সারা বাংলা

নদীকে ধানি জমি বানিয়ে ইজারা নেওয়ার অভিযোগ

প্রতিনিধি, যশোর: যশোরের ঝিকরগাছায় জালিয়াতির মাধ্যমে কাগজে-কলমে একটি নদীকে ধানি জমি দেখিয়ে সরকারের কাছ থেকে ইজারা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলার রাধানগর গ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ভায়না নদীকে এখন মাছের ঘের ও চাষের জমিতে রূপ দেওয়া হচ্ছে।

গ্রামের বাসিন্দারা জানান, নদীটির এক মুখ শার্শার বেতনা নদীতে এবং অপরাংশ মিলিত হয়েছে চৌগাছার কপোতাক্ষে। ঝিকরগাছার বারবাকপুর গ্রামের কোরবান আলী, শ্রীরামকাটি গ্রামের নূর মোহাম্মদ মণ্ডল ও দিদার বক্স মণ্ডল এবং কামারপাড়া গ্রামের আবদুর রউফের নামে জাল কাগজ তৈরি করে হাল জরিপের সময় রেকর্ড ও জালিয়াতির মাধ্যমে নদীকে ধানি খাসজমি দেখিয়ে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় মোজাম্মেল হক জানান, স্থানীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে তাদের সাতজনের নামে ১৯৮৫ সালে নদীটি বরাদ্দ নেওয়া হয়। এক বছর পর তাদের দেওয়া বরাদ্দ জেলা প্রশাসকের দফতর থেকে নবায়নের জন্য আবদুর রশিদ মেম্বারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। মেম্বার আবদুর রশিদ পরে তাদের জানান, নদীটি আর তাদের নামে নেই, অন্য চারজন লিজ নিয়ে রশিদ মেম্বারের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। পরে তারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, রশিদ মেম্বার ও তার জামাতা লোকমান সুকৌশলে নদীটি কাগজে-কলমে দখল করে নিয়েছেন।

এদিকে নদীতে বাঁধ দিয়ে খণ্ড খণ্ড করায় বর্ষাকালে উপজেলার প্রায় ২০টি গ্রাম তলিয়ে যায়। নদীপারের বাসিন্দা রুকাইয়া খাতুন বলেন, কয়েক বছর আগেও এটি নদী ছিল। এখন হাঁস-মুরগিও নদীতে নামতে দেওয়া হয় না। গোসল করতে নামলে মারধর করা হয়। রাধানগর গ্রামের তাহের আলী মোল্লা বলেন, দস্যুরা ভায়না নদী দখল করে ঘের বানিয়ে মাছ চাষ করছে। আমাদের ওই পানি ব্যবহার করতে দেয় না। এখন পাট জাগ দিতে দুই-তিন কিলোমিটার দূরে বাঁওড়ে যেতে হয়।

নদীর পারের বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন নদী দখলের প্রতিবাদ করে ও জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ জানিয়েও কোনো ফল পাননি। বরং দখলদারদের হামলা ও হুমকির সম্মুখীন হতে হয়েছে তাদের। তাদের দাবি, এই ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার রশিদের জামাতা লোকমানের নেতৃত্বে কয়েকজন জায়গা দখল করে সেখানে মাছ চাষ করেন। স্থানীয় মানুষ ঘেরের পানিতে নামলে তাদের মারধরও করা হয়।

এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি সদস্য তবিবর রহমান বলেন, সাবেক মেম্বার আবদুর রশিদ ও তার জামাই লোকমান হোসেন কী করে যেন নদীটি দখল করে বাঁধ দিয়ে পুকুর বানিয়ে ফেলেন। কিন্তু গ্রামবাসীর বাধায় প্রথম দিকে তারা সেটি দখলে রাখতে পারেননি। পরে প্রভাবশালী লোকজনকে দিয়ে মাছ চাষ করাচ্ছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দখলকারী লোকমান হোসেন জানান, উপজেলার রাধানগর মৌজায় ৫৪৮ দাগের ওই জমির মালিক যথাক্রমে নূর মোহাম্মদ, দিদার বক্স মণ্ডল, কুরবান আলী দফাদার ও আবদুর রউফের কাছ থেকে তিনি জমিটি কিনেছেন। সেই জমিতে করা মাছের ঘের স্থানীয় একটি চক্র দখলের পাঁয়তারা করছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এই জমি নদীর নয়, ধানি জমি বলে জানান।

তবে তার দাবি অসত্য বলে জানিয়েছেন ইউনিয়ন তহশিল অফিসের নায়েব নেসার উদ্দিন আল আজাদ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন জালিয়াতি করে নদীকে ধানি জমি হিসেবে কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে। এসএ পর্চায় এটি নদী হিসেবে উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু আরএস পর্চায় রয়েছে ধানি জমি। ধানি জমি হিসেবে তৈরি করা কাগজপত্রে ব্যাপক অসংগতি রয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, এ বিষয়ে দখলদারদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করবেন তিনি।

বর্ষা মৌসুমে বেতনা নদীর পানি বেড়ে ভায়না নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়। দখলের পর নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করায় পানি নিষ্কাশনে বাধার সৃষ্টি হয়ে আশপাশের প্রায় ২০ গ্রামে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এ কারণে গত ২৮ অক্টোবর নদী পুনরুদ্ধারের দাবিতে যশোরের ডিসিসহ বিভিন্ন দপ্তরে তিন শতাধিক গণস্বাক্ষর-সংবলিত অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে যশোরের ডিসি শফিউল আরিফ জানান, নদী কখনও খাসজমি হিসেবে লিজ দেওয়া হয় না। বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য তিনি ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলবেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..