেবে যোগদান করি। সেখানে ৪ বছর কাজ করি। এরপর সুপার স্টার গ্রুপে প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ও কোম্পানি সচিব হিসেবে যোগদান করে তিন বছর দায়িত্ব পালন করে আসছি। চাকরির পাশাপাশি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্ট টাইম ফ্যাকাল্টি হিসেবে ক্লাস নিচ্ছি। ২০০৭ সাল থেকে আইসিএমএবিতে পার্ট টাইম ফ্যাকাল্টি হিসেবে আছি। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা ব্রাঞ্চের কাউন্সিলর ও স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছি। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ-তে গেস্ট স্পিকার হিসেবে ক্লাস নিয়েছি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে ফাইন্যান্সকে কেন বেছে নিলেন?

শফীকুল আলম: ফাইন্যান্স বিভাগ হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের হার্ট। এ বিভাগ ঠিকমতো কাজ না করলে প্রতিষ্ঠান টিকবে না। এ বিভাগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সব সেক্টরে কাজ করা যায়। আমরা জানি, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কিছু রেস্পন্সিবিলিটি সেন্টার আছে। যেমন কস্ট, রেভিনিউ ও প্রফিট সেন্টার। আরও রয়েছে ইনভেস্টমেন্ট সেন্টার। এটি এমন একটি বিভাগ যা সামগ্রিকভাবে করপোরেট সব বিষয়াদি দেখে থাকে। এটি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি মজবুত করতে সাহায্য করে। প্রতিষ্ঠানের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখান থেকে নেওয়া হয়। সামগ্রিকভাবে একটি প্রতিষ্ঠানে এ বিভাগের গুরুত্ব রয়েছে। এ কারণে পেশাটি বেছে নিয়েছি।

শেয়ার বিজ: সুপার স্টার গ্রুপ সম্পর্কে বলুন।

শফীকুল আলম: প্রায় ২৪ বছর আগে যাত্রা শুরু করে এ গ্রুপ। এর স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন বর্তমান এমডি অ্যান্ড সিইও মো. ইব্রাহিম। তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত আছেন। এক সময় তিনি কিছু পণ্যের ডিস্ট্রিবিউটর ছিলেন। এরপর নিজেই পণ্য তৈরির উদ্যোগ নেন। শুরুতে তারা পাঁচ ভাই মিলে স্বল্প পুঁজি নিয়ে ছোট পরিসরে উৎপাদন শুরু করেন। তার হাতে গড়া সেই প্রতিষ্ঠানটিই আজকের সুপার স্টার গ্রুপ। বর্তমানে এখানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ কাজ করছেন। এটি একটি শীর্ষস্থানীয় তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। বৈদ্যুতিক পণ্যের এক নামকরা ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে সুপার স্টার। পরিবার থেকে শুরু করে শিল্প প্রতিষ্ঠান সবখানে আমরা আছি। গ্রাহকরা আমাদের সেবার মানে সন্তুষ্ট। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে নানা কাজ করছে।

শেয়ার বিজ: সুপার স্টার গ্রুপের প্রধান চ্যালেঞ্জ কী?

শফীকুল আলম: নতুন উদ্যোগ প্রতিষ্ঠা করা বেশ চ্যালেঞ্জের। তাছাড়া কম মূল্যের চীনাপণ্যে সয়লাব দেশের বাজার। অথচ এসব পণ্যে শুল্ক বেশি নয়। শুল্ক বাড়ানো হলে স্থানীয় শিল্প রক্ষা করা যাবে। সরকারের নানা পলিসি রয়েছে যেগুলো স্থানীয় উৎপাদনকারীর অনুকূলে নয়। বিশেষ করে ট্যাক্সেশন ও ভ্যাট সিস্টেম স্থানীয় উৎপাদনকারীর জন্য খুব একটা সহায়ক না। ধরুন, আমরা এলইডি পরিবেশবান্ধব বাল্ব তৈরি করছি। এজন্য সরকারের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার আশা করতেই পারি। কিন্তু বাস্তব চিত্র উল্টো। গত বাজেটের আগে দেখা গেছে উৎপাদনকারীর তুলনায় আমদানিকারকের খরচ কম। এ থেকে বোঝা যায়, স্থানীয় শিল্পের উন্নয়নে সরকারের পলিসি কেমন। তবে সরকার স্থানীয় শিল্পের উন্নয়নে বেশ আন্তরিক। কিন্তু কোথায় যেন একটু ত্রুটি রয়েছে। আমি মনে করি, আমাদের মতো যারা দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে, তাদের প্রতি সরকারের মনোযোগ দেওয়া উচিত।

শেয়ার বিজ: ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট (এফআরএ) কোম্পানির ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে?

শফীকুল আলম: এটি একটি আলোচিত বিষয়। একটা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রয়োজন সুশাসন। কোথাও ভুল বা ম্যানিপুলেশন হলে তার দায়ভার কি শুধু অডিটরের? অ্যাকাউন্ট্যান্টসহ যারা রিপোর্ট তৈরি করেছে, তারা দায়ী নন? ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট তৈরির দায়িত্ব সম্পূর্ণ কর্তৃপক্ষের। অডিট রিপোর্টে এটা স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা আছে। কোনো জালিয়াতি আছে কিনা, ভুল আছে কিনা প্রভৃতি দেখেন অডিটর। আমি বিশ্বাস করি, এফআরএ যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানে মালিকপক্ষ ও অ্যাকাউন্ট্যান্টরা জবাবদিহির আওতায় আসবেন। আমি সারাবছর ধরে একটি স্টেটমেন্ট দাঁড় করালাম। সেটা অডিট করবে একটি ফার্ম। প্রশ্ন হচ্ছে, মাত্র এক মাসের মধ্যে ওই ফার্ম কী ভুল বের করবে? তারপরও আমি বলবো, এফআরএ হওয়ার পর আমরা অনেক সচেতন হয়েছি। অনেকে ফিস কম নিয়ে অডিট রিপোর্ট তৈরি করতো, সেগুলো বন্ধ হচ্ছে। তাছাড়া এফআরসি গঠন করা জরুরি। আমি আশা করি এখানে জ্ঞানী, যোগ্য ও সৎ মানুষ আসবেন।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশের ট্যাক্স পলিসিকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

শফীকুল আলম: ব্রিটিশ ট্যাক্স পলিসির আদলে আমাদের পলিসি তৈরি করা হয়েছে। এরপর কিছু পরিবর্তন করা হয়। তবে আরও পরিবর্তন দরকার। অনেক জায়গায় ডাবল ট্যাক্সেশনের সমস্যা রয়েছে। অ্যাক্টটি পরিবর্তন করার জন্য আইসিএমএবি কিছু প্রস্তাব দিয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এক্সিকিউশন। দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ভ্যাট ও কর দেয় না। এনবিআর বা ট্যাক্স সংগ্রাহকরা মূলত বিক্রেতার ভূমিকায় থাকে। আমরা গ্রাহক। জোর জবরদস্তি বা হেনস্থা করে ট্যাক্স আদায় করা যায় না। আস্থার জায়গা তৈরি করে, প্রণোদনা দিয়ে ট্যাক্স কালেক্ট করতে হবে।

শেয়ার বিজ: বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিদেশি সিএ ফার্মের সহযোগিতা নেওয়ার প্রবণতা বেশি কেন?

শফীকুল আলম: বাংলাদেশে বিদেশি অডিট ফার্মগুলো সরাসরি কাজ করতে পারে না। স্থানীয় ফার্মের সাহায্য নিতে হয়। বহুজাতিক কোম্পানি সম্পর্কে আমার অভিযোগ আছে। বহুজাতিক অনেক প্রতিষ্ঠান আমাদের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। এর কারণ কী? এসব প্রতিষ্ঠান বিদেশি ফার্ম দিয়ে অডিট করায়। কেন? দেশে নামকরা অনেক সিএ ফার্ম আছে। যাদের কোয়ালিটি বিশ্বমানের। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতের চেয়েও আমাদের মান ভালো। আমি মনে করি, এসব প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার ব্যাপারে সরকারের আরও কঠোর হওয়া উচিত।

শেয়ার বিজ: সিএফও পেশাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

শফীকুল আলম: একটা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সিএফওর ভূমিকা রয়েছে। ভবিষ্যতে এর নাম পরিবর্তিত হয়ে নতুন নাম হবে সিপিও বা চিফ পারফরম্যান্স অফিসার। তার মানে ফাইন্যান্সের লোকজন যে শুধু হিসাবনিকাশ দেখবেন তা নয়। তারা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন। লভ্যাংশ বাড়ানো ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরিতেও সাহায্য করবেন। এমনকি বোর্ডেও তারা থাকবেন।

শেয়ার বিজ: সিএফও বিডি সম্পর্কে বলুন।

শফীকুল আলম: সিএফও বিডি সিএফও’দের একটি সংগঠন বা প্লাটফর্ম। অ্যাকাউন্টস ও ফাইন্যান্স পেশাজীবীদের পেশাগত মানোন্নয়ন ও তাদের সিএফও হিসেবে গড়ে তুলতে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সিএফওসহ অ্যাকাউন্টস ও ফাইন্যান্স পেশাজীবীদের নিয়ে গঠিত হয় সিএফও বিডি (সিএফও বাংলাদেশ)। ২০১৬ সালের প্রথমদিকে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে এ সংগঠন। সিএফওদেরকে উৎসাহিত করতে এ সংগঠনের পক্ষ থেকে সম্মাননা দেওয়া হয়। সংগঠনটি সরকার, প্রাইভেট ও পাবলিক সেক্টরে নানা ভূমিকা রাখবে।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে একজন সিএফও জন্য বিশেষ চ্যালেঞ্জ কী?

শফীকুল আলম: টাকা প্রদানের বেলায় কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। যেমন রিকুইজিশন তৈরি করা, অনুমোদন নেওয়া প্রভৃতি। কিন্তু এ বিষয়ে স্পন্সর, পরিচালক বা উদ্যোক্তা পরিচালকের খুব একটা ধারণা না থাকাই স্বাভাবিক। তাদের অনেকের মাঝে নিয়ম না মানার প্রবণতাও রয়েছে। এটি একটা চ্যালেঞ্জ। এছাড়া ট্যাক্স, ভ্যাট পলিসি ও কোম্পানি আইনসহ অন্যান্য আইনে ঘাটতি আছে। এগুলোও চ্যালেঞ্জের।

শেয়ার বিজ: যারা পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন কী?

শফীকুল আলম: অনেকে এ পেশায় আসতে চান না। তারা মনে করেন, এ বিষয়ে পড়ালেখা করা বেশ কঠিন। হ্যাঁ, আসলেই কঠিন। বলা হয়, ডাক্তাররা পড়ালেখার পেছনে অনেক সময় দেন। আমরাও একই ধরনের শ্রম দিয়েছি পড়ালেখার পেছনে। এ পেশার ভবিষ্যৎ আছে। পেশাদার আকাউন্ট্যান্টের ভূমিকা অতীতের তুলনায় বেড়েছে। আরও বাড়বে। আমি নতুনদের বলবো, এ পেশায় আসুন। আইসিএমএবি, আইসিএবি, আইসিএসবি থেকে প্রফেশনাল কোর্স করে ক্যারিয়ার গড়ুন।

শেয়ার বিজ: সফল সিএফও হতে আপনার পরামর্শ কী?

শফীকুল আলম: পরিশ্রম করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। জ্ঞানের ক্ষুধা থাকতে হবে। প্রচুর পড়ালেখা করতে হবে। কোর্স শেষ হলেই পড়া শেষ হয় না। সব সময় পড়তে হবে, নিজেকে আপডেট রাখতে হবে। প্রতিষ্ঠানকে আপন মনে করতে হবে। কাজের প্রতি আগ্রহ থাকতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াতে হবে। উপস্থাপনে পটু হতে হবে। পণ্য, সেলস ও মার্কেটিংয়ের কলাকৌশল বুঝতে হবে।