প্রথম পাতা

ধসে রূপ নিচ্ছে পতনের পৌনে তিন বছর আগের

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: লাগাতার পতনে ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে পুঁজিবাজার। মাসের পর মাস চলছে এই পতন। মাঝে মধ্যে সূচকের অবস্থা কিছুটা উত্থানের দিকে গেলেও তা স্থায়ী হচ্ছে না। ছোট ছোট পতনের পাশাপাশি মাঝে মধ্যে বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে। এতে দিশাহারা হয়ে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। গতকাল ডিএসইর প্রধান সূচকের পতন হয় ৭৬ পয়েন্ট। এর জের ধরে প্রায় পৌনে তিন বছরের (৩৩ মাস) আগের অবস্থানে ফিরে গেছে। এর আগে ২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর ডিএসইর সূচকের অবস্থান ছিল চার হাজার ৯২৪।
গতকালের বাজার চিত্রে দেখা যায়, কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দিয়ে লেনদেন শুরু হলেও কয়েক মিনিটের মধ্যে এর পতন শুরু হয়। এতে শঙ্কিত হয়ে কম দরে শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতার সংখ্যা বেড়ে যায়। যে কারণে লেনদেনের শেষ পর্যন্ত সূচকের পতন অব্যাহত থাকে।
দিন শেষে ৭৫ দশমিক ৭৮ পয়েন্ট কমে সূচক স্থির হয় চার হাজার ৯৩৩ পয়েন্টে। লেনদেন হওয়া ৩৫৩ প্রতিষ্ঠান ও ফান্ডের মধ্যে মাত্র ৩৭ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট দর কমে যাওয়ার কারণে আশঙ্কাজনকহারে কমে যায় বাজার মূলধন। গতকাল একদিনেই ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও ফান্ডের বাজার মূলধন কমেছে পাঁচ হাজার ২৮ কোটি টাকা।
এদিকে শেয়ার বিক্রির প্রবণতা বেশি থাকায় গতকাল ১৩ কার্যদিবস পরে লেনদেন ৫০০ কোটির ঘরে অবস্থান করে। দিন শেষে ডিএসইতে মোট ৫০২ কোটি টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট লেনদেন হয়। এর আগে ২১ আগস্ট ডিএসইতে লেনদেন হয় ৫৪২ কোটি টাকা।
এদিকে পতন অব্যাহত থাকায় পুঁজি রক্ষা নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তাদের অভিমত পুঁজিবাজারে এখন যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এই পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই পতন কাম্য নয়। কারণ এখন বাজারে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার এবং মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দর তলানিতে রয়েছে। তাদের অভিমত, এই বাজার নিয়ে আসলে একটি চক্র খেলা করছে। কিন্তু কোনোভাবেই তাদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এ জন্য তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
তাদের অভিযোগ, পুঁজিবাজারে আবারও রাঘববোয়ালদের উপস্থিতি সরব হয়েছে। যারা ২০১০ সালে বাজার থেকে নিজেদের ফাইদা হাসিল করেছিলেন তারা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তারাই কৃত্রিমভাবে বাজারের গতিবিধি পরিবর্তন করছেন। যে কারণে পুঁজিবাজারের করুণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে লুৎফর রহমান নামে একজন বিনিয়োগকারী বলেন, পুঁজিবাজারে এখন যে পরিস্থিতি চলছে এই পরিস্থিতিতে এটাকে আর পতন বলা যায় না। এটা আসলে ধসের দিকে রূপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা এখন খুব খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে আছি। দিন যত যাচ্ছে ততই আমাদের অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের সর্বস্বান্ত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত এক শতাংশের কম সূচক কমলে সেটাকে পতন বলা যায় না। তবে বিশেষ কারণ ছাড়া এক কার্যদিবসে এক শতাংশের বেশি সূচকের কমলে তাকে পতন বলে অ্যাখায়িত করা হয়। গতকাল ডিএসইর প্রধান সূচকের পতন হয়েছে দেড় শতাংশের বেশি। সেই হিসাবে এটাকে পতন বলা যায়।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া যদি স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক এক শতাংশের বেশি কমে যায় তাহলে সেটা ভাবার বিষয়। আমার মনে হয় পুঁজিবাজারে এখন যে পতন হচ্ছে তার জন্য বিনিয়োগকারীদের মনোগত কারণ রয়েছে। তারা শঙ্কিত হয়ে কম দরে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছে। যে কারণে পতন আরও গতি পাচ্ছে।
একই বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। কেন এই পতন হচ্ছে তা বলা মুশকিল। তবে এ কথা ঠিক যে, বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি রয়েছে। তারা অন্যের কথা ভয় পেয়ে হাতে থাকা শেয়ার কম দরে ছেড়ে দিচ্ছেন, যে কারণে পতন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

সর্বশেষ..