প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

নকশা জটিলতায় পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ

ইসমাইল আলী: পদ্মা সেতুর প্রতিটি পিলারের জন্য পরীক্ষামূলক পাইলিং শেষ হয়েছে গত বছর। পাইলিংয়ের জন্য মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা সয়েল টেস্টও সম্পন্ন হয়েছে। এতে পুরো নদীজুড়ে ১৪টি পিলারের নকশায় জটিলতা দেখা দিয়েছে। পিলারগুলোর পাইলিংয়ের ৩৮০ থেকে ৪০০ ফুট গভীরতায় ধরা পড়েছে কাদার স্তর। ফলে পিলারগুলোর নকশা অনুমোদন আটকে আছে। এতে ১৪টি পিলারের কাজও শুরু করা যাচ্ছে না।

১৪টি পিলারের বিষয়ে পদ্মা সেতুর প্যানেল অব এক্সপার্টের মতামত চাওয়া হয়। এজন্য কয়েক দফা বৈঠক করা হয়। তবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। ফলে পাইলিংয়ের ডিজাইন রিভিউয়ে পরামর্শক নিয়োগ করেছে সেতু বিভাগ। তবে কবে নাগাদ এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে তা নিশ্চিত নয়।

সূত্র জানায়, চলতি মাসে জাজিরার কাছে ৩৭নং পিলারটির ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ৩৮নং পিলারের কাজ চলছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে ৪২ পর্যন্ত ছয়টি পিলারের ঢালাই সম্পন্ন হতে পারে। এরপর পিলারগুলোর ওপর স্প্যান বসানো হয়। তবে পুরো সেতুর জন্য সবগুলো পিলারের নকশাই চূড়ান্ত হয়নি। ফলে পিছিয়ে গেছে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ।

সেতুটির ১৪টি পিলারের নকশায় জটিলতা দেখা দিয়েছে। এগুলো হলোÑ মাওয়ার কাছে ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১ ও ১২ এবং জাজিরার কাছে ২৬, ২৭, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২ ও ৩৫নং পিলার। পিলারগুলোর জন্য পানির জিরো ডিগ্রি থেকে ১১০ থেকে ১২০ মিটার গভীর পাইল করতে হবে। তবে পাইলিং করতে গিয়ে মাটির ৪০০ ফুট গভীরে কাদার স্তর ধরা পড়ে। ফলে ওই স্থানে পাইলিং শেষ হলে তা সেতুর ভারবহন করতে পারবে না। লোড টেস্টে পাইল কাদার ভেতরে দেবে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পদ্মা নদীর তলদেশ থেকে প্রতি বছর কিছুটা করে মাটি সরে যায়। খরস্রোতের কারণে এমনি হয় বিধায় সেতুটির পাইল অনেক গভীর হতে হবে। বিশ্বে কোনো সেতুতে এত গভীর পাইল করতে হয়নি। তবে এখন পাইলের শেষ প্রান্তে কাদা মাটির স্তর ধরা পড়ায় দেখা দিয়েছে নতুন জটিলতা। এজন্য নতুন করে নকশা রিভিউ করতে হচ্ছে। এজন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে পদ্মা সেতুর ব্যবস্থাপনা পরামর্শককে।

তথ্যমতে, পদ্মা সেতুর ব্যবস্থাপনা পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করছে বিশ্বের খ্যাতনামা প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান যুক্তরাজ্যের রেন্ডাল লিমিটেড। এর সঙ্গে রয়েছে জাপানের পাডিকো কেইএল ও বাংলাদেশের বিসিএল। এ তিন প্রতিষ্ঠানই যুক্তভাবে পদ্মা সেতুর ১৪টি পিলারের ৮৪ পাইলের নকশা পর্যালোচনা করছে। এক্ষেত্রে সহায়তা করছে ডেনমার্কের পরামর্শক কাউই।

জানতে চাইলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, পদ্মা সেতুর ১৪টি পিলারের নকশা এখনও চূড়ান্ত করা যায়নি। এগুলোর পাইলিংয়ে কিছু সমস্যা আছে। এজন্য সেতুর ব্যবস্থাপনা পরামর্শক রেন্ডাল অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রেন্ডাল বঙ্গবন্ধু (যমুনা) সেতুর নকশা প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিল। রূপসা সেতুর নকশাও করেছে এ প্রতিষ্ঠানটি।

তিনি আরও বলেন, অবশিষ্ট ২৮টি পিলারের নকশা চূড়ান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টির কাজ চলছে। তবে সেতুর নির্মাণকাজ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮-৯ শতাংশ পিছিয়ে আছে। আর ভরা বর্ষার কারণে এখন মাঝনদীতে এমনিতেও কাজ করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাইলগুলোর নকশা চূড়ান্ত করা গেলে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়া যাবে। সেভাবে ঠিকাদারকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। তবে শুষ্ক মৌসুমের মধ্যে ১৪ পিলারের পাইলগুলোর নকশা চূড়ান্ত না হলে সেতুর নির্মাণকাজ অনেক পিছিয়ে যাবে।

সূত্রমতে, নকশার সমস্যা সমাধানে তিনটি বিকল্প নিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রথমত, ৪০০ ফুট পর্যন্ত গভীরে না গিয়ে ৩৫০ বা ৩৬০ ফুটে পাইল শেষ করা। এক্ষেত্রে প্রতিটি পিলারের জন্য ছয়টির পরিবর্তে আটটি পাইল নির্মাণ করা হতে পারে। তবে এ পদ্ধতিতে পাইল লোড টেস্টে ব্যর্থ হলে কাদার স্তর পেরিয়ে পাইলিংকে আরও গভীরে নিয়ে যাওয়া হবে। এতে পাইলের দৈর্ঘ্য অন্তত ৫৫০ ফুট পর্যন্ত গভীর করতে হবে। এতেও পাইলের নকশায় পরিবর্তন আনতে হবে। শেষ বিকল্প হিসেবে রাখা হয়েছে ৪০০ ফুট গভীরের কাদা টেনে তুলে ফেলে সেন্ড পাইলিং (বালু দিয়ে ভরা) করা। এতে পাইলের দৈর্ঘ্য ৪০০ ফুট পর্যন্ত রাখলেই চলবে।

পর্যালোচনায় তিনটি পদ্ধতিতেই নির্মাণ ব্যয় বাড়বে বলে মনে করেন পদ্মা সেতুর প্যানেল অব এক্সপার্ট টিমের সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনি বলেন, ১৪টি পিলারের পাইলের সমস্যার কারণে নকশা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এতে পাইলের নকশায় কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। এক্ষেত্রে পাইলের দৈর্ঘ্য কমিয়ে সংখ্যা বাড়িয়ে দেখা হবে। লোড টেস্টে পাস হলে সেটি কার্যকর হবে। অন্যথায় বিকল্প অন্য পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এতে সেতুটি নির্মাণকাল ছয় মাস পিছিয়ে যেতে পারে।

উল্লেখ্য, পদ্মা সেতুতে ৪২টি পিলার থাকবে। এর মধ্যে ৪০টিই নদীতে অবস্থিত। বিদ্যমান নকশায় নদীর প্রতিটি পিলারের জন্য ছয়টি করে পাইল নির্মাণ করতে হবে। নদীর গভীরতাভেদে এগুলোর গভীরতা হবে ৩০০ থেকে ৪০০ ফুট। আর মাওয়া ও জাজিরায় নদীর পাড়ে অবস্থিত দুই পিলারে পাইল হবে দুটি করে।