দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

নদী শাসনে অনুমোদনহীন উপকরণ ব্যবহার করছে চীনের ঠিকাদার

পদ্মা সেতু প্রকল্প

ইসমাইল আলী: পদ্মা সেতু প্রকল্পে নদী শাসনের কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন। নদী শাসনে ড্রেজিং ছাড়াও ফেলা হচ্ছে বালিভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ, পাথর, সিসি ব্লক ইত্যাদি। তবে এ কাজে অনুমোদনহীন জিও টেক্সটাইল উপকরণ ব্যবহার করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করায় এ নিয়ে আপত্তি তুলেছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও সেতু কর্তৃপক্ষ।

এদিকে পদ্মা সেতুর নদী শাসন অংশের বাস্তবায়ন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। এজন্য নদী শাসন প্যাকেজের মেয়াদ দ্বিতীয় দফা বাড়ানো হয়েছে। তবে করোনার কারণে প্রকৃতপক্ষে কবে নাগাদ এ কাজ শেষ হবে তা নিশ্চিত নয় ঠিকাদার, পরামর্শক বা সেতু কর্তৃপক্ষ কেউই।

পদ্মা সেতুর ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি সেতু বিভাগে এ প্রতিবেদন জমা দেয় যৌথভাবে ব্যবস্থাপনা পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করা যুক্তরাজ্যভিত্তিক রেন্ডাল লিমিটেড, বাংলাদেশের বিসিএল অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড এবং জাপানের পাডেকো কোম্পানি লিমিটেড ও কাটাহিরা অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্টারন্যাশনাল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় পদ্মা নদী শাসনে বিভিন্ন কার্যক্রম রয়েছে। এর মধ্যে নদী ড্রেজিং, নদীর তীরে বালিভর্তি ৮০০ কেজির জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলা, বালিভর্তি ১২৫ কেজির জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলা, বড় আকারের পাথর ফেলা, পাথরের তৈরি সিসি ব্লক ফেলা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন নদী শাসনে অনুমোদনহীন জিও টেক্সটাইল উপকরণ ব্যবহার করেছে।

চুক্তির শর্তানুসারে উপকরণ ব্যবহার না করায় তা নিয়ে আপত্তি ওঠে। এক্ষেত্রে চুক্তিতে উল্লিখিত জিও টেক্সটাইল ব্যাগের গুণাগুণ ও নতুন জিও টেক্সটাইল উপকরণের গুণাবলি কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ তা প্রমাণ করতে হবে ঠিকাদারকে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে সনদ সংগ্রহের সুপারিশ করেছে পদ্মা সেতুর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে কনসোর্টিয়াম। যদি যুক্তরাষ্ট্রের সনদে জিও টেক্সটাইল উপকরণের গুণাবলি যথাযথ না পাওয়া যায় তাহলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নদী শাসনে পুনরায় ক্ষতিপূরণমূলক বাড়তি কাজ করতে হবে।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, প্রকল্পটির নদী শাসন ব্যবহƒত নতুন জিও টেক্সটাইল উপকরণ পরীক্ষার জন্য গত মার্চে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জুলাই শেষে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার কথা ছিল। তবে করোনার জন্য প্রতিবেদন পাওয়া বিলম্বিত হচ্ছে। এছাড়া আগামীতে নদী শাসনে অনুমোদনহীন উপকরণ ব্যবহারে সতর্ক করেছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে সিনোহাইড্রোকে অবশ্য আগেই এ ধরনের উপকরণ পরীক্ষাপূর্বক সেতু কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এদিকে করোনার কারণে পদ্মা সেতু প্রকল্পের নদী শাসন কাজ বিলম্বিত হচ্ছে। এজন্য এরই মধ্যে এক দফা বাড়ানো হয়েছিল নদী শাসন প্যাকেজের মেয়াদ। তবে বর্ধিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় পদ্মা নদী শাসন প্যাকেজের মেয়াদ আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে।

সূত্রমতে, নদী শাসন প্যাকেজের চুক্তি সই করা হয়েছিল ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এক্ষেত্রে চার বছরের মধ্যে প্যাকেজটির কাজ শেষ করার কথা ছিল। সে হিসাবে নির্ধারিত সময় শেষ হয় ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। ঠিকাদারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরে তা বাড়িয়ে চলতি বছর জুন পর্যন্ত করা হয়েছিল। তবে বর্ধিত সময় শেষে নদী শাসন কাজের অগ্রগতি ৭৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এখনও প্রায় ২৪ শতাংশ পিছিয়ে আছে নদী শাসন।

এ অবস্থায় দ্বিতীয় দফায় আরও এক বছর সময় দেওয়া হয়েছে সিনোহাইড্রোকে। নতুন হিসাবে আগামী বছর জুনের মধ্যে নদী শাসনের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও করোনার কারণে কবে নাগাদ এ কাজ শেষ হবে, তা নিয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কেউ নিশ্চিত নয়।

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় পদ্মা সেতুর প্রধান দুই প্যাকেজের নির্মাণকাজ বিলম্বিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আগামী বছর জুনে কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে চিঠি দিয়েছে। তবে করোনার কারণে কোম্পনিটির জনবলের একাংশ চীনে গিয়ে আটকে গেছেন। তাই ঠিক কবে নাগাদ কাজ শেষ হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

উল্লেখ্য, প্রকল্পের কাজে বিলম্ব করার জন্য চীনের সিনোহাইড্রো করপোরেশনের পুরোনো দুর্নাম রয়েছে। এর আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের ৭টি প্যাকেজের ঠিকাদার হিসেবে কাজ করে কোম্পানিটি। ওই প্রকল্পে মোট ১০ প্যাকেজের মধ্যে অপর তিন প্যাকেজের কাজ দ্রুত শেষ হলেও সিনোহাইড্রোর অংশের মেয়াদ কয়েক দফা বাড়াতে হয়েছিল। বাস্তবায়ন বিলম্বে ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের ব্যয় তিন দফা বৃদ্ধি পায়।

এদিকে নদী শাসনের মতো পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামোর কাজও করোনার কারণে বিলম্বিত হচ্ছে। এ অংশের ঠিকাদার চায়না মেজর ব্রিজের সঙ্গে চুক্তি করা হয় ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর। ২০১৮ সালের ২৫ নভেম্বর অর্থাৎ চার বছরের মধ্যে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে বাস্তবায়ন বিলম্বে এ মেয়াদ দুই দফা বৃদ্ধি করে গত জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। তবে জুন পর্যন্ত মূল সেতুর বাস্তবায়ন হয়েছে ৮৮ দশমিক শূন্য আট শতাংশ। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্যাকেজটির মেয়াদ আগামী জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ায় প্রকল্পটির দুই অংশেরই (মূল সেতু ও নদী শাসন) ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..