করপোরেট টক

নতুনত্বই বার্জারের চালিকাশক্তি

বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে এখন শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড। বর্তমানে দেশের মোট রঙের বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশ এ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটির দখলে। বিস্তারিত তুলে ধরেছেন শরিফুল ইসলাম পলাশ

জার্মানের বাসিন্দা লুই বার্জার ১৭৬০ সালে ইংল্যান্ড থেকে বাণিজ্যিকভাবে রঙ ছড়াতে শুরু করেন। এরপর প্রায় আড়াইশ বছরের সফল পথপরিক্রমায় বিশ্বজুড়ে রঙের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে বার্জার। বাংলাদেশে রঙের বাজারের সিংহভাগ এখন এ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের দখলে। সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির জনপ্রিয়তা, ব্যবসা-মুনাফাও বাড়ছে।
ষাটের দশকে ভারতীয় উপমহাদেশের বাজারে প্রবেশ করে বার্জার। শুরুতে যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তানে উৎপাদিত পণ্য আমদানি করে বাজারজাত করত। নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে রঙের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে কারখানা নির্মাণ করে প্রতিষ্ঠানটি।
স্থানীয়-বিদেশি মিলিয়ে তিনটি স্বনামখ্যাত ব্যবসায়িক গ্রুপের হাত ধরে এ অঞ্চলে গোড়াপত্তনের পর কয়েক দফায় মালিকানায় পরিবর্তন আসে। স্বাধীনতার পর আশির দশকের শুরুতে ‘জেঅ্যান্ডএন (বাংলাদেশ) লিমিটেড’ নাম বদলে ‘বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামে পূর্ণোদ্যমে কার্যক্রম শুরু করে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটি।
১৯৯৯ সালে রাজধানীর অদূরে সাভারে অত্যাধুনিক মানের রঙ উৎপাদন কারখানা নির্মাণ করে বার্জার। ২০০৩ সালে বার্জার পেইন্টসের প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে রাজধানীতে নিজস্ব ভবনে স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকে আরও বড় পরিসরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বার্জারের বর্ণিল রঙ।
পণ্যের বৈচিত্র্যময়তা বার্জারের চলার পথে মূল চালিকাশক্তি। কয়েক দশকে বাংলাদেশে রঙ সম্পর্কে মানুষের ধারণা পাল্টে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পুরোনো গৎবাঁধা গণ্ডি থেকে বেরিয়ে ব্যবহারের ক্ষেত্রকে মাথায় রেখে রঙ উৎপাদন করছে তারা।
বার্জারের ঝুলিতে বর্তমানে দুই ডজনের বেশি ধরনের অর্ধশতাধিক পণ্য রয়েছে। সময়ের চাহিদাকে সামনে রেখে পণ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে বার্জার। এর সুফল হিসেবে দেশের প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার রঙের বাজারের ৫৫ শতাংশের বেশি দখলে রেখেছে কোম্পানিটি।
বাংলাদেশে প্রতিকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার মান পিছিয়ে পড়াসহ নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যেও বার্জার ‘প্রতি পাঁচ বছরে বিক্রি শতভাগ বৃদ্ধি’র স্বপ্ন পূরণে সফল হয়েছে। ২০১৩ সালে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে প্রায় ৭৬১ কোটি ১২ লাখ টাকা আয় করে কোম্পানিটি। ২০১৮ সালের শেষে যা প্রায় এক হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা ছাড়ায়।
ব্যবসার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষকে যুক্ত করার জন্য ২০০৫ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয় কোম্পানিটি। আয়-মুনাফায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা আর ফি-বছর উল্লেখযোগ্য হারে নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার কারণে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের কাছেও জনপ্রিয় বার্জার পেইন্টস। একই সঙ্গে বিদ্যমান
আইন-কানুন যথাযথভাবে পরিপালন, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দেশের সেরা ব্র্যান্ড হিসেবে স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সর্বোচ্চ রাজস্বের জোগান বার্জারকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

পুঁজিবাজারে বার্জার পেইন্টস

# কারখানা ও প্লান্ট: চারটি
# নিজস্ব বিপণন কেন্দ্র: ১৮টি
# সহযোগী প্রতিষ্ঠান: দুটি

# পরিশোধিত মূলধন: ৪৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা
# শেয়ার সংখ্যা: চার কোটি ৪৩ লাখ
# বার্ষিক গড় আয়: এক হাজার ১৭৭ কোটি ৭১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা
# গড় বার্ষিক মুনাফা: ১২৬ কোটি ৩৯ লাখ ৮২ হাজার টাকা
# গড় লভ্যাংশ: ৩৪২ শতাংশ
# সর্বশেষ শেয়ারদর: এক হাজার ৭৩০ টাকা

২০১৭-২০১৮

# সম্পদ: ৮৯৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা
# বার্ষিক আয়: এক হাজার ৬৪৮ কোটি ৩৪ লাখ ৯৭ হাজার টাকা
# কর-পরবর্তী মুনাফা: ১৭৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা
# রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রাজস্ব: ৪২৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা
#  লভ্যাংশ: ২০০ শতাংশ নগদ ও ১০০ বোনাস

তথ্যসূত্র: ডিএসই

 

পথপরিক্রমা

১৭৬০
জার্মানির বাসিন্দা লুইস বার্গার ইংল্যান্ডে রঙ ও রঞ্জক উপাদান তৈরির ব্যবসা শুরু করেন। লুইসের পরিবারের সদস্যরা ওই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের নাম হয় ‘লুই বার্জার অ্যান্ড সন্স লিমিটেড’। পণ্যের মান নিয়ে গ্রাহকের সন্তুটি তথা ব্যবসায়িক সুনামের ওপর ভর করে স্বল্পসময়ের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি

১৯৫০
লুই বার্গারের স্বপ্ন ও সময়োপযোগী ব্যবসায়িক ধারণা নিয়ে বিশ্বজুড়ে রঙের রাজ্যে বড় বিপ্লব ঘটিয়েছে বার্জার। প্রায় আড়াইশ বছরের পথচলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বনামে বিখ্যাত হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানটি। ভারতীয় উপমহাদেশেও প্রবেশ করে প্রতিষ্ঠানটি। শুরুতে যুক্তরাজ্য ও পরে বার্জার পাকিস্তানের কাছ থেকে পণ্য আমদানি করে বাজারজাত শুরু করে।

১৯৭০
স্থানীয়ভাবে বার্জার পণ্য উৎপাদনের জন্য চট্টগ্রামের কালুরঘাটে প্রথম কারখানা নির্মাণ করা হয়। যুক্তরাজ্যেও জেসন অ্যান্ড সিকোলসনসহ (জেঅ্যান্ডএন) অন্য দুই শেয়ারধারী ব্যবসায়িক গ্রুপ বার্জারের সঙ্গে যুক্ত হয়।

১৯৭১
বার্জারের সিংহভাগ শেয়ারধারী জেঅ্যান্ডএন গ্রুপ অপর বিনিয়োগকারী গ্রুপ ডানকান ম্যাকনেইলের কাছ থেকে শেয়ার কিনে নেয়। আরেক বিনিয়োগকারী দাদা গ্রুপের হাতে থাকা শেয়ার স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকারের হাতে চলে আসে।

১৯৮০
স্বাধীনতার আগে ভারতীয় উপমহাদেশে ‘জেঅ্যান্ডএন (বাংলাদেশ) লিমিটেড’ নামে ব্যবসা শুরু। ওই বছর ‘বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামে পথচলা শুরু কোম্পানিটির।

১৯৯০
বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের
শতভাগ মালিকানায় সহযোগী প্রতিষ্ঠান
হিসেবে জেনসন অ্যান্ড নিকোলসন
(বাংলাদেশ) লিমিটেডের
পথচলা শুরু হয়।
১৯৯৯
বাংলাদেশে রঙের বাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদনের জন্য রাজধানীর অদূরে সাভারে রঙ উৎপাদন প্লান্ট নির্মাণ
করা হয়।

২০০০
বার্জার পেইন্টসের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক
শেয়ারধারী প্রতিষ্ঠান যুক্তরাজ্যের জেঅ্যান্ডএন ইনভেস্টমেন্ট (এশিয়া) বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে শেয়ার কিনে নেয়।

২০০৩
চট্টগ্রাম থেকে পথচলা শুরুর কয়েক দশক পর প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় রাজধানীর উত্তরায় নিজস্ব ভবনে (বার্জার হাউজ) স্থানান্তর করা হয়।

২০০৫
ব্যবসাসফল বহুজাতিক কোম্পানি হিসেবে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয় বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..