দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ধরা পড়ছে চমক লাগানো বাহুল্য ব্যয়

খরচ কমাতে উদ্যোগী ব্যাংক

শেখ আবু তালেব: বেসরকারি একটি ব্যাংকের বনানী শাখা চালুর সময়ে তিন তলার একটি ভবন ভাড়া নেওয়া হয়। কিন্তু সময়ের আলোকে শাখাটির ব্যাংকিং কার্যক্রম ততটা বাড়েনি। ফলে বৃহৎ অংশটুকুই অব্যবহৃত থাকে। তাই খরচ কমাতে শাখাটি ভবন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। শুধু এ শাখাটি সরিয়ে নেওয়ায় ব্যাংকটির ভাড়া বাবদ বছরে এক কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।

আরেকটি ব্যাংক ঢাকাসহ সারা দেশের ভাড়া অফিসে থাকা শাখাগুলোর ভবন মালিকদের চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, করোনাকালে ব্যাংকের আয় কমে গেছে। এমন অবস্থায় বিদ্যমান ভাড়া পরিশোধ সম্ভব নয়। ৪০ শতাংশ ভাড়া না কমালে শাখা সরিয়ে আনা হবে। কাজও হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাড়া কমিয়ে নতুন চুক্তির কার্যক্রম শুরু করেছে ব্যাংকটি। এভাবে ব্যাংকটির তার অফিস ভাড়া গড়ে ৩০ শতাংশ কমিয়ে এনেছে। প্রাথমিক হিসাবে এভাবে বছর শেষে ব্যাংকটি ১০ কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারবে। একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছে ব্যাংকের এটিএম বুথের বেলায়ও।

পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনতে বাহুল্য ব্যয়ের এমন চমক লাগানো ঘটনা বেরিয়ে আসছে ব্যাংক খাতে। জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকা হিসেবে বিবেচিত গুলশান, উত্তরা, ধানমন্ডি, বনানীতে অবস্থিত শাখা পরিচালনায় অস্বাভাবিক ব্যয় ধরা পড়েছে। বিশেষ করে অফিস ভাড়া, অতিথি আপ্যায়ন, মিটিং বিলে ধরা পড়ছে অস্বাভাবিক ব্যয়। পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনতে এসব খরচে লাগাম টানা শুরু করেছে ব্যাংকগুলো।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে এমন তথ্য। করোনাকালে এক সময়ে ব্যাংকিং কার্যক্রম কিছুটা সংকুচিত হলেও এখন পুরোদমে চলছে। কিš আয়ের প্রধান উৎস বিনিয়োগ কার্যক্রম স্বাভাবিক পর্যায়ে আসেনি। কিছু ব্যাংকের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ফিরেছে। আবার আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রাহকরা ঋণ ফেরত না দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এতে কমেছে ব্যাংকের আয়।

এমন অবস্থায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ শুরু থেকেই ব্যয় কমিয়ে আনার জন্য উদ্যোগী হয়। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কর্মীদের বেতন কমিয়ে আনে কয়েকটি ব্যাংক। কিন্তু সমালোচনায় সে পথে হাঁটেনি সব ব্যাংক। সর্বশেষ পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনতে নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

নির্দেশনার পরই উদ্যোগী হয় ব্যাংকগুলো। এ বিষয়ে বেসরকারি খাতের একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘প্রতিটি ব্যাংকই নিজ নিজ প্রেক্ষাপটে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিচ্ছে। আমার ব্যাংকও তাই করেছে। আমি পরিচালনা পর্ষদকে রাজি করিয়েছি বাহুল্য ব্যয় কমিয়ে আনতে। কর্মীদের বেতনে যেন হাত দিতে না হয়, সে জন্য অন্যান্য ব্যয় কমিয়ে আনা হচ্ছে। বিশেষ করে গাড়ি ও জ্বালানি খাতের ব্যয় কমিয়ে আনছে প্রায় সব ব্যাংকই। করোনাকালে আপ্যায়নে রাজি হন না কেউ, তাই এ খাতেরও ব্যয় কমে গেছে।’

যদিও কয়েকটি ব্যাংক কর্মীদের বার্ষিক ইনসেনটিভ (প্রণোদনা) বোনাস দেয়নি এ বছর। আগামী বছরেও দেওয়ার বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত পাননি কর্মীরা। জানা গেছে, ঢাকা শহরের শাখাগুলোতে একটি ব্যাংকের বার্ষিক সুপেয় পানির বিল দিতে হয় ৭০ লাখ টাকার। এটিও নিতে হয় ব্যাংকের এক পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে। কিন্তু করোনার দোহাই দিয়ে এবার বাদ দেওয়া হয়েছে পানির জার নেওয়া। এভাবে আরেকটি ব্যাংক সব শাখায় ভাড়ায় নেওয়া টবে সংরক্ষিত গাছ নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে অনেক ব্যাংকই শাখায় টবে লাগানো গাছ ব্যবহার করে। নার্সারি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর তা বদলে দিয়ে থাকে। এতে শাখায় নিত্যনতুন গাছের সমারোহ দেখা যায়। এতেও ব্যয় হয় প্রচুর। এখন সেবাটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

অন্য একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, করোনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। এজন্য আগামী বছরের জন্য ক্যালেন্ডার ছাপানোর পরিমাণ কমিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়া জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ব্যাংকের চিঠি পাঠানো বন্ধ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ কাজে মেইল করা হচ্ছে। এতে কুরিয়ার সার্ভিস বাবদ ব্যয় কমে যাচ্ছে।

জানা গেছে, কোনো কোনো ব্যাংক ব্যয় সাশ্রয়ে কর্মকর্তাদের পরিবহন ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। শাখা পর্যায়ে ভ্রমণ বাতিল করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। শুধু নিরীক্ষা কার্যক্রমে জড়িতরা শাখা অফিসে যাচ্ছেন। কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় সফর, বিদেশে ভ্রমণ, ট্রেনিং, বিজনেস ডেভেলপমেন্টের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠানের আয়োজন, বড় ধরনের সামষ্টিক ভোজ ইত্যাদি এড়িয়ে চলছে অধিকাংশ ব্যাংকই। কমিয়ে আনা হচ্ছে অফিসের জৌলুস ব্যয়।

পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনার এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে আনতে পারলে ব্যাংকেরই লাভ। এতে কর্মীদের বেতন কামানো লাগবে না। শেয়ারহোল্ডাররাও উপকৃত হবেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..