করপোরেট কর্নার

নদীরও রয়েছে নিজ ধারা বহমান রাখার অধিকার

আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনে বক্তরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: নদী অধিকার বলতে মূলত নদীর উপকূলে বসবাসকারী মানুষের অধিকারকে বোঝায়। তাই নদীরও রয়েছে তার নিজ ধারা বহমান রাখার অধিকার। এ জন্য নদীর স্বাভাবিক গতিধারাকে ব্যাহত না করে নদীর প্রবাহ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা এবং কৌশল নিতে হবে। গত বৃহস্পতিবার ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ‘নদীর অধিকার’ শীর্ষক সেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ভার্চুয়াল মাধ্যমে তিন দিনব্যাপী ওই আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনের আয়োজন করে।

সম্মেলনে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ এনভায়রনমেন্ট রিসার্চের প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আইনুন নিশাত বলেন, নদীর প্রবাহ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা এবং কৌশল নিতে হবে। এক্ষেত্রে নদীর বাৎসরিক গতিপ্রবাহকে আমলে না নিয়ে মাসিক গতিপ্রবাহকে বিবেচনায় নিতে হবে। এছাড়া বিবেচনায় আনতে হবে, বৃহৎ বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে সামাজিক এবং বাস্তুসংস্থান-সংক্রান্ত বিষয়গুলো। তিনি আরও বলেন, তিস্তা নদীর গতিপ্রবাহ শূন্যের কোটায় নেমে গেছে। এ সমস্যা সমাধানে বর্ষা মৌসুমে পানিকে সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহারের জন্য ব্যবস্থা

করতে হবে।

জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব এশিয়ান অ্যান্ড আফ্রিকান এরিয়া স্ট্যাডিজের সহযোগী অধ্যাপক ড. রোহান ডি’ সুজা বলেন, ১৯৩০ সাল থেকে দেশ গঠন এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাঁধ নির্মাণকে একটি অন্যতম নির্দেশক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এখন এ ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। তিনি বলেন, কারণ এ বাঁধকেন্দ্রিক উন্নয়ন নদীর প্রতি মানুষের চিরন্তন অধিকারকে অবজ্ঞা অথবা অস্বীকার করে। যদিও বলা হয়, বড় বাঁধগুলো হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানির একটি অন্যতম ভালো উৎস। ফলশ্রুতিতে প্রাকৃতিক সম্পদের সুবিধা জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়লেও স্থানীয়রা বঞ্চিত হচ্ছে।

ভারতের কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ স্কলার আদিল কাইয়ুম মোল্লাহ তার ‘বাংলাদেশ রিভার রাইটস: কনটেস্টিং দ্য তিস্তা ওয়াটার’ শীর্ষক উপস্থাপনায় উল্লেখ করেন, আন্তদেশীয় পানি ব্যবস্থাপনা দক্ষিণ এশিয়ার একটি উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এ পানি নিয়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তা দুটো দেশের ভৌগলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে।

বাংলাদেশ এবং ভারতের তিস্তা নদী ইস্যুতে ড. আদিল বলেন, তিস্তা এই দু’দেশের মধ্যে চতুর্থ বৃহৎ আন্তদেশীয় নদী। এবং ভৌগলিকভাবে ওপরে অবস্থিত ভারত কর্তৃক বড় বাঁধ নির্মাণের কারণে নিচের দিকে অবস্থিত বাংলাদেশে পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং অ্যাকশনএইড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সোসাইটির জেনারেল অ্যাসেম্বলি মেম্বার অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, অপরিকল্পিত সুইস গেট ও বাঁধ নির্মাণ, এশিয়ান পেপার মিল এবং অনন্যা আবাসিক এলাকার বর্জ্য ফেলার কারণে হালদা নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে হুমকিতে পড়েছে। তিনি বলেন, পরিবেশগত ভারসাম্যহীন ও দূষণের কারণে দেশের একমাত্র কার্প প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে মাছের ডিম উৎপাদনের হার কমে যাচ্ছে। দূষণ কম হওয়ার কারণে কভিড-১৯  মহামারিকালীন ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি ডিম উৎপন্ন হয়েছে, যা গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ওয়াটার রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের পাকিস্তানি বিশেষজ্ঞ হিনা লটিয়া বলেন, কভিডের কারণে সর্বত্র অসমতা বৃদ্ধি পেয়েছে বিশেষত: জেন্ডার অসমতা বেড়েছে আরও বেশি। সম্প্রতি নারী এবং শিশুরা বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হচ্ছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের পরিচালক ও অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরিন ‘আরবান ওয়াটার ইউজ: এ জেন্ডার অ্যানালাইসিস ফর পলিসি রিকমেন্ডেশন’ শীর্ষক উপস্থাপনায় বলেন, পানি খাতও জেন্ডার নিরপেক্ষ নয়। গৃহস্থালি কাজের জন্য পানি সংগ্রহের কাজটি নারী এবং কন্যা শিশুরাই মূলত করে থাকে। কভিড-১৯ মহামারিতে বারবার হাত ধোয়ার জন্য পানি সংগ্রহের ওপর আরও চাপ বেড়ে গেছে। এতে করে নারীদের বাড়তি কাজের বোঝা নিতে হচ্ছে।

অ্যাকশনএইড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সোসাইটির চেয়ারপারসন ব্যারিস্টার মনজুর হাসান ওবিই বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নদীর পানিপ্রবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আমাদের নদীর অধিকার নিয়ে কথা বলা উচিত যেমনটা বলা উচিত ব্যক্তির অধিকার নিয়ে। তিনি আরও বলেন, নদীর যত্রতত্র অপব্যবহারের ফলে বিশ্বব্যাপী উপকূলবাসীদের জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এছাড়া সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে বক্তব্য রাখেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব জিওগ্রাফি অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্টের পোস্ট-ডক্টোরাল গবেষক ড. ক্যাথরিন গ্রাশাম, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির, সাংস্কৃতিক কর্মী লুবনা মারিয়াম এবং আভাসের নির্বাহী পরিচালক রহিমা সুলতানা কাজল।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..