সম্পাদকীয়

দ্রুত বাড়ছে বিদেশি ঋণ সতর্কতা প্রয়োজন এখনই

গত এক দশকে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গৃহীত দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে সোয়া দুই গুণ ও প্রায় নয় গুণ; এটা সুদের ব্যয় তিনগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। এ পরিস্থিতি শঙ্কাজনক হয় না, যদি রিজার্ভ ও বিদেশি ঋণের অনুপাতে ভারসাম্য থাকে। কিন্তু সময়ের বিবেচনায় এসব বড় প্রকল্পগুলো ব্যয়বহুল কম লাভজনক, আবার রিজার্ভ ও বিদেশি ঋণের অনুপাত বাড়িয়ে তুলতে প্রত্যক্ষ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এমন পরিস্থিতিতে চলমান আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সময়ের দাবি অনুযায়ী বিবেচনাপ্রসূত প্রকল্পে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে সরকারকে এখনই সতর্ক হওয়া উচিত বলে মনে করি। নচেৎ দেশীয় রিজার্ভ কঠিন সংকটে পড়তে পারে।
দ্বিগুণ ঋণে তিনগুণ সুদ বেড়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে সুদের উচ্চহার ও কঠিন শর্ত। অথচ পৃথিবীর সফল দেশগুলো পরিমাণে বেশি কিন্তু কম সুদে বড় প্রকল্পে ঋণ নিয়ে থাকে। বিপরীতে আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের অনেকগুলো রাষ্ট্র চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ ফাঁদে পা দিয়ে অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে যেভাবে ঋণগ্রস্ত হয়েছে, তাতে চীনের ভূ-রাজনৈতিক আকক্সক্ষা পূরণে রাষ্ট্রগুলো কীভাবে আত্মসমর্পণ করবে, তা দেখার বিষয়। জিবুতি, মালদ্বীপ, মঙ্গোলিয়া, লাওস, মন্টেনেগ্রো, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তানই শেষ নয়, বরং শ্রীলঙ্কার করুণ পরিণতি বিশ্লেষণের পরে দেখা যাচ্ছে রেল-প্রকল্প ও ইকোনমিক করিডর চুক্তি থেকে মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্র এখন ফাঁদ এড়িয়ে চলার চেষ্টা চালাচ্ছে। কেবল চীন নয়, বিশ্বজুড়ে স্বার্থ ও কর্তৃত্বই যেখানে পররাষ্ট্রনীতির মুখ্য বিষয়, সেখানে যে কোনো রাষ্ট্র বা সংস্থা ঋণ দিয়ে তার সুদ-আসলে কর্তৃত্ব উসুল করতে চাইবে। ভারত, চীন ও রাশিয়ার মতো কর্তৃত্ববাদী তিনটি রাষ্ট্র থেকেই আমাদের এই দ্বিপক্ষীয় ঋণ আসছে। এই দশকে বাংলাদেশে দাতা সংস্থার ঋণ কমে দ্বিপক্ষীয় ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ শতাংশে। আবার রিজার্ভ ও বিদেশি ঋণের অনুপাত ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ শতাংশ। গতকালের দৈনিক শেয়ার বিজ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিশেষজ্ঞজনরা রূপপুর পরমাণু প্রকল্পের মতো এমন অনেক প্রকল্পকে খরচের তুলনায় কম আয়ের প্রকল্প বলে আশঙ্কা করছে। পরিস্থিতি এভাবে চললে ঋণ করে ঘি খাওয়ার মতো অপরিণামদর্শিতা হতে পারে। তাছাড়া এসব প্রকল্পে আমদানি ব্যয় বেড়ে বাণিজ্য ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে, সেবা খাতে ঘাটতিও বেড়েছে। এভাবে রিজার্ভে চাপ পড়লে চলতি হিসাব স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে নানামুখী ঋণ করতে হবে। তাই সরকারকে অবশ্যই বেশি লাভজনক খাতে ঋণ গ্রহণে কৌশলী ও সতর্ক হওয়া উচিত হবে।

সর্বশেষ..