দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

নভেম্বরে যাত্রীরা বৈধভাবে এনেছেন এক টন স্বর্ণ

রহমত রহমান: দেশে মার্চ থেকে করোনার প্রভাব শুরু হয়। শুরু হয় লকডাউন। কমে যায় বিয়েশাদিসহ অন্যান্য অনুষ্ঠান। এতে স্বর্ণের চাহিদা কমতে থাকে। তবে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও চাহিদা তেমন বাড়েনি। চাহিদা কমে যাওয়ার পরও বিদেশ থেকে স্বর্ণ আমদানি হঠাৎ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ব্যাগেজ রুলের আওতায় বিদেশফেরত যাত্রীরা বৈধ পথে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ নিয়ে আসছেন। চট্টগ্রামের হযরত শাহ আমানত বিমানবন্দরে শুধু নভেম্বর মাসে বৈধ পথে বিদেশফেরত যাত্রীরা স্বর্ণ ঘোষণা করেছেন এক হাজার ৯৫ কেজি, যাতে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

মাত্র এক মাসে যে স্বর্ণ আমদানি হয়েছে, তা গত অর্থবছরেও আমদানি হয়নি। মূলত কাস্টমসের বাড়তি নজরদারির কারণে স্বর্ণ ঘোষণা ও রাজস্ব পরিশোধে নজির সৃষ্টি হয়েছে। আগত যাত্রীদের স্বর্ণ ঘোষণায় রাজস্ব আহরণ বাড়লেও ভয়েও কারণ রয়েছে। চাহিদা না থাকলেও এসব স্বর্ণ যাচ্ছে কোথায়? পাচার বা ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের আদান-প্রদানের বিনিময় হার হিসেবে এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা গোয়েন্দা সংস্থাকে খতিয়ে দেখতে বলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দর কাস্টমস সূত্র জানায়, এ বিমানবন্দর দিয়ে নভেম্বর মাসে বিদেশফেরত যাত্রীরা ব্যাগেজ রুলের আওতায় স্বর্ণ ঘোষণা করেছেন এক হাজার ৯৬ কেজি বা এক টনের বেশি। রাজস্ব আদায় হয়েছে ১৯ কোটি ৫৫ লাখ ৬২ হাজার টাকা। কেবল নভেম্বর মাসে বৈধ পথে স্বর্ণ ঘোষণা আর রাজস্ব আদায় এ বিমানবন্দরের এ যাবৎকালের রেকর্ড। এর মধ্যে কেবল স্বর্ণবার ৯ হাজার ৩৬৭টি, যার ওজন এক হাজার ৮৬ কেজি। সে হিসেবে প্রতিদিন গড়ে স্বর্ণবার এসেছে ৩১২টি। অপরদিকে অক্টোবর মাসে স্বর্ণ এসেছে ২৫৯ কেজি, যার ওজন ২৫৯ কেজি। রাজস্ব আহরণ হয়েছে চার কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে স্বর্ণবার দুই হাজার ২২৪টি, যার ওজন প্রায় ২৫৭ কেজি। নভেম্বর মাসে অক্টোবর মাসের তুলনায় ৮৩৬ কেজি স্বর্ণ ও ১৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, ২০১৯ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত, অর্থাৎ ৯ মাসে বিদেশফেরত যাত্রীরা ব্যাগেজ রুলে স্বর্ণ ঘোষণা করেছেন ১০৪ কেজি ২৩৫ গ্রাম, যাতে রাজস্ব  আদায় হয়েছে চার কোটি ৭৫ লাখ টাকা। আর অক্টোবর ও নভেম্বরÑএই দুই মাসে স্বর্ণ ঘোষণা করেছেন এক হাজার ৩৫৪ কেজি, যাতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। দুই মাসে গড়ে প্রতিদিন স্বর্ণবার এসেছে ১৯৩টি, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে এ বিমানবন্দর দিয়ে দৈনিক গড়ে স্বর্ণবার আসত ৮৯টি। এছাড়া ২ অক্টোবর ৮২টি ও ১৫ অক্টোবর ১৬০টি স্বর্ণবার আটক করেছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। আর সেপ্টেম্বর মাসে এই বিমানবন্দর দিয়ে তিন কেজি ৭৯৫ গ্রাম স্বর্ণবার এনেছেন বিদেশফেরত যাত্রীরা।

সূত্র আরও জানায়, শাহ আমানতে সপ্তাহে দুদিন সরাসরি দুবাই থেকে ফ্লাইটে যাত্রী আসে, যেখানে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সপ্তাহে সাত দিন আসে। শাহ আমানতে দুদিন ফ্লাইট আসার পরও নভেম্বর মাসে এক টনের বেশি স্বর্ণ ব্যাগেজ রুলের আওতায় এসেছে। আর শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ব্যাগেজ রুলের আওতায় জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১৪০ কেজি স্বর্ণ এসেছে, যেখানে শাহ আমানতে অক্টোবর মাসে এসেছে ২৫৯ কেজি।

সূত্র জানায়, করোনার কারণে আন্তর্জাতিক রুটে উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ ছিল। ফলে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত আকাশপথে চোরাচালান বা বৈধ স্বর্ণ আনার সুযোগ ছিল না। আকাশপথ বন্ধ থাকায় বেকায়দায় পড়ে স্বর্ণ চোরাচালানকারীরা। সেপ্টেম্বর থেকে সীমিত আকারে উড়োজাহাজ চলাচল শুরু হয়। উড়োজাহাজ চলাচল শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চোরাচালান বাড়তে পারে বলে ধারণা করেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। ধারণা অনুযায়ী অক্টোবর থেকে শাহ আমানত বিমানবন্দরে যাত্রী ও যাত্রীদের ব্যাগ ও বিমানের সব জায়গায় তল্লাশি শুরু করা হয়। কাস্টমসের তৎপরতা দেখে চোরাচালানকারীরা সতর্ক হয়ে যায়। 

সূত্র আরও জানায়, ১৫ অক্টোবর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সহকারী কমিশনার মুনাওয়ার মুরসালীনের নেতৃত্বে বিমানে তল্লাশি করা হয়। এসময় বিমানের তিনটি সিটের নিচ থেকে কালো স্কেপে মোড়ানো ১৬০টি স্বর্ণবার উদ্ধার করা হয়, যার মূল্য প্রায় ১১ কোটি টাকা। স্বর্ণবার উদ্ধার হলেও কাউকে আটক করা যায়নি। বিমান তল্লাশির আগেই সব যাত্রী চলে যান। উদ্ধারের সময় সেখানে বিমানের কয়েকজন ক্লিনার ও সিকিউরিটির সদস্য ছাড়া কেউ ছিল না। কাস্টমস কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, ক্লিনার বা সিকিউরিটির সদস্যরা সুযোগ বুঝে স্বর্ণ সরিয়ে ফেলত। পরে কাস্টমসের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। এতে পুলিশ বিমানের কয়েকজন ক্লিনার ও সিকিউরিটির সদস্যকে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে। অপরদিকে কাস্টমসের তৎপরতা ও তল্লাশির জন্য চোরাচালানকারীরা বুঝতে পারে যে, চোরাপথে স্বর্ণ আনা যাবে না।

কর্মকর্তাদের ধারণা, অবৈধ পথ বন্ধ হওয়ায় যাত্রীদের টার্গেট করে চোরাচালানকারীরা। ব্যাগেজ রুলে ঘোষণা দিয়ে যাত্রী স্বর্ণ আনবে। স্বর্ণ বহনের জন্য প্রতি যাত্রীকে কিছু টাকা দেয়া হয়। মাত্র দুই মাসে শুধু এ বিমানবন্দর দিয়ে ঘোষণা দিয়ে এক হাজার ৩৫৪ কেজি স্বর্ণ আনা হয়েছে, যা অবৈধ পথে আসত। এতে সরকার রাজস্ব পেত না। তবে এ স্বর্ণের এত চাহিদা রয়েছে কি না, বা এ স্বর্ণ মাদক আদান-প্রদানে নগদ টাকার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানান কাস্টমস কর্মকর্তারা।

শাহ আমানতে দায়িত্বরত সহকারী কাস্টমস কমিশনার মুনাওয়ার মুরসালীন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘কমিশনার স্যারের নির্দেশে অক্টোবর থেকে আমরা আগত যাত্রী ও তাদের ব্যাগ এবং বিমানের সব জায়গায় তল্লাশি শুরু করি। বৃদ্ধি করা হয় গোয়েন্দা নজরদারি। ১৫ অক্টোবর আমরা ১৬০টি বার উদ্ধার করি। এতে চোরাচালানকারীরা সতর্ক হয়ে যায়। তৎপরতা ও তল্লাশি অব্যাহত থাকায় বৈধ পথে রাজস্ব দিয়ে স্বর্ণ আমদানি অভাবনীয় হারে বেড়ে গেছে। আমাদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তবে অন্য বিমানবন্দরগুলোয় এ ধরনের তৎপরতা বাড়ানো হলে চোরাচালান কমে যাবে, রাজস্ব বাড়বে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সভাপতি এনামুল হক খান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘কোনো না কোনো চাহিদা আছে বলেই তো স্বর্ণ আসছে। বৈধ পথে স্বর্ণ এলেও তো দেশের ক্ষতি নেই, সরকার রাজস্ব পাচ্ছে। বৈধ পথে স্বর্ণ এলে তো ফরেন্স কারেন্সিতে কোনো প্রভাব পড়ছে না। বৈধ পথে আনা বন্ধ করলে অবৈধ পথে আসবে।’ পাচার হচ্ছে কি নাÑএমন প্রশ্নের জবাবে সভাপতি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে এত কঠোর আইন করেও মাদক-চোরাচালান ঠেকাতে পারে না। আমাদের দেশে স্বর্ণ আমদানি আরও সহজ করা দরকার। বৈধ পথে দেশে স্বর্ণ এলে তো দেশের কোনো ক্ষতি নেই। যত বেশি কঠোর করা হবে, তত বেশি অবৈধ পথে আসবে। আর পাচার হচ্ছে কি না, তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলতে পারবে।’

আরো পড়ুন-বিমানের সিটের নিচ থেকে সাড়ে ১৮ কেজি স্বর্ণ আটক

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..