মার্কেটওয়াচ

নতুন ব্যাংক অনুমোদন কতটা বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত

প্রতি রবি থেকে বৃহস্পতিবার পুঁজিবাজারের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে এনটিভি ‘মার্কেট ওয়াচ’ অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে শেয়ার বিজের নিয়মিত আয়োজন ‘এনটিভি মার্কেট ওয়াচ’ পাঠকের সামনে তুলে ধরা হলো:

 

আমাদের দেশে শেষ প্রান্তিকে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ দেখানো হয়েছে, যা প্রকৃতপক্ষে ১৭ শতাংশ। ব্যাংক খাতে মোট যে ঋণ আছে তার ছয় ভাগেরও বেশি এখন খেলাপি, যা কোনো দেশের ব্যাংক খাত ও অর্থনীতির জন্য খারাপ সংকেত। এছাড়া বড় বড় ঋণখেলাপি বারবার সময় নিয়েও ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। ব্যাংকের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি আছে। এ অবস্থায় নতুন ব্যাংকের অনুমোদন কতটা বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত তা ভেবে দেখা দরকার। গতকাল এনটিভির মার্কেট ওয়াচের আলোচনায় বিষয়টি উঠে আসে। হাসিব হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন দৈনিক সমকালের বিজনেস এডিটর জাকির হোসেন এবং ডেইলি স্টারের বিজনেস এডিটর সাজ্জাদুর রহমান।

জাকির হোসেন বলেন, সার্বিকভাবে ২০১৭ সাল ছিল ব্যাংক খাতের জন্য একটি অস্থিরতার বছর। অধিকাংশ ব্যাংকের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় অবনতি হয়েছে। এটি বোঝা যায় এনপিএল (নন পারফর্মিং লোন) রেট অনেক বেড়ে যাওয়াতে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে এই রেট ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশের মতো বেড়েছে, যা গত কয়েক বছরে দেখা যায়নি। প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যাংকের অ্যাসেটের কেন এত অবনতি হলো? অ্যাসেটের যাতে অবনতি না হয় সেজন্য বেশ কিছু সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি বড় সুবিধা, বেশ কয়েকজন বড় ঋণ গ্রহীতার লোন রিস্ট্রাকচার (পুনর্গঠন) করা। আমাদের দেশে ব্যাংকিং খাতে এই নতুন নিয়ম করা হয়েছে, যা সারা পৃথিবীতে আগে থেকেই ছিল। কোনো কারণে ঋণখেলাপি হয়ে গেলে সে যাতে আবার তা পরিশোধ করতে পারে সেজন্য নতুন করে শিডিউল করা হয়। চলতি বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার মতো ঋণ পুনর্গঠন করা হয়েছে। আর এই ঋণের সবই যে খেলাপি ছিল তা নয়, ঋণখেলাপিদের দাবি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভিন্ন কারণে তারা একটু খারাপ অবস্থায় আছে। ফলে যার ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পরিশোধ করার কথা তাকে ২০ বছর সময় দেওয়া হোক। যেহেতু বাজারে সুদের হার কমে এসেছে তাই ১০ শতাংশ সুদে যে ঋণ ছিল তা পাঁচ শতাংশে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়, যাতে তারা ঋণটি পরিশোধ করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ দাবি মেনে নিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে, সময় বাড়ালেও তারা ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না এবং আবার সুযোগ চাচ্ছে। আর এসব পদক্ষেপের কারণে ঋণখেলাপি কমার কথা, কিন্তু তা না হয়ে উল্টো বেড়েছে। যে কারণে আমি মনে করি ব্যাংকের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি আছে।

সাজ্জাদুর রহমান বলেন, শেষ প্রান্তিকে আমাদের খেলাপি ঋণ যেটি ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ দেখানো হচ্ছে, তা প্রকৃতপক্ষে ১৭ শতাংশ। দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংক খাতে মোট যে লোন আছে তার ছয় ভাগেরও বেশি এমন খারাপ ঋণ হয়ে গেছে, যা কোনো দেশের ব্যাংক খাত ও অর্থনীতির জন্য খারাপ সংকেত। নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে তাহলে এটার প্রভাব অর্থনীতিতে পড়বে। আমাদের এখানে একীভূতকরণের একটি গাইডলাইন সাত-আট বছর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক দিয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যাংকই তা করেনি। এছাড়া খেলাপি ঋণ গড়ে ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ হলেও সরকারি ব্যাংকে তা ২৬ থেকে ৩০ শতাংশ। জনগণ যারা কর দেয় এই খারাপ ঋণগুলো তো তাদের টাকা। এখানে কি কোনো জবাবদিহিতা নেই? অথচ ২০১৩ সালে রাজনৈতিক কারণে ৯টি ব্যাংককে অনুমোদন দেওয়া হলো এবং তাদের মধ্যে দুটির অবস্থা একেবারেই খারাপ। বিশেষ করে ফার্মাস ব্যাংক তো এখন ডিপোজিটরদেরও টাকা দিতে পারছে না। এমনকি কলমানি মার্কেটে অন্য কোনো ব্যাংক ফার্মাস ব্যাংককে টাকা দিচ্ছে না। একটি ব্যাংক আরেকটি ব্যাংককে বিশ্বাস করতে পারছে না। এতটা খারাপ অবস্থা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে সরকার নতুন করে ব্যাংকের অনুমোদন দেয়, সেটাই আসলে চিন্তার বিষয়।

 

শ্রুতি লিখন: রাহাতুল ইসলাম

 

 

 

 

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..