দিনের খবর সারা বাংলা

ধোবাউড়ায় কাটা হচ্ছে চীনামাটির পাহাড়

রবিউল আউয়াল রবি, ময়মনসিংহ: ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার উত্তর-পূর্ব সীমান্তে উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভেদিকুড়া, গাছুয়াপাড়া ও মাইজপাড়া গ্রামে রয়েছে দেশের অমূল্য খনিজ সম্পদ চীনামাটির টিলা। অথচ এ খনিজ সম্পদ আজ অবৈধভাবে খননের ফলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এ সম্পদ রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের নীরব ভূমিকার কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরা লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে পাহাড়ের ওপর থেকে গভীর তলদেশ পর্যন্ত অপরিকল্পিতভাবে কাটাছেঁড়া করে প্রয়োজনীয় অংশ তুলে নেয়া হচ্ছে। খনিজ সম্পদ নীতিমালা অমান্য করে প্রভাবশালীরা একের পর এক সাদা মাটির পাহাড় কেটে সমতল করছে। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটার ফলে দুই পাহাড়ের মাঝখানের কোন কোন স্থানে ৮০ থেকে ১২০ ফুট পর্যন্ত গভীর হয়েছে। এর মধ্যেও অসংখ্য পরিবার বসবাস করছে।

‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫’-এর ৬(খ) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারি বা আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করতে পারবে না। তবে অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে পাহাড় বা টিলা কাটা যেতে পারে।

তবে জানা গেছে, নিয়মনীতি না মেনে অপরিকল্পিতভাবে এ খনিজ সম্পদ যে যার মতো আহরণ করছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, সেগুলোয় একই অপরাধ বারবার হলে শাস্তির মাত্রা কয়েক গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। পরিবেশ আইনে যদি এমন দুর্বলতা থাকে, তাহলে তা দূর করা ও আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে পরিবেশ ধ্বংসকারী দুর্বৃত্তদের নিবৃত্ত করতে হবে।

স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাসিন্দা জনরল মানকিন জানান, নির্বিচারে পাহাড় কাটায় যেমন দ্রুত নিঃশেষ হচ্ছে এই অমূল্য খনিজ সম্পদ, তেমনি হারাচ্ছে এর প্রকৃত আয়তন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাংলাদেশ এগ্রো সিরামিক নামে একটি কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে ভেদীকুড়া মৌজার চীনামাটির পাহাড় থেকে মাটি উত্তোলন করে আসছে। একটি স্থান থেকে মাটি উত্তোলনের পর সৃষ্ট গর্ত সাধারণ মাটি দিয়ে ভরাট করে অন্যস্থান থেকে মাটি উত্তোলন করার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা মানছে না।

২০১৪ সালে সৃষ্ট গর্তের মাটি ধসে এক শ্রমিকের মৃত্যু হলে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার সরেজমিনে পরিদর্শন করে মাটি কাটা সাময়িক বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

জানা যায়, ফুয়াং ফু, মোমেনশাহী, ফারদিং, চায়না বাংলা, পিসিআই, বেঙ্গল, কমল সিরামিক, জাকির সিরামিক, ফালু এগ্রো সিরামিক, মুন্নু সিরামিক, শাইনপুকুর সিরামিক প্রভৃতি কোম্পানি বাংলাদেশ খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে ভূমি লিজ নেয়। নিয়ম অনুযায়ী জমি ব্যবহার করার যে অনুমতি পায়, কোম্পানিগুলো মাটি আহরণে তারা তা অনুসরণ করছে না। এই শ্বেত মৃত্তিকা

থেকে তৈরি বাসনপত্র, বৈদ্যুতিক ইনসুলেটর, স্যানেটারি সরঞ্জাম, কাগজ, কৃত্রিম বস্ত্র ও নানা রাসায়নিক শিল্পে চীনামাটির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

খনিজ সম্পদ ব্যুরো থেকে অনুমতি নিয়ে এখন ভেদিকুড়া মনসাপাড়া থেকে সাদা মাটি উত্তোলন করছে বাংলাদেশ এগ্রো সিরামিক কোম্পানি। এই মুহূর্তে আর কোনো কোম্পানির মাটি উত্তোলনের অনুমতি নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিভিন্ন নামে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ২০০ টনের ডিও এনে হাজার হাজার টন মাটি উত্তোলন করে নিয়ে যাচ্ছে, যার হদিস কেউ রাখে না। অভিযোগ রয়েছে এমনিভাবে দেশি-বিদেশি সিরামিক কোম্পানির মালিকেরা হাতিয়ে নিয়েছে পাহাড় সমান টাকা। ফায়দা লুটছে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কিছু অসৎ কর্মকর্তা। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বিশাল খনিজ সম্পদের পাহাড় চীনামাটি। তবে গড়ে ওঠা দেশি-বিদেশি বহু কারখানা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন টাইলস, তৈজসপত্র, টয়লেট ফিটিংসসহ নানা জিনিস উৎপাদন করে কোটি টাকার রপ্তানি আয় করছে।

স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষক জানান, এগ্রো বাংলাদেশ নিজেরা মাটি উত্তোলন না করে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ত করে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করেই অতিরিক্ত বস্তা মাটি নিয়ে যায়।

অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ এগ্রো সিরামিক কোম্পানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ধোবাউড়া মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ হেলাল উদ্দিন বলেন, চীনামাটি আমাদের পর্যটনশিল্পের জন্য অপার সম্ভাবনা। প্রতিবছর দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকরা ঘুরতে আসে। কিন্তু চীনামাটি হরিলুটের কারণে বিলীন হয়ে যাচ্ছে পর্যটনের সম্ভাবনা।

খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপ-পরিচালক মো. মামুন বলেন, চীনামাটি কাটার সময় আমাদের কোনো লোক থাকে না। তবে ছাড়পত্র দেয়ার পর মাটি পরিবহনের সময় আমাদের লোক বিষয়টি দেখভাল করে।

এ বিষয়ে ধোবাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাফিকুজ্জামান শেয়ার বিজকে বলেন, আমি চীনামাটি কাটার বিষয়ে বা এ-সংক্রান্ত বিষয়ে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া কিছু বলতে পারব না।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ফরিদ আহমদ শেয়ার বিজকে জানান, আমার কার্যালয় থেকে কোনো কোম্পানিকে অনুমতি বা মাটি কাটার অনুমতি দেয়া হয়নি। তবে স্থানীয় পর্যায়ে তদারকি করার দায়িত্ব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার।

অবৈধভাবে চীনামাটি কাটার বিষয়ে

জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সমর কান্তি বসাক শেয়ার বিজকে বলেন, অবৈধভাবে চীনামাটির পাহাড় কাটার বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে ধোবাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলছি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..