প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

নতুন অর্থবছরে পচা শামুকে যেন পা না কাটে

 

২০১৭-১৮ অর্থবছর নিয়ে যে ‘আউলা’ লেগেছে, তার শেষ পরিণতি কী? শেষ পরিণতি কী, তা স্বয়ং অর্থমন্ত্রীও সম্ভবত জানেন না। অন্যরা কি জানেন? মনে হয় না। কারণ তাতে ‘ভ্যাট’ কত টাকা আদায় হবে, তার হিসাব ছিল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ভ্যাট খাতে রাজস্ব আসবে ৯৯ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। অবশ্য শর্ত ছিল নতুন ‘ভ্যাট আইন’ পয়লা জুলাই থেকে কার্যকর হবে। বাজেট পাসের সময় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সেই আইন স্থগিত হলো, তাও দুই বছরের জন্য। এর ফল কী? ফল হচ্ছে এ খাতে ঘাটতি হবে কুড়ি হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হলে ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হতো। আইনটি স্থগিত হওয়ায় এখন এই ২০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। এখানেই শেষ নয়। প্রতিবছর বাজেট সাধারণভাবেই কাটছাঁট হয়। এ বছরও যে হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন এ কাটছাঁটের ফলে বাজেট ঘাটতি কত হবে, তা একমাত্র ঈশ্বর জানেন। এর অর্থ ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট বিশাল ঘাটতির সম্মুখীন। প্রশ্ন, কত টাকার ঘাটতি? এটা একমাত্র ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। তবে এসব হিসাব করতে করতে অর্থমন্ত্রী যে পেরেশান হবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে, সে সম্পর্কে অবশ্য কিছুটা অনুমান করা যায়। প্রথমত, খরচ হ্রাস। মোট খরচ ধরা হয়েছে চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় (এডিপি) ধরা আছে এক লাখ ৫৯ হাজার ১৩ কোটি টাকা। রাজস্ব ব্যয় কমানো যাবে না, এটা খুবই বাস্তব কথা। শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন বাজেটের ওপর কোপ পড়তে পারে। যার অর্থ, এর প্রভাব পড়বে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে। উন্নয়ন ব্যয় হচ্ছে সরকারি বিনিয়োগ। বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতায় আমাদের উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ বড় ভূমিকা রাখে। এর অভাব হলে সমূহ বিপদÑএতে কোনো সন্দেহ নেই। এ অবস্থায় আরেকটি বিকল্প আছে। বিকল্পটি হচ্ছে রাজস্ব বাড়ানো। এখন ২০-৩০ হাজার, ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব বাড়ানোর চিন্তা করাটা বাতুলতা। বিদ্যমান ভ্যাট আইনের অধীনে এখানে-সেখানে ছুরি চালিয়ে অল্প কিছু রাজস্ব বাড়ানো যেতে পারে। হতে পারতো আরেকটি ব্যবস্থা। ধনীদের ‘ট্যাক্স’ করা। কিন্তু দৃশ্যমান সরকারি নীতি তা নয়। সরকার বলে, তারা ব্যবসাবান্ধব। কার্যত তা ব্যবসায়ী প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত একটা সরকার। তাদের তুষ্ট করতেই ব্যস্ত সরকার। এর বড় প্রমাণ নতুন ভ্যাট আইন স্থগিতকরণ। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য থেকেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। গত ১০ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে অর্থমন্ত্রীর একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। তাতে তিনি বলেছেন, ‘খুব বেশি ভালো থাকলে সুখে কামড়ায়। খুব আরামে থেকে সবাই বিরাট বড়লোক হয়েছেন। সুতরাং ভাবলেন একটু ঠুকে দিই, আছে কিছু ফল্ট আছে, মেরে দিই।’ এ কথার অর্থ পরিষ্কার। সুখে থাকলে ভূতে কিলায়। পরিষ্কারভাবেই ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্য করে বলা। তার অর্থ, ভ্যাট আইন স্থগিতকরণ তাদেরই কাজ। এ অবস্থায় বড় বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, পোশাক রফতানিকারক, ব্যাংক মালিক, বিমা কোম্পানির মালিক, ওষুধ কোম্পানি মালিকদের অধিকতর ‘ট্যাক্স’ করে রাজস্ব ঘাটতি মেটানোর চিন্তা নিতান্তই বাতুলতা হবে। হতে পারতো সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করে ঘাটতি মেটানোর একটা পথ বের করা। না, তাও সম্ভব নয়। কৃষকদের কোমরে দড়ি বেঁধে পাঁচ হাজার, দশ হাজার টাকার ঋণ আদায় করা সহজ। শত শত কোটি টাকার ঋণ ফাঁকিবাজদের কাছ থেকে আদায় করা কঠিন, মহাকঠিন একটা বিষয়। আরেকটি পথ আছে। ১৪ জুলাইয়ের প্রায় সব সংবাদপত্রের একটা খবরে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় কয়েক হাজার বাংলাদেশি ‘সেকেন্ড হোম’ করেছে। সেখানে পাচার হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। ‘সুইস ব্যাংকে’ বাংলাদেশিদের টাকা আছে। ‘পানামা পেপারসে’ বাংলাদেশিদের নাম আছে, যারা অবৈধভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা এ দেশ থেকে পাচার করেছে। সরকার আন্তরিক হলে ওই টাকার একাংশ অন্তত উদ্ধার করা সম্ভব। একজন রাজনৈতিক নেতার ছেলের টাকা সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত আনা হয়েছে। কিন্তু উল্লিখিত স্থানের টাকা, কানাডার ‘বেগমনগরের’ টাকা উদ্ধার করে দেশে আনা কি সম্ভব? মনে হয় না। কারণ হিসেবে বলা হয়, কার কত টাকা আছে, সরকার কীভাবে তা জানবে? মজা হচ্ছে ব্যাংকপাড়া, বাণিজ্যিক পাড়া, বড় বড় ক্লাবের দৈনিক ‘গসিপ’ হচ্ছেÑকোথায় কার কত টাকা আছে। অথচ সরকারের কোনো এজেন্সি তা জানে না। দ্বৈত নাগরিকত্ব যে আরেকটি পন্থা, যার মাধ্যমে অবৈধ টাকা বিদেশে ছেলেমেয়ে ও নিজস্ব নামে বৈধ করা হয়, তা কে না জানে? ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলে একটা ফরম পূরণ করতে হয়। ঘোষণা দিতে হয়Ñআমেরিকায় অ্যাকাউন্ট ওপেনারের কোনো ব্যবসা আছে কি না, তিনি আমেরিকার নাগরিক কি না, আমেরিকার গ্রিনকার্ড হোল্ডার কি না, কোথায় তিনি ট্যাক্স দেন ইত্যাদি। এর অর্থ কী? বাংলাদেশিদের কাছ থেকে এ ঘোষণা নেওয়া হচ্ছে কেন? আমাদের কি পাল্টা কোনো ব্যবস্থা আমেরিকা অথবা অন্য দেশে আছে? থাকলে তার অবস্থা কী, না থাকলে কেন? মোদ্দা কথা, এসব খাত থেকে টাকা উদ্ধার করে চলতি বছরের বাজেট ঘাটতি পূরণের কোনো ব্যবস্থা হবেÑএমন আশা বাতুলতা। বকেয়া ট্যাক্স, বকেয়া ভ্যাট আদায় করে কি বাজেট ঘাটতি মেটানোর ব্যবস্থা করা যাবে? তাও মনে হয় না। মামলা করে ব্যবসায়ীরা সরকারকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছে এবং ছাড়বে। গত বৃহস্পতিবারই একটি সংবাদপত্রে দেখলাম এক ঋণখেলাপি, বড় ঋণখেলাপি ক্ষতিপূরণ দাবি করে ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। আমি এ ধরনের মামলার কথা আরও জানি। খেলাপের টাকা তো দেয়ই না, বরং উল্টো করে ক্ষতিপূরণের মামলা। বড় উকিলদের মাধ্যমে এমন মামলা সাজানো হয়, যাতে ব্যাংকগুলো বলতে বাধ্য হয়Ñ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি।’ অতএব বকেয়া ট্যাক্সের টাকা তোলাও অসম্ভব বলে প্রতীয়মান। তাহলে শেষ পর্যন্ত হাতে থাকে দুটি অস্ত্র: যত্রতত্র কেরানিদের খুশিমতো ট্যাক্স বসানো ‘এসআরও’। দ্বিতীয়ত, উন্নয়ন বাজেট হ্রাস করা, যার কিছুটা ইঙ্গিত প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন। বাকিটা রুপালি পর্দায় দেখার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

পরিশেষে আরও কয়েকটা কারণের কথা উল্লেখ করা দরকার, যেগুলো বাজেটকে আরও ‘আউলা’ করে দিচ্ছে। এর মধ্যে এক নম্বর হচ্ছে বন্যা। ইতোমধ্যে ছয়-সাতটি জেলার লক্ষ লক্ষ লোক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত। প্রতিদিন বন্যার অবনতি ঘটছে। এক অঞ্চলে কিছু উন্নতি হলেও অন্যান্য অঞ্চলে হচ্ছে আরও অবনতি। কিছুদিন আগে সিলেট ও কিশোরগঞ্জ এবং নেত্রকোনায় অকাল বন্যায় ছয়-সাত লাখ টন বোরো ফসল নষ্ট হয়েছে। তার প্রভাব পড়েছে ঊর্ধ্বমুখী চালের দামে। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এখনকার বন্যায় আউশ ফসল নষ্ট হওয়ার উপক্রম। সরকার ১৫ লাখ টনের মতো চাল আমদানি করছে বলে খবর ছাপা হয়েছে। কয়েক হাজার মিলারের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে, যারা সরকারকে চুক্তিমতো চাল না দিয়ে বাজারকে অস্থিতিশীল করেছে। অতএব বোঝা যায়, এ খাত এবারের বাজেটকে আরও এলোমেলো করবে। রয়েছে রেমিট্যান্স ও রফতানি খাতের খারাপ খবর। এ দুই খাতেই অগ্রগতি হতাশাজনক। রেমিট্যান্স প্রতি মাসে হ্রাস পাচ্ছে। আমাদের সর্ববৃহৎ বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানি হ্রাস পেয়েছে। এদিকে সামগ্রিক রফতানি বৃদ্ধির খবর হতাশাজনক। দশ শতাংশের মতো বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে গত অর্থবছরে রফতানি বেড়েছে এক শতাংশের মতো। বেশি বেশি আমদানি, কম কম রফতানি এবং হ্রাসমান রেমিট্যান্সের কারণে ‘ব্যালান্স অব পেমেন্ট’ বা লেনদেনের ভারসাম্যের অবস্থা খারাপের দিকে। এদিকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) আমাদের পারফরম্যান্স হতাশাজনক। এমডিজিতে ভালো করলাম, অথচ এসডিজিতে এসে মার খাচ্ছি। ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ১০টিতেই আমরা লাল ক্যাটাগরিতে। এ সবই খুব খারাপ খবর। অর্থমন্ত্রীর জন্য দুশ্চিন্তার খবর, দেশের জন্য দুশ্চিন্তার। সব খবর একসঙ্গে করলে বলাই যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ‘আউলা’টা বেশ বড়। অপেক্ষা করা যাক, দেখা যাক সরকার কীভাবে তা মোকাবিলা করে। পচা শামুকে যেন পা না কাটেÑএ প্রার্থনাই করি।

 

অর্থনীতি বিষয়ের কলাম লেখক

সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়