প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

নজরুল-প্রমীলার স্মৃতিবিজড়িত: শিবালয়ের তেওতা জমিদারবাড়ি

শরিফুল ইসলাম পলাশ: শনিবার সকাল সাতটা। আরিচা ফেরিঘাট। রাতভর মাছ ধরে ঘরে ফেরা জেলের নৌকার জন্য অপেক্ষা। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর পরিচয়ের সূত্র ধরে একজন জেলে প্রস্তাব দিলেন তার ছোট্ট নৌকায় ভ্রমণের। হেমন্তের সকালে নিঃখরচায় নৌভ্রমণের সুযোগ-হাতছাড়া করার জো নেই। মাঝির গন্তব্য অন্যতম তেওতা বাজার। যমুনার তীর ঘেঁষে প্রায় দুই কিলোমিটার পাড়ি দিলেই বাজারটি। বাজারের পাশেই নজরুল-প্রমীলার স্মৃতিবিজড়িত জমিদারবাড়ি।

মিনিট পনেরো হেলে-দুলে চলার পর বাজারে পৌঁছালাম। দোকানপাট তখনও খোলেনি। বাজারের এক পাশে দিঘির কোণায় টংয়ের ওপর দোকান। ভেতরে চৌদ্দ ইঞ্চি রঙিন টিভিতে হিন্দি সিনেমা চলছে। চা খেতে খেতেই দোকানদারের কাছ থেকে তেওতা জমিদারবাড়ির অ-আ-ক-খ জানতে চাইলাম। লালন সাঁইয়ের ভক্ত দোকানদার বাম পাশে দেখিয়ে বললেনÑ‘ওই তো, নজরুল-প্রমীলার স্মৃতি ধরে রাখা জমিদারবাড়ি। যদিও এখন ভাঙাচোরা দালান ছাড়া আর কিছুই নেই। তারপরও অনেক মানুষ দেখতে আসে। নাটক-সিনেমারও শুটিং হয়।’

জমিদারবাড়ির ওই দিঘির পাশ দিয়ে সরু রাস্তা ধরে কয়েক গজ সামনে এগুলেই পাকা তিন রাস্তার কোণায় ভঙ্গুর অবকাঠামো। সেখানে বিড়ি-খিলিপানের দোকান। রাস্তার অপর পাশে পুরনো আমলের কারুকার্যের ঢাউস আকারের টালি-টিনের চৌচালা ঘর। যা এখন ‘তেওতা প্রমীলা-নজরুল পাঠাগার’ হিসেবেই অধিক পরিচিত। মোড় থেকে দিঘির পাড় ঘেঁষে সরু পাকা রাস্তা ধরে কয়েক পা এগোলেই দুটি শান বাঁধানো ঘাট। নজরুল-প্রমীলা স্মরণে আরিচা-তেওতা-জাফরগঞ্জ সড়কটিকে ‘নজরুল-প্রমীলা সড়ক’ নামকরণ করা হয়েছে। নতুন ঘাটের পাশে মাথা উঁচু এক পায়ে দাঁড়িয়ে তালগাছ। তালগাছের ঠিক উল্টো পাশে রাস্তার সঙ্গে লাগোয়া নবরতœ মন্দির। সংস্কারের কল্যাণে কিছুদিন আগেই নতুন রূপ পেয়েছে মন্দিরটি।

চারপাশে সবুজ গাছপালায় ঢাকা নয়নাভিরাম দিঘি, পিচঢালা সরু রাস্তার পাশে নীল রঙের ছোট্ট সাইনবোর্ড। তাতে সাদা কালিতে লেখা ‘সংরক্ষিত পুরাকীর্তি’। তবে এই সাইনবোর্ডটি ছাড়া রাষ্ট্রের প্রতœতাত্ত্বিক ওই নিদর্শন রক্ষায় সংশ্লিষ্ট অধিদফতরের নেওয়া পদক্ষেপের কোনো ছাপ নেই পুরো এলাকায়। বরং হঠাৎ কেউ দেখলে মনে করবে জমিদারবাড়িটি ধ্বংসস্তূপ।

ভাঙাচোরা জমিদারবাড়ির ভবনে ঘুরতে ঘুরতে স্থানীয় কয়েক তরুণের কাছে জানা গেল পুরনো এই বাড়ির লৌকিক গল্প। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑজমিদারবাড়ির সামনে দিয়ে জুতা পায়ে চলাফেরা করা নিষেধ ছিল। কেউ সেই আদেশ অমান্য করলে তাদের ধরে এনে গারদে বন্দি করে রাখা হতো, জমিদারের আদেশ অমান্যকারীদের শাস্তি দিতে একাধিক গারদঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। জমিদার না থাকলেও তার স্মৃতি রয়ে গেছে। একইভাবে জমিদারবাড়ির ‘অন্ধকার কূপ’ নিয়েও বহু লোককথা প্রচলিত রয়েছে।

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা জমিদারবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা দেশগুপ্ত পরিবারের বংশধর পঞ্চানন চৌধুরী। ১৭৪০ সালে জš§ নেওয়া এ ব্যবসায়ী কর্মজীবন শুরু করেছিলেন দিনাজপুরে। পরবর্তীতে ব্যবসায় মুনাফার অর্থ খাটিয়ে জমি কিনতে শুরু করেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর তিনি নিজ গ্রাম তেওতায় ফিরে ওই বাড়িটি তৈরি করেন। তিরানব্বই বছরের বর্ণাঢ্য জীবনে রংপুর, দিনাজপুর, ঢাকা, ফরিদপুর, পাবনা ও বর্ধমানের কিছু অংশ তার জমিদারির আওতায় ছিল। বৈঞ্চব ধর্মাবলম্বী পঞ্চানন চৌধুরী ছিলেন সংস্কারমুক্ত, প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ। তার উত্তরসূরিরাও সেই ধারা বয়ে নিয়েছেন।

প্রায় তিনশ বছর আগে সাড়ে সাত একর জমির ওপর গড়ে তোলা ওই জমিদারবাড়ির সর্বশেষ জমিদার ছিলেন কিরণ শঙ্কর রায়। তিনি রাজনীতি ও অধ্যাপনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। শিল্প-সংস্কৃতির প্রতিও বিস্তর আগ্রহ ছিল তার। জ্ঞানচর্চা ও রাজনীতির সুবাদে নেতাজী সুবাস চন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ উপমহাদেশের তৎকালীন বরেণ্য ব্যক্তিদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। জমিদার কিরণ শঙ্কর তার পূর্বসূরিদের তুলনায় প্রজাবৎসল ছিলেন।

বিদ্রোহী কবির আনাগোনাও ছিল এই জমিদারবাড়িতে। জীবদ্দশায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এখানে চারবার এসেছিলেন। আসা-যাওয়া আর গান-বাজনার ফাঁকে নজরুলের প্রিয় খিলিপানের সূত্র ধরেই প্রমীলার সঙ্গে পরিচয়, অতঃপর প্রেম-পরিণয়। প্রমীলার বাবা বসন্তকুমার ছিলেন ত্রিপুরা জমিদারের নায়েব। থাকতেন জমিদারবাড়ির পাশেই; ত্রিপুরা জমিদারের বিশ্বস্ত বার্তাবাহক হিসেবে জমিদার কিরণ শঙ্করের পছন্দের মানুষ ছিলেন তিনি। সে কারণেই তার মেয়ে আশালতা ওরফে দোলনা, মতান্তরে দুলি (প্রমীলা) জমিদারের কাছে মেয়ের মতোই ছিলেন। পরবর্তীতে নজরুল-প্রমীলার বিয়ের সংবাদে খুশি হয়ে নবদম্পতির সম্মানে পক্ষকালজুড়ে সংবর্ধনা-গানের আয়োজনও করেছিলেন।

জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পরও নজরুল-প্রমীলাকে মনে রেখেছে এলাকার মানুষ। এখনও তাদের জš§-মৃত্যুবার্ষিকী উদ্যাপন করা হয়। সেখানে রাস্তার নামকরণ, পাঠাগারও গড়ে তুলেছে তরুণরা। সে সঙ্গে নজরুল-প্রমীলার স্মৃতি ধরে রাখতে পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ি সংস্কার করে নজরুল-প্রমীল বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার দাবিও উঠছে। জমিদারবাড়ির জমি অবৈধ দখলদার থেকে উদ্ধার করা গেলে সেই স্বপ্নও হয়তো একদিন পূরণ হবে।