দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

দোয়েল গ্রুপের চার কোম্পানি এখন কাগজে-কলমে

পলাশ শরিফ: চার কোম্পানি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ তুলে নিয়েছে দোয়েল গ্রুপ। এরপর ব্যাংকঋণ জালিয়াতির অভিযোগে বিপাকে পড়েছে গ্রুপটি। এর জেরে ব্যবসায়িকভাবে এখনও খারাপ সময় পার করছে দোয়েল গ্রুপ। সম্পদ-অবকাঠামো লিজ দিয়েই চলছে গ্রুপটি। সময়ের সঙ্গে দায়দেনাও বাড়ছে। মূল বাজার থেকে ছিটকে ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে যাওয়ার পর

আয়-লোকসানের তথ্যও প্রকাশ করা হচ্ছে না।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, পুঁজিবাজারে ওটিসি মার্কেটে দোয়েল গ্রুপের কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ লাগেজ, বাংলাদেশ ডায়িং অ্যান্ড ফিনিশিং, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ও বাংলাদেশ জিপার। ২০০৩ সালে লোকসানের মুখে পড়ে ওই কোম্পানিগুলো। প্রায় এক দশক ধরে কাগজে-কলমে লোকসানি দেখানো হলেও ওই চার কোম্পানি দৃশ্যত অস্তিত্বহীন। ব্যবসায় টিকতে না পেরে দোয়েল গ্রুপ ওই কোম্পানিগুলোর জমি-অবকাঠামো অন্য পোশাক উৎপাদনকারী কোম্পানির কাছে লিজ-ভাড়া ভিত্তিতে দিয়েছে। ২০০৯ সালে সর্বশেষ এজিএম ও আর্থিক তথ্য প্রকাশের পর ওটিসির ওই চার কোম্পানি কাগুজে কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে।

এদিকে লোকসানি ও অস্তিত্ব হারাতে বসা দোয়েল গ্রুপের চার কোম্পানির দায়দেনাও বাড়ছে। ২০১৪ সালে সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যমতে, প্রায় ২০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের বিপরীতে বাংলাদেশ লাগেজের দায়দেনা ৩৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। একইভাবে আট কোটি ৮০ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানি বাংলাদেশ জিপারের দায়দেনা ১৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা, ১১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানি বাংলাদেশ কেমিক্যালের দায়দেনা ১১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা এবং ১২ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানি বাংলাদেশ ডায়িংয়ের প্রায় ৩৪ লাখ টাকা দায়দেনা রয়েছে। তবে সময়মতো পরিশোধ না করায় সময়ের সঙ্গে ওই দায়দেনাও বেড়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন নিরীক্ষিত-অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করায় দোয়েল গ্রুপের ওই চার কোম্পানির দায়দেনা সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য মিলছে না।

দোয়েল গ্রুপের কর্ণধার অশোক কেজরিওয়াল শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমি এ মুহূর্তে দেশের বাইরে আছি। কথা বলার সুযোগ নেই। আগামী মাসের শুরুতে ফিরতে পারি; তারপর এসব বিষয়ে আলোচনা করা যাবে।’

ডিএসই’র ওয়েবসাইটে দোয়েল গ্রুপের চার কোম্পানিটির নিবন্ধিত ঠিকানা হিসেবে সাভারের ৯/১ কর্ণপাড়ার দোয়েল কমপ্লেক্সকে দেখানো হয়েছে। অথচ ২০১৫ সালে ওই কমপ্লেক্সটিতে এখন আরমানা গ্রুপের ডেনিটেক্স লিমিটেড নামের একটি পোশাক রপ্তানিকারী কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। দোয়েল কমপ্লেক্সটি আরমানা গ্রুপ কয়েক বছর আগে ‘কিনে নিয়েছে’ বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। যদিও ‘লিজ নেওয়া হয়েছে’ বলে দাবি করছে আরমানা গ্রুপ। ওই কমপ্লেক্সে এক সময় বাংলাদেশ লাগেজের কার্যক্রম ছিল।

দোয়েল কমপ্লেক্স লিজ-ভাড়া প্রসঙ্গে আরমানা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকারিয়া তাহের সুমন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘দোয়েল গ্রুপের কাছ থেকে দোয়েল কমপ্লেক্সটি ২০১৫ সালে লিজ নেওয়া হয়েছে। এরপর থেকেই এখানে ডেনিটেক্সের কার্যক্রম চলছে। আমরা নিয়ম-কানুন মেনেই মালিকদের কাছ থেকে এ কমপ্লেক্স লিজ নিয়েছি।’

তথ্যমতে, ওটিসি মার্কেটে কোম্পানিগুলোর ১০০ টাকা অভিহিত মূল্যের বিপরীতে প্রতিটি কাগুজে শেয়ারের বর্তমান বাজারদর গড়ে ১৭ টাকা ৩১ পয়সা। লোকসান, অস্তিত্ব হারাতে বসা ও আয়-লোকসানের তথ্য না পাওয়ায় দোয়েল গ্রুপের ওই চার কোম্পানি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ অনেক কম। বছরে দু’একটি কোম্পানির দু-তিনশ শেয়ার লেনদেন হচ্ছে। এর জেরে শেয়ারদরও তলানিতে রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাভারের কর্ণপাড়ায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে দোয়েল গ্রুপের বাংলাদেশ ডায়িং ও বাংলাদেশ জিপারের চারতলা ভবনের সন্ধান মিলেছে। ওই ভবনটি অন্য কোম্পানির কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। সেখানে একটি ডায়িং কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। সেখানেও দোয়েল গ্রুপের কোনো কার্যালয় বা অস্তিত্ব মেলেনি। তবে সেখানকার দায়িত্বশীলরা এ প্রতিবেদকের পরিচয় পাওয়ার পর কোনো বিষয়েই কথা বলতে চাননি। ওই ভবনের পাশে দেয়াল ঘেরা প্রায় একটি জমিতে দোয়েল গ্রুপের কর্ণধার অশোক কেজরিওয়াল ও তার পরিবারের সদস্যদের মালিকানার তথ্য সংবলিত সাইনবোর্ড ঝুলছে। ওই জমিতে পরিত্যক্ত ঘরের বাসিন্দা দুই স্বামী-স্ত্রী জমির দেখভাল করেন। ‘মাঝে মাঝে মালিকের ছেলেরা আসেন’ বলে জানালেও ওই প্রবীণ দম্পত্তি মালিকদের কারও নাম-ঠিকানা জানাতে পারেননি। তাই চার কোম্পানির মধ্যে ‘বাংলাদেশ ডায়িং’ ও ‘বাংলাদেশ জিপার’ ওই ভবনের গায়ে নীল রঙে লেখা নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর পরিত্যক্ত জমিটি গ্রুপের অপর কোম্পানি বাংলাদেশ কেমিক্যালের।

ডিএসই’র তথ্যমতে, বাংলাদেশ লাগেজের ২০ লাখ শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের কাছে ৫০ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছে ২৬ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর কাছে ২৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। বাংলাদেশ ডায়িংয়ের ১২ লাখ শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের কাছে ৪০ শতাংশ, সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছে ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর কাছে ৪০ দশমিক ৮৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। বাংলাদেশ কেমিক্যালের ১১ লাখ ৭৫ হাজার শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের কাছে ৪৩ দশমিক শূন্য চার শতাংশ, সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছে ২৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর কাছে ৩০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। গ্রুপের অপর কোম্পানি বাংলাদেশ জিপারের আট লাখ ৮০ হাজার শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে ৪০ শতাংশ, সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছে ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর কাছে ৪০ দশমিক ৮৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..