প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সওজের সমীক্ষা প্রতিবেদন: দেশের ৩৭ শতাংশ সড়ক মহাসড়ক ভাঙাচোরা

ইসমাইল আলী: ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থান রয়েছে খানাখন্দ। অথচ এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-রাজশাহী ও অন্যান্য মহাসড়কের অবস্থাও ভালো নয়। এর চেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে আঞ্চলিক মহাসড়ক ও জেলা সড়কগুলো। সব মিলিয়ে দেশের ৩৭ শতাংশ সড়ক-মহাসড়ক ভাঙাচোরা। বাকি সড়কের মধ্যে ২৪ শতাংশ মোটামুটি চলনসই। আর ভালো অবস্থায় রয়েছে ৩৯ শতাংশ সড়ক-মহাসড়ক।

সড়ক-মহাসড়কগুলোর উন্নয়নে কিছু অংশে হালকা বা ভারী মেরামত প্রয়োজন। বাকি সড়ক পুনর্নির্মাণ করতে হবে। সব মিলিয়ে ভাঙাচোরা সড়ক মেরামতে চলতি অর্থবছর ৯ হাজার ১৫৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা প্রয়োজন। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা বিভাগের (এইচডিএম) সর্বশেষ সমীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এসব সড়ক দ্রুত মেরামত করা না গেলে আগামী বর্ষায় জনদুর্ভোগ বাড়বে বলে মনে করছেন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সারা দেশের সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা যাচাইয়ে নিয়মিতই সমীক্ষা পরিচালনা করে সওজের এইচডিএম সার্কেল। এর ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এ হিসেবে সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সড়কের ৪৩ শতাংশ ভাঙাচোরা ছিল। আর ২০১৪ সালে ভাঙাচোরা সড়ক-মহাসড়ক ছিল ৪২ শতাংশ।

প্রসঙ্গত, সওজের অধীনে সারা দেশে ১৯ হাজার ৩৮৭ কিলোমিটার পাকা সড়ক-মহাসড়ক রয়েছে। তবে সমীক্ষা পরিচালনা করা হয় ১৬ হাজার ৬২১ কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়কের ওপর। উন্নয়ন প্রকল্প চলমান থাকায় বাকি সড়ক-মহাসড়ক সমীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। গত বছর চার মাস সড়ক-মহাসড়ক প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ করে এইচডিএম সার্কেল। এর ভিত্তিতেই প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করা হয়।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ১৬ হাজার ৬২১ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ভালো অবস্থায় আছে ৬ হাজার ৫০৯ কিলোমিটার বা ৩৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। ৩ হাজার ৯০৫ কিলোমিটার বা ২৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ সড়ক-মহাসড়ক মোটামুটি চলনসই। আর ৬ হাজার ২০৭ কিলোমিটার বা ৩৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ সড়কের অবস্থা খারাপ বা খুবই খারাপ। এর মধ্যে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোয় তুলনামূলক ভাঙাচোরা কম। জেলা সড়কগুলোর অবস্থা সবচেয়ে খারাপ।

সমীক্ষায় বিবেচিত ৩ হাজার ৬৫৮ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে ১ হাজার ৯৭৭ কিলোমিটার বা ৫৪ শতাংশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। মোটামুটি চলনসই অবস্থায় আছে ২৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ জাতীয় মহাসড়ক। বাকি ২০ দশমিক ৪৪ শতাংশ খানাখন্দ রয়েছে। সওজের ১০টি জোনের জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ঢাকা ও রংপুরের। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা কুমিল্লা ও খুলনায়। এর বাইরে রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, গোপালগঞ্জ ও কুমিল্লা জোনের সড়কের বড় অংশই মোটামুটি ভালো অবস্থায় আছে।

৩ হাজার ৯৪১ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কের মধ্যে ১ হাজার ৬৮৮ কিলোমিটার বা ৪২ দশমিক ৮৫ শতাংশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। আর ২৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ মোটামুটি চলনসই ও ৩০ দশমিক ৭৬ শতাংশ ব্যবহার অনুপযোগী। আঞ্চলিক মহাসড়কের সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছে রংপুর, গোপালগঞ্জ ও বরিশাল জোনে। আর সবচেয়ে খারাপ অবস্থা খুলনা ও রাজশাহী জোনের সড়কের। অন্যান্য জোনে মোটামুটি চলনসই এসব সড়ক।

এদিকে ৯ হাজার ২২ কিলোমিটার জেলা সড়কের ২ হাজার ৮৪৫ কিলোমিটার বা ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। মোটামুটি চলনসই জেলা সড়ক ২১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। আর ৪৭ শতাংশ সড়ক অব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা রংপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা ও কুমিল্লা জোনের।

জানতে চাইলে সওজের প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসান শেয়ার বিজকে বলেন, সওজের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নির্ধারিত সময় পর পর সারা দেশের সব সড়ক-মহাসড়ক পর্যবেক্ষণ করা হয়। এর ভিত্তিতে প্রণীত প্রতিবেদন এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি সড়কগুলো ব্যবহার উপযোগী রাখতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দও চাওয়া হয়েছে। আশা করা যায়, বর্ষার আগে বেশিরভাগ সড়ক ব্যবহার উপযোগী করে তোলা যাবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভাঙাচোরা জাতীয় মহাসড়কগুলোর মধ্যে চলতি অর্থবছর ২ হাজার ১ কিলোমিটার মেরামত করতে হবে। ২৫৫ কিলোমিটার আংশিক ও ১৭৯ কিলোমিটার পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন। একইভাবে আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোর মধ্যে চলতি অর্থবছর ২ হাজার ৪৯ কিলোমিটার মেরামত এবং ১৭৯ কিলোমিটার আংশিক ও ১৫২ কিলোমিটার পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ করতে হবে। এজন্য চলতি অর্থবছর বরাদ্দ প্রয়োজন ৫ হাজার ৮১৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা।

এদিকে চলতি অর্থবছর জেলা সড়কের ২ হাজার ৭৬৮ মেরামত ও বাকিটা পুনর্নির্মাণ করতে হবে। এতে বিনিয়োগ প্রয়োজন ৩ হাজার ৩৩৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন সড়ক-মহাসড়কগুলো ব্যবহার উপযোগী করতে।

শুধু অর্থ ব্যয় করেই সড়ক-মহাসড়কের অবস্থার উন্নতি সম্ভব নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। তিনি বলেন, এদেশে সড়ক-মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণের ধরনটা খুব খারাপ। প্রতি বছর বর্ষার পর রাস্তা সংস্কারে যেতে হয়। পৃথিবীর আর কোথাও এ সংস্কৃতি নেই। সেখানে দশ-বারো বছর পর সংস্কার হয়। তবে দেশে বছর বছর এ খাতে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। কারণ দুটিÑ জলাবদ্ধতা ও ওভারলোডিং। এ দুটোকে বন্ধ করতে হবে। এটা করা খুব সহজ। তা না হলে যতই অর্থ ব্যয় করা হোক কোনো সুফল মিলবে না।