বাণিজ্য সংবাদ

দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে ৬৩ গুণ

যৌথ গবেষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ৬৩ গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর পেছনে বড় প্রভাবকের ভূমিকা পালন করছে চীন, যুক্তরাজ্য, জাপান ও ভারতের মতো বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ-এর সহযোগিতায় মার্কেট ফোর্সেস ও থ্রি ফিফটি’র যৌথ গবেষণা ‘কয়লায় শ্বাসরুদ্ধ: কার্বন বিপর্যয়ের মুখে বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

গত বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন। এছাড়া বাপার সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. আবদুল মতিন, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, বাপার কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও ব্রতীর নির্বাহী প্রধান শারমীন মুরশিদ এবং লিগ্যাল ইকোনমিস্ট এমএস সিদ্দিকী উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্রমবর্ধমান বিদেশি অর্থায়নে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা একটি থেকে বাড়িয়ে ৩০টিতে উন্নীত করা হবে। এতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫২৫ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ৩৩ হাজার ২৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে, যা বায়ুমণ্ডলে বছরে ১১ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন অতিরিক্ত কার্বন-ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ করবে। আর এটি সত্যিকারভাবে একটি কার্বন বিস্ফোরণের ঘটনা, যার জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিকর প্রভাবের ফলে বাংলাদেশের দুর্দশাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব চরম হুমকির মুখে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজনিত বিশ্লেষণ বলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণেই বাংলাদেশ তার স্থলভাগের ১১ শতাংশ হারাবে এবং চার ও পাঁচ মাত্রার ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার ঝুঁকি ১৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেবে, যা উপকূলে বসবাসরত এক কোটি ৫০ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে ফেলবে। তারপরও পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন ২৯টি কয়লানির্ভর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন উপরোল্লিখিত বিপর্যয়কে বাড়িয়ে দেবে বহুগুণ।

বড় আকারের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা মূলত বৈদেশিক ঋণ সহায়তানির্ভর, যেটি সার্বিকভাবে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণভার বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে এবং বৈদেশিক বাণিজ্য ভারসাম্যকে আরও প্রকট করে তুলবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশকে বার্ষিক ২০০ কোটি ডলার মূল্যের ছয় কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন কয়লা আমদানি করতে হবে, যা বাংলাদেশকে কয়েক দশকের জন্য উচ্চমূল্যের কয়লা আমদানির ফাঁদে ফেলে দেবে, যেটি কিনা নতুন অথনৈতিক বিপর্যয়ের শঙ্কাও তৈরি করবে।

বিশ্বে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ সবচেয়ে ক্ষতিকর ও নোংরা জ্বালানি হিসেবে বিবেচিত, যা বিষাক্ত নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার অক্সাইড, পিএম ২.৫, কয়লার ছাই ও এসিড নির্গমনের মাধ্যমে বায়ু ও পানিদূষণে বড় ভূমিকা পালন করে। এছাড়া পারদ, সিসা ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু নির্গমন করে, যা দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে শুরু করে অকাল মৃত্যুরও কারণ। এসব বিবেচনায় এটি পরিবেশের জন্য বিপর্যয়কর একটি পরিকল্পনাও।

ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, এটি সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের জলবায়ু, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। কয়লাভিত্তিক নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আগ্রাসী এই পরিকল্পনা বাংলাদেশকে অসম্মানজনক ও কুখ্যাত একটি ক্লাবের সদস্য করবে, যেখানে মাত্র পাঁচটি দেশকে বিবেচনা করা হয়। দেশগুলো হলো চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক ও ভিয়েতনাম।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন ২৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে বিদেশি অর্থায়ন, যেটি বাংলাদেশকে মাত্র তিন বছরের মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দিক থেকে ১২তম অবস্থান থেকে ষষ্ঠ অবস্থানে উন্নীত করেছে। বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যখন বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করছে, সেখানে বাংলাদেশের কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন মূলত আত্মহননের নামান্তর।

ইউনিসেফ এরই মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে সংঘটিত বন্যা ও সাইক্লোনসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশের এক কোটি ৯০ লাখ শিশুর ভবিষ্যৎ হুমকির সম্মুখীন বলে সতর্ক করেছে। আর এক্ষেত্রে প্রস্তাবিত কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বাংলাদেশকে গভীর সংকটে ফেলে দেবে। বর্তমানে বাংলাদেশে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১৯ হাজার মেগাওয়াট, যার মধ্যে মাত্র তিন শতাংশ কয়লানির্ভর। সে হিসেবে দেশের বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসা ৯০ ভাগ মানুষ উপকৃত হচ্ছে কোনো ধরনের কয়লার আমদানিনির্ভরতা ছাড়াই।

মূলত চীনা ব্যাংক ও কোম্পানি প্রস্তাবিত কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নির্মাণে বড় ভূমিকা পালন করছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর অর্ধেকই অর্থায়ন করছে চীনারা। যুক্তরাজ্য ও জাপান নিজেদের দেশে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনকে উৎসাহিত করলেও বাংলাদেশে প্রত্যেকে তিনটি করে কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে অর্থের জোগান দিচ্ছে। যদিও যুক্তরাজ্য ২০২৫ সালের মধ্যে কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সম্পূর্ণ সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে ভারত বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত সুন্দরবনের অদূরে রামপালে বহুল বিতর্কিত কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এ খাতের ক্রমবর্ধমান বিকাশ অনস্বীকার্য। কিন্তু নিজেদের পায়ে কুঠারাঘাতের মতো কয়লানির্ভর অপরিণামদর্শী বিদ্যুৎ প্রকল্পের আগ্রাসী বিকাশ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বাংলাদেশ আমাদের একটাই! এ দেশের মানুষের জীবন, পরিবেশ ও প্রকৃতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন টেকসই হবে না। কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্প সরকারের জাতীয় অঙ্গীকার, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ও প্যারিস চুক্তির পরিপন্থি। এছাড়া সরকারের অঙ্গীকার আছে ২০২০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে ১০ শতাংশ, অথচ বর্তমানে এ হার চার শতাংশেরও কম। একই সঙ্গে, সরকার অঙ্গীকার করেছিল যে, ২০৫০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে নাবয়নযোগ্য পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। অথচ সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারের দৃশ্যমান কোনো কৌশলগত উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

সর্বশেষ..