প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাশ্রয়ী হতে হবে

রোকাইয়া আক্তার তিথি: দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। জনসাধারণ। সীমিত আয়ের লোকের কাছে এ যেন এক নতুন ভোগান্তি। প্রতিনিয়ত নিয়ম মেনে না মেনে যেন বাড়ছে এই মূল্যবৃদ্ধি। মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবীদের নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যে পূরণ করতে হচ্ছে চাহিদা। সুযোগ নেই বাড়তি চাহিদা পূরণের। খাদ্যদ্রব্যের পাশাপাশি মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রসাধনী সামগ্রীর, যাতায়াত ভাড়া ও বাসা ভাড়া। সাবান, শ্যাম্পু ও ডিটারজেন্ট থেকে শুরু করে মূল্য বেড়েছে খাতা, কলম ও পেন্সিলেরও। যাতায়াত ভাড়া বেড়েছে সমান তালে। বছর ঘুরলে বৃদ্ধি পায় বাসা ভাড়া। সরকারি বেসরকারি সেবার দাম ও বাড়ছে। কিন্তু বৃদ্ধি পাচ্ছে না মানুষের আয়-রোজগার। এ যেন এক ভয়ঙ্কর মূল্যস্ফীতির কারণ, যা দুর্বিষহ করে তুলেছে সাধারণের জীবনযাত্রা।

জিনিসপত্রের দাম বাড়লে সরকারি হিসাবে তা মূল্যস্ফীতি দিয়ে প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির হিসাব করে। দেশে গত এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা জুলাইয়ে এসে আবার বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি হিসাব বলছে, দেশের মূল্যস্ফীতির হার এখন ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যা ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম, যা বেশি থাকা যৌক্তিক।

গত দুই বছরে কভিড মহামারির প্রবল দাপটে সাধারণ মানুষ নিঃস্ব হয়ে গেছে। আয়রোজগার হারিয়ে চূড়ান্ত অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। এরই মধ্যে কয়েক মাস ধরে চাল, ডাল, গম, তেল, ময়দা, লবণসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের পাশাপাশি খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যের দামও বেড়েছে। যেমন-পোশাক, খাতা-কলম, বাসা ভাড়া, যাতায়াত ভাড়া। বিশেষ করে গত নভেম্বর মাসে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির পরপরই জীবনযাত্রার খরচ বাড়তে শুরু করে। আবার গত বছরের মাঝামাঝি থেকে আন্তর্জাতিক বাজারেও ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া ইউক্রেন যুদ্ধ আন্তর্জাতিক পণ্যের বাজারকে আরেক দফা উসকে দেয়। কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়েই ছোট-বড় সব দেশেই মূল্যস্ফীতি হচ্ছে। বাংলাদেশও এর প্রভাব লক্ষণীয়। যাতায়াত ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণ ভাড়া। সিএনজিচালিত থ্রিহুইলারে মিটার হিসেবে ভাড়ার ব্যবহার বন্ধ হয়েছে অনেক আগেই, তাই নিশ্চুপভাবে দিতে হচ্ছে চালকদের অতিরিক্ত প্রয়োজনীয় ভাড়া। নিত্যপণ্য ক্রয়ের জন্য তাদেরও বাড়াতে হয়েছে পূর্ববর্তী ভাড়া। এর সঙ্গে গত দুই সপ্তাহে বেড়েছে ৫৩টি ব্র্যান্ডের ওষুধের দাম।

একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পরামর্শে গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহনের মতো সেবা সার্ভিসের মূল্য দফায় দফায় বেয়ে যাওয়ায় বিপাকে সাধারণ মানুষ। দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানরত ব্যক্তিদের কাছে এটি এখন অভিশাপস্বরূপ। এরই মধ্যেই ফের বাড়ছে ঢাকা ওয়াসার পানির দাম। ঢাকা ওয়াসা গত বছরের সর্বশেষ ২৫ মে পানির দাম ৫ শতাংশ বাড়ায়। ঢাকা ওয়াসার পানি ব্যবহারের জন্য আগামী সেপ্টেম্বর থেকে আরও ৫ শতাংশ খরচ বাড়তে যাচ্ছে। ৭ জুলাই ঢাকা ওয়াসার ২৯৩তম বোর্ডসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। এ নিয়ে গত ১৪ বছরে ১৫ বার বাড়ানো হলো পানির দাম। জনসাধারণের এমন দুর্ভোগে নীরব কান্না ছাড়া কোনো অবকাশ নেই।

অর্থনীতির সূত্রমতে, উৎপাদন ব্যয় ছাড়াও জিনিসপত্রের দাম বাজারের চাহিদা জোগানের ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মূলে বহুবিধ কারণ রয়েছে, স্বার্থপরতা অসাধু সমাজবিরোধী তৎপরতা অর্থবহি মানুষের অমানবিক আচরণ। এছাড়া প্রাকৃতিক কারণে, অর্থাৎ অনাবৃষ্টি, অতি বৃষ্টির কারণে জমিতে আশানুরূপ ফসল উৎপাদিত না হলে দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়ে যায়। আবার কৃষি ও শিল্প-কারখানাগুলোর উৎপাদনের সীমাবদ্ধ এবং বিদেশি মুদ্রার অভাবে পণ্যদ্রব্য চাহিদা পরিমাণ আমদানি করা সম্ভব না হলে চোরাকারবারি, মজুতদারি ও দুর্নীতিপরায়ণ ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ গ্রহণ করে। তারা জিনিসের কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করে। ফলে দ্রব্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট তৎপরতার ফলে ভুগতে হয় সীমিত ও নি¤œ আয়ের চাকরিজীবী-শ্রমজীবী মানুষকে।

জনসাধারণের এমন দুর্ভোগের জন্য সরকার রাষ্ট্রীয় বিপণন সংস্থা টিসিবির মাধমে পণ্য সরবরাহ করা চালু করেছে। যাতে অতিরিক্ত মূল্যের থেকে কম মূল্য জনগণ তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সংগ্রহ করতে পারেন। তৃণমূল পর্যায় সরকার মানুষের জন্য এক কোটি কার্ডের ব্যবস্থা করেছেন। এই কার্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবি থেকে তেল, চিনি, পেঁয়াজসহ কয়েকটি পণ্য ন্যায্য মূল্যে কিনতে পারবে।

পণ্য মূল্য নির্ধারণে যথাযথ আইন প্রণয়ন করতে হবে ও তা প্রয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। টিসিবিকে আরও শক্তিশালীভাবে ভূমিকা রাখতে হবে। নিয়মবহির্ভূতভাবে কেউ কেনাবেচা করলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সিন্ডিকেটযুক্ত ব্যবসায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। সার্বিকভাবে প্রশাসনের তৎপরতা জরুরি। মূল্যস্ফীতির এই করাল গ্রাস থেকে নিস্তার পেতে সঞ্চয়ী হতে হবে সাধারণ জনগণকে। সর্বসাধারণে এই সংকট মোকাবিলায় সঞ্চয়ী হওয়া ছাড়া উপায়ন্তর নেই। জনগণকে এ সময়ে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিত্য প্রয়োজনে পণ্য ক্রয় করা উচিত। যেসব দ্রব্য না কিনলে দৈনিক জীবনযাত্রা ব্যাহত ঘটে সেসব বস্তু অতিপ্রয়োজনীয় তালিকায় রেখে কেনা উচিত। অতি প্রয়োজনীয় সামগ্রীগুলোর পরে যেসব সামগ্রী না কিনলে জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটবে না কিন্তু দরকার সেগুলো প্রয়োজনীয় তালিকায় রেখে কেনা দরকার। এভাবে নিত্যসামগ্রীর প্রয়োজনীয়তা বিচার বিবেচনায় রেখে সংকট মোকাবিলায় সঞ্চয়ী হতে হবে। ব্যবসায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও জনগণের সার্বিক সহযোগিতায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সর্বোপরি সবাইকে তৎপর হতে হবে এই মূল্যস্ফীতি সংকটে। 

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়