প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ধূমপায়ী বাড়াচ্ছে বিএটিবি’র কম দামি সিগারেট!  

 

মাসুম বিল্লাহ: ১০ বছর আগে দেশে বাজারে নিম্নতমস্তরে (লো  সøাব) বিদেশি কোনো ব্র্যান্ডের কম দামি সিগারেট ছিল না। দেশি কয়েকটি কোম্পানি তখন কম দামি সিগারেট প্রস্তুত করে বিক্রি করতো। ফলে তখন নিম্নস্তরের সিগারেটের চাহিদাও কম ছিল। কিন্তু দেশের বাজারে সিগারেট সরবরাহকারী সর্ববৃহৎ কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ  (বিএটিবি) কম দামি সিগারেট বাজারে ছাড়ার পর থেকেই এ স্তরের সিগারেটের চাহিদা বাড়তে থাকে। ফলে ব্র্যান্ডের সিগারেট সহজলভ্য হওয়ায় নতুন নতুন ধূমপায়ীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ফলে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। এজন্য বিদেশি কোম্পানির ক্ষেত্রে শুল্ক-কর বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ সিগারেট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন ও অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে নি¤œস্তরে কোনো সিগারেট ছিল না। সে সময় মোট সিগারেট বাজারের মধ্যে নি¤œস্তরের দখলে ছিল ২৮ শতাংশ। দেশি কোম্পানি আকিজ গ্রুপের ঢাকা টোব্যাকো, আবুল খায়ের গ্রুপ ও নাসির গ্রুপ কম দামি সিগারেট বাজারজাত করতো সে সময়। ২০০৯ সালে পাইলট সিগারেটের মাধ্যমে নিম্নস্তরের সিগারেট বাজারে প্রবেশ করে বিএটিবি। এরপর থেকেই নিম্নস্তরের সিগারেটের গ্রাহক বাড়তে থাকে। চাহিদা ভালো হওয়ায় পরে আরও দুটি ব্র্যান্ড বাজারে ছাড়ে তারা। এর ধারাবাহিকতায় বাজারে আধিপত্য বাড়তে থাকে বিএটিবির। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত নি¤œস্তরের মোট বাজারের ৬০ শতাংশের বেশি চলে গেছে কোম্পানিটির দখলে। আর এ ১০ বছরের মধ্যে মোট সিগারেটের বাজারের মধ্যে ৮০ শতাংশ চলে গেছে নি¤œস্তরের দখলে। অর্থাৎ বিদেশি ব্র্যান্ডের সিগারেট সহজলভ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন ধূমপায়ী বাড়ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোটের মুখপাত্র আমিনুল ইসলাম সুজন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বহুজাতিক কোম্পানি হিসেবে বিভিন্নভাবে সুবিধা নিচ্ছে। তাদের ব্যবসায়িক কৌশলের কাছে এনবিআরসহ সরকারি সংস্থাগুলো হার মানছে। বেশি দামের সিগারেট কম দামে বিক্রি দেখিয়ে কর ফাঁকিসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উঠছে। কিন্তু এনবিআরসহ সরকারি দফতরগুলো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। কেন নিচ্ছে না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এবারের বাজেটেও কোম্পানিটিকে ছাড় দেওয়া হয়েছে।’

নি¤œস্তরে বর্তমানে বিএটিবিসির তিনটি ব্র্যান্ডের সিগারেট রয়েছে। এগুলো হলোÑডারবি, হলিউড ও পাইলট। ২০০৯ সালে পাইলট চালু করার পর ২০১০ সালে নি¤œস্তরের বাজারে বিএটিবিসির দখল ছিল ৯ শতাংশ। আর সে সময় মোট বাজারে নি¤œস্তরের দখল ছিল ৫০ শতাংশ। এ ব্র্যান্ডের ভালো সাড়া পাওয়ায় ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠানটি হলিউড ব্র্যান্ডের সিগারেট বাজারে ছাড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আরেক দফা বাজারে দখল বাড়ে বিএটিবিসির। ২০১২ সালে নি¤œস্তরের বাজারে তাদের দখল দাঁড়ায় ২৬ শতাংশ। তাদের বাজার দখল বাড়ার কারণে মোট সিগারেট বাজারে নি¤œস্তরের অবস্থানও আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ওই বছর নি¤œস্তরের দখলে চলে যায় মোট বাজারের ৬০ শতাংশ। এরপর ২০১৩ সালে কোম্পানিটি ডারবি সিগারেট বাজারে আনে। এতে করে অতিদ্রুত বাজারে আধিপত্য বাড়তে থাকে বিএটিবির। এর ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের জুনে নি¤œস্তরের সিগারেটের বাজারের প্রায় ৬৩ শতাংশ বিএটিবির দখলে চলে গেছে। আর মোট বাজারেও বেড়েছে এ স্তরের অবস্থান। বর্তমানে মোট সিগারেট বাজারের ৮০ শতাংশই এ স্তরের দখলে। অর্থাৎ বিদেশি ব্র্যান্ডের সিগারেট কম দামে পাওয়ার ফলে নতুন নতুন ধূমপায়ীর সংখ্যা বাড়ছে। ফলে গণস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এক ধরনের শঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে এসব সিগারেটের দাম ও শুল্ক-কর বাড়ানো উচিত বলে তারা মনে করেন।

এ বিষয়ে আমিনুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘বাংলাদেশে তামাকের ব্যবহার কমাতে হলে সব কোম্পানিকেই সমানভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর তামাকজাত পণ্যের ওপর সব ধরনের কর বাড়াতে হবে। কারণ বাংলাদেশেই সবচেয়ে কম দামে বিড়ি-সিগারেট বিক্রি হয়। কোনো কোম্পানিকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হলে তামাক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএটিবির ডারবি ব্র্যান্ড লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় প্রধান সিগারেট ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে ব্রাজিলের বাজারে উচ্চমানের সিগারেট হিসেবে এটি বিক্রি হয় এবং বাংলাদেশের চেয়ে দাম বেশি। কিন্তু নিম্নমানের সিগারেটে শুল্ক কম হওয়ায় এ থেকে বেশি মুনাফা হয় বিধায় অন্য দেশে যে ব্র্যান্ড উচ্চমান হিসেবে বিক্রি হয়, বাংলাদেশে তা নিম্নস্তরের সিগারেট হিসেবে বিক্রি করছে বিএটিবি।

সাধারণত যে কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে বিদেশি ব্রান্ডের জিনিসের দাম বেশি হয়। কিন্তু সিগারেটের ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটছে। সিগারেট ব্যাপকহারে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করলেও বিদেশি ব্র্যান্ডের সিগারেট বিশেষ সুবিধা ভোগ করছে। আর অনেক ক্ষেত্রে তারা সরকারের নিদের্শনাও মানছে না। চলতি অর্থবছরের বাজেটে নি¤œস্তরের প্রতি ১০ শলাকা বিদেশি ব্র্যান্ডের সিগারেটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ টাকা। আর দেশি ব্র্যান্ডের প্রতি ১০ শলাকার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭ টাকা। কিন্তু সরকারের এ নির্দেশনা মানছে না ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো। তারা ২৭ টাকা দাম ধরেই বাজারে সিগারেট ছাড়ছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে কোম্পানিটির সচিব আজিজুর রহমানের সেলফোনে গত তিন দিনে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়েও কোনো প্রতি উত্তর পাওয়া যায়নি।

সিগারেট একটি ‘পাপপণ্য’ হিসেবে বিবেচিত। তাই এটিকে সব উপায়ে নিরুৎসাহিত করা হয়। কিন্তু বিদেশি ব্র্যান্ড সহজলভ্য হওয়ায় ধূমপায়ীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি সিগারেট বিক্রির মুনাফার সিংহভাগ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। কারণ ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর সিংহভাগ শেয়ার বিদেশিদের দখলে। ১৯৭৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো। কোম্পানিটির ছয় কোটি শেয়ারের মধ্যে ৭২ দশমিক ৯১ শতাংশই বিদেশি উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের হাতে দশমিক ৬৪ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে মাত্র দশমিক ৮০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশেষজ্ঞ বলেন, সিগারেট এমনিতেই পাপপণ্য। আবার এর বিক্রি থেকে যে মুনাফা হচ্ছে সেটিও বিদেশে চলে যাচ্ছে। আর নেতিবাচক পণ্য হওয়া সত্ত্বেও দেশীয় কোম্পানিগুলো এ খাত থেকে প্রাপ্ত আয় অন্য ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে বিনিয়োগ করছে। ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থান হয়েছে। বর্তমানে দেশের বড় বড় শিল্প পরিবারগুলোর অনেকেই বিড়ির ব্যবসা দিয়ে কার্যক্রম শুরু করেন। ফলে তারা অন্য খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন। এর মধ্যে অন্যতম আকিজ গ্রুপ, নাসির গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ, ভরসা গ্রুপ প্রভৃতি। আর অন্যখাতে ব্যবসা সম্প্রসারণের ফলে সিগারেট ব্যবসা ধীরে ধীরে সংকুচিত করে আনছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো শুল্ক-কর সুবিধা পাওয়ায় ব্যাপক মুনাফা করে কেবল সিগারেট খাতেই ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে বিএটিবি। অন্য কোনো খাতে তেমন বিনিয়োগ নেই। অধিকন্তু প্রতিষ্ঠানটি তামাকচাষে ব্যাপক প্রণোদনা দেওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিজমিতে তামাক চাষ বাড়ছে। ফলে জমির উর্বরা শক্তি কমার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকির শিকার হচ্ছেন কৃষক। তাই বিদেশি কোম্পানির শুল্ক সুবিধা দেশীয় কোম্পানির ন্যায় হওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা টোব্যাকোর মূল প্রতিষ্ঠান আকিজ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ বশির উদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, তামাকজাত পণ্যের ক্ষেত্রে সরকার যে নির্দেশনা দেয় তা আমরা পরিপালন করি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে নি¤œস্তরের সিগারেটের ক্ষেত্রে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, আমরা তার পূর্ণ বাস্তবায়ন চাই।