মত-বিশ্লেষণ

ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা কিশোর গ্যাং কালচার রোধে সহায়ক

ইয়াসমীন রীমা:আজও কোচিং ক্লাস থেকে দেরি করে ফিরেছে বাবু। এই নিয়ে এ মাসে ১০ দিন হলো বাবু দেরিতে ফিরল। পাশের ফ্ল্যাটের পলাশও তার সঙ্গে একই কোচিং ক্লাসে যায়; সে তো দেরি করে না। সময়মতো কোচিংয়ে যায় আবার ঠিক সময়ে ফিরে আসে। বাবুর এমন কী কাজ যে, পথে সে প্রায়ই দেরি করে ফেরে। তাছাড়া আজকাল বাবুর পড়াশোনায়ও তেমন মন নেই। স্কুলেও নিয়মিত যাচ্ছে না। শারীরিক কোনো না কোনো অজুহাত দেখিয়ে স্কুলে না গিয়ে কাউকে কিছু না বলে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। কিছু জিজ্ঞাসা করলে রেগে যায়। বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি পর্যন্ত দেয়। ঘরের কারও সঙ্গে তেমন কথাও বলে না। অথচ কিছুদিন আগেও ছোট দুই বোনদের সঙ্গে খুনসুটি করত। মোবাইল গেমস, টিভি দেখা প্রভৃতি নিয়ে মেতে থাকত। বিকালে ফ্ল্যাট-বাড়ির চত্বরে বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলায় ব্যস্ত থাকত। অথচ কেমন যেন বদলে যাচ্ছে বাবু।

বাবুর বাবা ইকবাল হাসান ঠিকাদার ও মা মনোয়ারা কুলসুম রীতিমতো দুশ্চিন্তায় পড়েছেন একমাত্র ছেলেকে নিয়ে। কেন তার এই অধঃপতন। কিছুদিন আগে তার পড়ার টেবিল গোছাতে গিয়ে মা কুলসুম ড্রয়ারে একটি ধারালো চাকু পেয়েছেন। চাকুটা দেশীয় নয়। এ ব্যাপারে বাবুকে জিজ্ঞাসা করলে সে জানিয়েছে, এটা ‘বুজালি’ অর্থাৎ নেপালি চাকু। তার বন্ধুর মামা তাকে উপহার দিয়েছে। তাৎক্ষণিক কথাটা বিশ্বাস করলেও বাবুর মা এই নিয়ে বেশ ভাবনার মধ্যে রয়েছেন। ওদিকে বাসার পাশের দোকানগুলোয় কী সব আলোচনা হচ্ছে। ইকবাল ঠিকাদারের ছেলে গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। বাবুর বাবা ‘বাচ্চা ছেলে’ বলে বিষয়টা উড়িয়ে দিয়েছেন। কয়েকদিন আগে কয়েকটি ছেলে বাসায় এসেছিল, তাদের পরিচয় জানাতে চাইলে কেউ পরিচয় দেয়নি। বাবু আমাদের  চেনে বলে চলে যায়। বাবুর মা জানে ব্যাপারটা সহজ নয়। তার ছেলে কোনো নষ্টচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। প্রতি রাতে অনিন্দ্রা তাকে গ্রাস করছে। এভাবে আর কতদিন। এর একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। বাবুকে ফেরাতে হবে এই ভয়ঙ্কর পথ থেকে।

ইদানীং সারা দেশেই তৈরি হয়েছে কিশোর গ্যাং নামে তথাকথিত ভয়ঙ্কর একটি গ্যাং কালচার। কিশোর গ্যাংয়ের নামে উঠতি বয়সি শিশু-কিশোররা বেপরোয়া হয়ে উঠছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। কিশোর গ্যাং কথাটি আমাদের সমাজে অল্পদিনের, যা শিশু-কিশোরদের নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার একটি প্রবণতাকে নির্দেশ করে। একাধিকজনের একটি দলকেই ‘গ্যাং’ বুঝায়। এই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জড়িয়ে পড়ছে মাদক, চাঁদাবাজি এমনকি খুনের মতো অপরাধে। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকা থেকে বিভাগীয় শহর এমনকি দেশের প্রায় সবখানেই একশ্রেণির তরুণ সমবয়সিকে নিয়ে নিজস্ব গ্রুপ বা গ্যাং গড়ে তুলছে, যা ‘কিশোর গ্যাং’ নামে পরিচিত। এসব কিশোর গ্যাং গ্রুপের বয়স সাধারণত ১৩ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফেসবুক পেজ, মেসেঞ্জার, ইমু ও ভাইবারসহ নানা অ্যাপস ব্যবহার করে তাদের অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। তাদের বিশেষ লক্ষ্যই নিজ এলাকা বা মহল্লায় ক্ষমতা ও প্রভাব খাটানো। বেপরোয়া হয়ে উঠছে উঠতি বয়সি এই কিশোর-তরুণরা।

এই ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, ‘পরিবার ও সামাজিক শাসন এবং দেখভালের অভাবে একশ্রেণির শিশু-কিশোর বখে যাচ্ছে। তারা অপরাধ করাকে বাহাদুরি মনে করছে। তাছাড়া বিদেশি অপসংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব থেকেই অনেকাংশে এসব কিশোর গ্যাংয়ের আবির্ভাব হচ্ছে। পারিবারিক সুস্থ বন্ধনের অভাব, অভিভাবকদের উদাসীনতা, খেলাধুলা ও সংস্কৃতচর্চা না করাসহ নানা কারণে কিশোর অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রণী ভূমিকা জরুরি।’

দেশে স্কুলের গণ্ডি পেরুনোর আগেই অনেক কিশোর ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। শুধু ইভটিজিং কিংবা পাড়াভিত্তিক বখাটেপনা নয়, কিশোররা গ্রুপ করে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে। সহপাঠীকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি, এমনকি ধর্ষণের ঘটনাও ঘটাচ্ছে তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর সারা দেশে কিশোর অপরাধ-সংক্রান্ত প্রায় পাঁচ শতাধিক মামলা হচ্ছে। স্বাভাবিক মামলা প্রবণতা হ্রাস পেলেও কিশোর অপরাধের মামলা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতি বছর হত্যা ও ধর্ষণসংক্রান্ত বিষয়ে প্রায় দুই শতাধিক ঘটনায় কিশোর-তরুণরা জড়িত থাকছে। গ্রাম পর্যায়েও কিশোর অপরাধের বিস্তার ঘটছে। তারা ইন্টারনেট থেকে সহজলভ্যভাবে অপরাধের খোরাক পাচ্ছে। এদের মধ্যে অনেক কিশোর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। তারা মাদকসেবনের অর্থ জোগাড় করতে বড় ধরনের অপরাধকর্ম করছে। মা-বাবাকে হত্যার অভিযোগেও গ্রেফতার হচ্ছে শিশু-কিশোররা।

এই ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মোহাম্মাদ ইমান আলী বলেন, ‘শিশুরা অপরাধী হয়ে জš§ায় না। পারিপার্শ্বিক অবস্থার অনিবার্য কারণেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। সন্তানদের সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে না পারায় অনেক সময় তারা খারাপ পথে চলে যায়। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে শিশুদের সময় দেওয়া, তার কাজের প্রতি সার্বক্ষণিক নজর রাখা।’

কিশোর অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের একটি বিরাট অংশ নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারের। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা বড় হয় অযতœ-অবহেলার মধ্য দিয়ে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকার থেকে ওরা বঞ্চিত হয়। শিশুকাল থেকে মা-বাবার সান্নিধ্য, স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত হয়ে কখনও তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রতিকূল পরিবেশ অবহেলা, বঞ্চনা এবং নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে একসময় অপরাধ জগতে পা বাড়ায় তারা। অপরাধ জগতে এই নবীন সদস্যরাই কালক্রমে শীর্ষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়। সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, পারিবারিক-সামাজিক অনুশাসনের শূন্যতায় বেপরোয়া জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এসব কিশোর। উচ্চবিত্ত পরিবারের কিশোররাও এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। অর্থের প্রাচুর্য কখনও অনর্থের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মা-বাবার অসতর্কতার কারণে এসব কিশোররা অসৎসঙ্গে মেশার সুযোগ পাচ্ছে। জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।

অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘কিশোর বয়সি ছেলেরা ‘কিশোর গ্যাং’ নামে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সমাজের সবাই উদ্বিগ্ন। কিশোর গ্যাং গ্রুপ বন্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। তবে অভিভাবকদের সবার আগে সচেতন হতে হবে এবং সন্তানের মঙ্গলের জন্য তাদের এগিয়ে আসতে হবে। তারা কোন বন্ধুর সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছেÑসে বিষয়ে মা-বাবার সচেতন থাকতে হবে। সন্ধ্যার পর পড়ার টেবিল ছেড়ে তারা যেন বাইরে বেরুতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

আশার কথা, বেপরোয়া গ্যাং কালচার রুখে দেওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল। এ বিষয়ে নিরাপত্তা বাহিনী যথেষ্ট সজাগ ও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে কয়েকদিন আগে ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, ঢাকায় কিশোর গ্যাংয়ের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। এ হীন কালচারের শেকড় উপড়ে ফেলার বিকল্প নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রথমেই এগিয়ে আসতে হবে পিতামাতাকে। অভিভাবকদের তীক্ষè দৃষ্টিই বিপথগামিতা থেকে সন্তানদের রক্ষা করতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ১৮টি গ্রুপের সদস্যদের ধরে সংশোধনাগারে পাঠিয়েছে। এরপর থেকে এসব গ্রুপের তৎপরতা কিছুটা কমেছে। নতুন গ্রুপ তৈরি হচ্ছে না। সাইবার নজরদারি শুরু করা হয়েছে। অনলাইনে তারা কী করছে, তাদের গতিবিধি নজরদারি করা হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত ২৫টির বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গ্যাং কালচারটা সামাজিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে।

তরুণ প্রজš§ই আমাদের শক্তি। আমাদের স্বপ্ন। আমাদের প্রেরণা। কিশোর-তরুণরা দেশের অমূল্য সম্পদ, আগামী দিনের কর্ণধার। দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাদের সঠিক কাউন্সেলিং দরকার। অভিভাবকসহ সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সুষ্ঠু পরামর্শ ও সঠিক দিকনির্দেশনা শিশু-কিশোরদের সুস্থ জীবনযাপনে ভূমিকা রাখতে পারে। যার যার অবস্থান থেকে আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এর বাইরে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..