মত-বিশ্লেষণ

নতুন দশকে ইকোর অগ্রযাত্রা

আরমান শেখ: গত বছরের ডিসেম্বরে ইকোনমিক কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (ইকো) পরিবহন ও যোগাযোগ বিভাগের বৈঠকে সাড়ে ছয় হাজার কিলোমিটারব্যাপী রেল চলাচলের একটি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। পৃথিবীর মোট পরিধির এক ষষ্ঠাংশ বিস্তৃত এই রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা স্বপ্নের মতো মনে হলেও গত ৪ মার্চ তা বাস্তবে পরিণত হয়েছে।

দীর্ঘ পরিকল্পনা ও কূটনৈতিক বাধা-বিপত্তি পার করে ইরান-পাকিস্তান-তুরস্ক যে পণ্যবাহী বাণিজ্যিক ট্রেনের যাত্রা শুরু করছে, তা নিঃসন্দেহে ত্রিদেশীয় সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। ইকো’র নেতৃস্থানীয় এই তিন দেশ পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ক যথাক্রমে আরব সাগর ও দক্ষিণ এশিয়া, পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্য এবং ভূমধ্যসাগর, মধ্য এশিয়া ও ইউরোপকে একত্র করেছে। তাই ত্রিদেশীয় শক্তির এই বাণিজ্য জোট এখন বিশ্বের অন্যতম আলোচনার বিষয়।

১৯৮৫ সালে সৃষ্ট সংস্থা ইকোর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য সংখ্যা তিন হলেও তা অল্প সময়ের মাঝেই মধ্য এশিয়ার আরও সাতটি দেশকে সদস্য হিসেবে পেয়েছে। কিন্তু চার দশক আগে সৃষ্ট এই জোট বিগত পাঁচ বছরে এত সক্রিয় হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। গত বছরগুলোতে মার্কিন ন্যাটোমিত্র তুরস্কের সঙ্গে যেমন মার্কিন সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে, তেমনি পাকিস্তানের সঙ্গে ঘটেছে সম্পর্ক সংকোচন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ইরানের তত্ত্বাবধানে ইকো সক্রিয় করেছে তিন রাষ্ট্র, যার পেছনে মূল ভূমিকা রাখছে চীন। জাপানি বিখ্যাত নিউজ ম্যাগাজিন নিক্কি এশিয়ার মতে, উদ্বোধন হওয়া সাড়ে ছয় হাজার কিলোমিটারব্যাপী রেলপথটি চীনের শিনজিয়াং প্রদেশ পর্যন্ত পৌঁছে তা বেল্ড অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) সঙ্গে সংযুক্ত হবে।

ইরানে ২ হাজার ৬০০, তুরস্কে ১ হাজার ৯৫০ ও পাকিস্তানে ১ হাজার ৯৯০ কিলোমিটার বিস্তৃত এই রেলপথটি ২১ দিনের ভ্রমণকে মাত্র ১২ দিনে সম্ভবপর করে তুলে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের অর্থ ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা আবদুর রাজ্জাক দাউদ  জানান, একদিক থেকে সফর শেষ করে গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগবে ১২ দিন এবং প্রতিটি ট্রেনে ৭৫০ টন পণ্য পরিবহন করা যাবে। তিন দেশের মধ্যে ইকো ট্রেন চালু মূলত বন্ধুত্বেরই নিদর্শন।”

বহুল আলোচিত এই রেলপথটি এমন সময় চালু করা হলো, যখন বাইডেন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধংদেহী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো শুরু করেছে এবং ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তিতে সহজে না ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে বিভিন্ন শর্তের মাধ্যমে। প্রথম দিকে সহজে পরমাণু চুক্তিতে ফিরে আসার ইঙ্গিত দিলেও বর্তমানে বাইডেন সরকার চুক্তি নতুনভাবে তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মার্কিনিদের নতুন এই কৌশলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ৩ মার্চ ইরান ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে পরমাণু ইস্যুতে আর কোনো আলোচনা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। এছাড়া গত মাসের শেষ সপ্তাহে বাইডেন প্রশাসন সর্বপ্রথম মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়ায় ইরান সমর্থনপুষ্ট গোষ্ঠীর ওপর হামলা চালিয়ে সতর্কবাণী প্রচার করেছে। এর জবাবেই গত ৩ মার্চ সকালে ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিতে বিদ্রোহীরা রকেট হামলা চালায়। অতি সম্প্রতি তুরস্কের প্রতিও নিষেধাজ্ঞা দিতে ১৭০ জন মার্কিন আইনপ্রণেতা প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে  চিঠি দেয়। এ থেকে বোঝা যায়, ট্রাম্প আমলে সৃষ্ট মার্কিন তিক্ততা সহজে কাটবে না। আর এর প্রস্তুতিতেই ইরান-তুরস্ক-পাকিস্তান ইকোর অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য রুট চালু করল, যা অদূর ভবিষ্যতে চীনের জন্য হবে আশীর্বাদস্বরূপ। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছে চীন। তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপকে সংযুক্ত করতে শক্তিশালী নৌ-যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে ইরানের কৌশলগত চাবাহার বন্দর ও পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে চীন।

গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর  পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সন্ত্রাসবাদবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ড. লারিজানির বক্তব্যে সর্বপ্রথম মার্কিনবিরোধী জোট ও তাদের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়। তিনি সবার সামনে ইরান-তুরস্ক-রাশিয়া জোটকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিকল্প হিসেবে উল্লেখ করেন, একইসঙ্গে এই জোটে যোগ দিতে পাকিস্তান ও চীনকে আহ্বান জানান। এর প্রাসঙ্গিকতা ও সার্থকতার প্রমাণ পাওয়া যায় সাম্প্রতিক ইরান-রাশিয়া ও তুরস্ক-পাকিস্তান সামরিক মহড়ার মাধ্যমে। অতি সম্প্রতি তুরস্ক ও পাকিস্তান যৌথভাবে যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সিদ্ধান্তও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে।

এই বছর মার্কিন মুল্লুকে বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে রুশ-মার্কিন সম্পর্কে টানাপোড়েন বৃদ্ধি পায়, যার পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধীদলীয় নেতাকে বিষ প্রয়োগ ও গ্রেপ্তারের অভিযোগ এনে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বাইডেন সরকার। অন্যদিকে উইঘুর নির্যাতন ইস্যুকে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও বিশ্বে চীনের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাসকরণে যথাযথভাবেই ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র; যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও আরও দুটি দেশে উইঘুর নির্যাতনকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে বিল পাস করেছে।

পরিশেষে বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে বলা যায় যে, চীন এবং রাশিয়া নিজ স্বার্থেই এশিয়া ও ইউরোপে ইকোর কার্যক্রম বিস্তৃত করতে মদদ দেবে, যা অত্র অঞ্চলে মার্কিনিদের কোণঠাসা করতে যথেষ্ট কার্যকর হবে বলে ধারণা করা যায়। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রশক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করে এবং কী ধরনের কৌশল অত্র অঞ্চলে অবলম্বন করে, তাই এখন দেখার বিষয়।

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..