সম্পাদকীয়

নদী রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিন

নদী বাংলাদেশের প্রাণ। আমাদের সভ্যতা ও অর্থনীতিতে নদীর অবদান অপরিসীম। পুরোনো সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করেই। নদী কেবল আমাদের প্রকৃতি ও অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেনি, সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও এটি উঠে এসেছে প্রবলভাবে। নদীকে ঘিরে রচিত কবিতা, গান, উপন্যাস ও চলচ্চিত্র অনেক। একূল ভাঙে ওকূল গড়ে এই তো নদীর খেলা, সকাল বেলার আমির রে ভাই ফকির সন্ধ্যাবেলা, কিংবা নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল, নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস প্রভৃতি কবিতা পড়েনি এমন লোক খুঁজে পাওয়া দায়। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও খ্যাতি অর্জন করেছে নদীবহুল অঞ্চলের লোকগীতি ভাটিয়ালি।
নদীমাতৃক এ দেশে এখন নদী ক্রমেই কমছে। মানুষের লোভ-লালসার শিকার হয়ে দখলে-দূষণে মরতে বসেছে নদী। নদীভাঙনে বিপুল ক্ষতি হওয়ার পরই আমাদের নদী-চেতনা নতুনভাবে জেগে ওঠে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, তাতে দখলদাররা নিবৃত্ত হয় না।
নদী রক্ষায় আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়। নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেকে ঘোষণা দিয়ে নদী দখলদারদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন আদালত। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন জেলাওয়ারি নদনদীর অবৈধ দখলদারদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করেছে।
নদীর নির্বিচার দখলে পরিবেশসহ সার্বিক পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটে, এর দৃষ্টান্ত কম নয়। সামান্য বর্ষণে জলাবদ্ধতা, পানি-বর্জ্য নিষ্কাশনে সমস্যাই দেখা দেয়। বন্যা ভয়ংকর রূপ নেয়, ভয়াবহ নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিস্তীর্ণ জনপদ। নৌপথ সংকুচিত হয়ে বড় বড় শহর বা বন্দর গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিপর্যস্ত হয়। দখলদারদের তালিকা তৈরি হওয়ায় আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে যে, এবার নদীগুলো সুরক্ষা পাবে। কিন্তু গতকাল শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘নদী রক্ষায় সুফল নেই’ শীর্ষক প্রতিবেদন সাধারণ মানুষকে হতাশই করবে বলে ধারণা।
বিশ্ব নদী দিবস সামনে রেখে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বলেছে, প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে নদী রক্ষার উদ্যোগে সুফল মিলছে না।
ভাঙন রোধ ও নদীশাসনে প্রতিবছরই রাষ্ট্র অনেক অর্থ ব্যয় করে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের দেশপ্রেমবর্জিত ও লোভী মনোভাবের কারণে তার যথাযথ ব্যবহার হয় না বলেই সাধারণের ধারণা। বরাদ্দের বড় অংশই লোপাট হয়। এছাড়া আদালতের নির্দেশনা ও সরকারের নির্দেশনা নিচের স্তরে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। প্রশ্ন উঠবে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংসদ সদস্যদের নিয়েও তারা কী ভূমিকা রেখেছেন নদী দখল রোধে। নদীতে স্থাপনা বা বাঁধ নির্মাণ, কিংবা নির্বিচারে বালি উত্তোলন, সবই বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতাই কাম্য। নদীশাসনের পাশাপাশি মতলববাজদের শাসন করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা।

সর্বশেষ..