দিনের খবর সুশিক্ষা

দ্রুত নিজ দেশে ফিরতে চান ইবির বিদেশি শিক্ষার্থীরা

অনি আতিকুর রহমান, ইবি: কভিড মহামারির কারণে একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশি শিক্ষার্থীরা। থিসিস পেপার জমা, ভাইভা, মানোন্নয়ন পরীক্ষা কিংবা রেজাল্ট প্রকাশের মতো সীমিত কিছু একাডেমিক জটিলতার কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাদের দেশে ফেরা। ফলে ক্লাস-পরীক্ষা না থাকলেও ক্যাম্পাসে অলস সময় পার করতে হচ্ছে তাদের। এতে নিজেরা যেমন পড়েছেন অর্থনৈতিক সংকটে, তেমনি মহামারিকালে সন্তানদের বিদেশে রেখে দুশ্চিন্তায় তাদের পরিবারের সদস্যরাও। এ অবস্থায় বাকি থাকা একাডেমিক কাজ শেষ করে দ্রুত দেশে ফিরতে চান এসব শিক্ষার্থী।

ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, করোনা মহামারির প্রকোপ মোকাবিলায় গত মার্চ থেকে দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বন্ধ রয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ও। একাডেমিক কার্যক্রম ও আবাসিক হলগুলো বন্ধের ফলে দেশীয় শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ছেড়েছে আগেই। তবে প্রায় আট মাস ধরে ক্যাম্পাসে অলস সময় পার করছেন বিদেশি শিক্ষার্থীরা। তবে ক্যাম্পাসে অবস্থান করলেও স্বাস্থ্যকর খাবার, সুচিকিৎসা, যানবাহন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি তাদের।

তাদের কেউ কেউ এক-দেড় বছরমেয়াদি কোর্স করতে এসে ক্যাম্পাসে পার করেছে দুই থেকে আড়াই বছর। তবুও কবে নাগাদ পাঠ চুকিয়ে দেশে ফিরবেন সে নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না তারা। ইতোমধ্যে ভিসার মেয়াদও শেষ হয়েছে কারও কারও। শুরু হয়েছে ভিসা ও আইনি জটিলতা। এছাড়া তৈরি হয়ে অর্থনৈতিক সংকটও।

সোমালিয়া থেকে আসা ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্রী আয়ান মুহামেদ হাসান বলেন, ‘দেড় বছরের কোর্স; ইতোমধ্যে পার হয়েছে আড়াই বছর। কভিড শুরুর আগেই আমি আমার একাডেমিক কার্যাবলি শেষ করেছি। শুধু থিসিস পেপারটি সাবমিট বাকি। এখন পুরো ক্যাম্পাসে আমি একা একটি মেয়ে। বুঝতেই পারছেন কেমন আছি। দেশে বাবা-মা ভীষণ উদ্বিগ্ন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করবÑআমাদের সমস্যাটি দ্রুত সমাধান করে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করুন।’

বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী হামসি মুসা বারুত বলেন, ‘রেজাল্ট এবং সার্টিফিকেটের জন্য প্রায় দেড় বছর ধরে অপেক্ষা করছি। করোনাভাইরাস এখনও চলমান। আমরা জানি না কখন এটা শেষ হবে। পরিবার-স্বজনরা আমাদের নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। তারা ফোন করে জানতে চায়, কোথায় আছি; এতদিন কেন ফিরছি না? প্রচণ্ড মানসিক চাপে আছি। আমরা এ পরিস্থিতি সহ্য করতে পারছি না। ভিসি স্যারকে অনুরোধ জানাইÑ প্লিজ! আমাদের সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিন।’

আর কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মুহামেদ বশির বলেন, ‘মার্চ থেকে আমাদের ক্যাম্পাস বন্ধ। আমরাও সেই থেকে বসে আছি। এখানে আমরা অর্থনৈতিকসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। অনেকের পরিবার আর্থিক সাপোর্ট দিতে হিমশিম খাচ্ছে। ইতোমধ্যে আমাদের অন্যান্য ফরেন বন্ধুরা দেশে ফিরেছে। বাংলাদেশ সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানাই আমাদের সমস্যাটি দেখার জন্য।’

সূত্রমতে, বর্তমানে ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, সোমালিয়া, নাইজেরিয়াসহ ছয়টি দেশের প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আছেন। এদের মধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশের শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে দেশে ফিরে গেছেন। তবে বিমান ভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচ বেশি হওয়ার কারণে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে আসা সোমালিয়ান শিক্ষার্থীরা পড়েছেন বিপাকে।

বাংলাদেশে আটকেপড়া এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে অনেকেই শুধু থিসিস পেপার জমাদান, ভাইভা, মানোন্নয়ন পরীক্ষা কিংবা রেজাল্টের জন্য অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দপ্তর খোলা থাকলেও ছোট এসব সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। যদিও দেশের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় তাদের জরুরি একাডেমিক সেবা দিতে ইউজিসির অনুমোদন পেয়েছে।

জানা গেছে, এসব শিক্ষার্থীর অনেকেই ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে বর্ষে ভর্তি হয়েছেন। সে হিসেবে তারা পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে মধ্যেই একাডেমিক কার্যক্রম শেষ করে দেশে ফেরার কথা। কিন্তু ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ চলে এলেও তাদের কোর্স সম্পন্ন হয়নি। এদিকে বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে এমন জটিলতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক পরমিণ্ডলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ইমেজ সংকটে পড়বে বলে মনে করেন সচেতন শিক্ষকরা।

ইবি’র ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স ডিভিশনের সদস্য সচিব সাদত হোসেন বলেন, ‘মাস্টার্সের ছয়জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের কিছু সমস্যার কারণে তারা যেতে পারছে না। কেউ হয়তো রেজাল্টের অপেক্ষায় আছে, কেউ ভাইভা দেবে। তাদের সহযোগিতা করার জন্য আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেষ্টা করছি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) এসএম আবদুল লতিফ বলেন, ‘আমরা ইউজিসি থেকে একটা চিঠি পেয়েছি; তাতে ভাইভা বা অন্যান্য পরীক্ষা অনলাইনে নেওয়া যাবে এমনটি আশ্বাস পেয়েছি। ইতোমধ্যে ফরেন স্টুডেন্টদের নিয়ে সংশ্লিষ্ট সেল উপাচার্যের সঙ্গে মিটিংও করেছেন। সেখানে দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে শেষ করা যায়; সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, ‘বিষয়টি আমরা অবগত। অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষার বিষয়ে ইউজিসি একটা চিঠি পাঠিয়েছে। সে আলোকে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..