দিনের খবর সারা বাংলা

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যার সুনাম বিদেশেও

পারভীন লুনা, বগুড়া: এক যুগের বেশি সময় ধরে ঐতিহ্যবাহী দইয়ের পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে বগুড়ার চিকন সেমাই। নিকট অতীতে যে সেমাইয়ের কদর ছিল স্বক্সগু রোজগারে মানুষের কাছে, সেই চিকন সেমাই এখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশ বিভূঁইয়ের গর্বিত পরিচয়ে পৌঁছেছে। চিকন সেমাই এখন গ্রামের হাটবাজার থেকে নগরীর শপিংমল হয়ে রাজধানীর পাঁচ তারকাখচিত হোটেলে মেলে। নি¤œবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত- সবার ঘরে বগুড়ার চিকন সেমাই সমান জনপ্রিয়। গেল কয়েক বছর ধরে এই চিকন সেমাই ঈদের ‘গিফটের’ খাতায় নাম লিখিয়েছে।

বগুড়ার গ্রামাঞ্চলের নারীরা বড় পিড়ির ওপর ময়দা মেখে হাতের তালু ডলে বানাতেন এ সেমাই। নিখুঁত হাতের কারুকাজে সেমাই এতটাই চিকন হয়ে উঠতো যে ভাবনাতেও আসত না যে তা হাতে বানানো। গেল শতকের ৮০’র দশকেও কদর ছিল না এই সেমাইয়ের। ঈদের দু-একদিন আগে গ্রামের কৃষান বধূর হাতে তৈরি সেমাই কৃষক ডালায় ভরে কাঁধে তুলে নিয়ে আসতেন শহরে। পসরা নিয়ে বসত পথের ধারে। শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণিও এই সেমাই কিনত না। দিন মজুর, স্বক্সগু আয়ের লোকজনই ছিল এই সেমাইয়ের ক্রেতা। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এ চিকন সেমাই মধ্যবিত্তের ঘরে প্রবেশ করতে থাকে। শহরের কিছু দোকানিও তা তোলে।

একই সময়ে বগুড়ার কালিতলা এলাকার একটি ইঞ্জনিয়ারিং ওয়ার্কশপ দুই মোটরচালিত সেমাই বানানোর যন্ত্র আবিষ্কার করে। দিনে দিনে গ্রাম ও শহরে এই চিকন সেমাই তৈরির বিস্তার ঘটে। চাহিদাও বাড়ে। বগুড়া ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে যায়। চাহিদার প্রয়োজনে সেমাই তৈরির যন্ত্র বড় আকারে বিদ্যুৎচালিত আধুনিকায়ন হয়ে যায়। এরপর চিকন সেমাইকে আর পেছনের ফিরে তাকাতে হয়নি। পরিচিতি ছাড়িয়ে পড়ে সারাদেশে, এমনকি বিদেশেও।

চাহিদার প্রয়োজনে ঈদের প্রায় দুই মাস আগে চিকন সেমাই তৈরির হিড়িক পড়ে। বগুড়ার বেশ কয়েকটি এলাকায় ‘সেমাই পক্সিø’ গড়ে উঠেছে। শহরতলির সাব গ্রাম, বেজোড়া, শ্যাওলাগাতি, কালিসামাটি, ফুলবাড়ি ও ফুলতলা এলাকায় শ্রমিকরা সাহরির পর কাজ শুরু করেন।

একটানা কাজ চলে বিকাল পর্যন্ত। প্রতিটি ছোট কারখানায় প্রতিদিন গড়ে ৫০০ কেজি করে সেমাই তৈরি হয়। প্রতিদিনের উৎপাদন ৬০ থেকে ৮০ টন (৬০ থেকে ৮০ হাজার কেজি)। প্রতি কেজি সেমাই খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়।

গ্রামের চিকন সাদা সেমাই তৈরির কারখানাগুলোয় কাজ করেন প্রায় ছয় থেকে ৭০০ বেশি শ্রমিক। তাদের ৮৫ ভাগই নারী। সংসারে বাড়তি আয়ের আশায় প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সেমাই কারখানার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন ওই গ্রামগুলোর নারী শ্রমিক। প্রতি বছর ঈদুল ফিতর উপলক্ষে পাক্সøা দিয়ে কাজ চলে সেমাই পক্সিøর কারিগরদের। দিনরাত তৈরি করেন সাদা সেমাই।

প্রতি বছর ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রমজানে সাদা সেমাইয়ের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে বলে এ সময় এর উৎপাদনও বেড়ে যায়। কিন্তু গেল বছরের মতো এবারও কভিড-১৯ সংক্রমণ রোধে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংকটময় সময়ে সেমাই উৎপাদনে টান পড়েছে। এতে হাসনা, পারুল, পারভীন, নুরজাহানের মতো অসংখ্যক নারী শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ক্ষতিতে পড়েছেন। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে প্রতি বছর এ সময়টায় পাক্সøা দিয়ে কাজ করতেন সেমাই পক্সিøর নারী কারিগররা। কভিডের প্রভাবে স্বপ্নগুলো যেন তাদের ধরা দেয়নি। তাদের স্বপ্নে কভিড বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেই চাহিদা, সে সঙ্গে ঘুরছে না মেশিনও। আর তাই কভিড পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেমাই সরবরাহ করতে পারছেন না কারখানা মালিকরা। এতে সীমিত আকারে চলছে সেমাই তৈরির কাজ।

রমজানের শুরু থেকেই কভিড সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সারাদেশের মতো বগুড়ার সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গত ১৪ মার্চ থেকে বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক দফায় বাড়িয়ে তা ২৮ মার্চ পর্যন্ত বলবৎ রাখা হলেও ঈদুল ফিতর .সামনে রেখে মানুষের জীবন-জীবিকার কথা চিন্তা করে সরকারের পক্ষ হতে সারাদেশে বেশ কয়েকটি শর্তে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দোকান-পাট ও মার্কেট খোলা রাখার অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন।

শাজাহানপুর উপজেলার নিøিন্তপুর গ্রামের সেমাই কারখানার মালিক রকি ইসলাম ও হোসেন আলী বলেন, সেমাই কারখানাগুলোয় প্রতি বছরের চেয়ে এ বছরের চিত্র ভিন্ন। কভিডের কারণে সেমাই উৎপাদন তুলনামূলক কম। প্রতি বছর যেখানে রমজানের আগে থেকে কারখানায় প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত চলতো কর্ময“ সেখানে চলছে সীমিত পরিসরে। সারাদেশসহ বগুড়ায় লকডাউনের কারণে ঘুরছে না মেশিন, সেমাই তৈরির কাজ চলছে সীমিত আকারে।

তারা বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তে দোকান খোলা রাখার অনুমতি দেয়ার পর নারী শ্রমিকরা আসেন কারখানাগুলোয়। রোজার বেশিরভাগ চলে গেছে। এখন সেমাইপক্সিøর কয়েকটি কারখানা একটু ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। কভিডের আগের ঈদগুলোয় প্রত্যেক কারখানায় গড়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচশত কেজির মতো ময়দা থেকে সাদা সেমাই তৈরি করা হতো, যার পরিমাণ প্রায় ২০ খাঁচি। কিন্তু এবার জেলার বাহিরের মহাজনদের চাহিদা না থাকায় কোনোমতে সচল রাখা হয়েছে কারখানাগুলো।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..