দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

নয়-ছয় করে মুনাফা বাড়িয়েছে আরডি ফুড

নিরীক্ষকের আপত্তি

পলাশ শরিফ: ডেফার্ড ট্যাক্স সমন্বয়ের হিসাব ও তথ্য প্রকাশে নয়-ছয় করে মুনাফা বাড়িয়ে দেখিয়েছে রংপুর ডেইরি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড (আরডি ফুড)। আর্থিক প্রতিবেদনের লাভ-লোকসানের বিবরণীতে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ টাকা ডেফার্ড ট্যাক্স সমন্বয়ের হিসাব-তথ্য দেয়নি কোম্পানিটি। বরং পুঞ্জীভূত মুনাফা থেকে ওই অর্থ বাদ দেওয়া হয়েছে। এভাবে সর্বশেষ আর্থিক বছরে মুনাফা প্রায় অর্ধেক ও ইপিএস ২৬ পয়সা বেশি দেখিয়েছে আরডি ফুড।

বিদ্যমান অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড না মানায় বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তুলেছে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান খান ওয়াহাব শফিকুর রহমান অ্যান্ড কোং।

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৯ সালের জুনে শেষ হওয়া আর্থিক বছরে উৎপাদিত দুগ্ধজাত খাদ্যপণ্য বিক্রি করে প্রায় ৬০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা আয় করেছে আরডি ফুড। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা উৎপাদন ব্যয় বাদ দিয়ে নিট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। ব্যাংক ঋণের কিস্তি ও শ্রমিকের মুনাফার অংশ পরিশোধ এবং ব্যবস্থাপনা, বিক্রয়-বিপণন ব্যয় মেটানোর পর প্রায় চার কোটি টাকা কর-পূর্ববর্তী মুনাফা করেছে কোম্পানিটি।

এদিকে ওই আর্থিক বছর শেষে আরডি ফুডের পুঞ্জীভূত বকেয়া আয়কর দাঁড়িয়েছে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ টাকা। ওই আয়কর সমন্বয়ের তথ্য সঠিকভাবে তুলে না ধরে আর্থিক বছর শেষে প্রায় তিন কোটি ১৭ লাখ টাকা কর-পরবর্তী

মুনাফা দেখিয়েছে কোম্পানিটি। বিদ্যমান অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড মেনে কর-পরবর্তী মুনাফা থেকে এক কোটি ৮০ লাখ টাকা আয়কর সমন্বয় করা হলে অন্যান্য ব্যয় বাদ দিয়ে সর্বশেষ আর্থিক বছর শেষে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা দাঁড়াত প্রায় এক কোটি ৩৭ লাখ টাকা, আগের আর্থিক বছরের তুলনায় যা প্রায় ৪৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ কম। কিন্তু তা না করায় উল্টো মুনাফা বেড়ে গেছে প্রায় ২৪ শতাংশ।

একইভাবে আর্থিক বছর শেষে ৪৬ পয়সা শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দেখিয়েছে আরডি ফুড, যা এর আগের বছরের চেয়ে ৯ পয়সা বেশি। কিন্তু নিয়ম মেনে সঠিক তথ্য তুলে ধরা হলে ইপিএস ২০ পয়সায় নেমে আসত, যা এর আগের আর্থিক বছরের তুলনায় ১৭ পয়সা কম। অর্থাৎ নিয়ম মেনে তথ্য প্রকাশ করা হলে আরডি ফুডের কর-পরবর্তী মুনাফা এক কোটি ৮০ লাখ টাকা ও ইপিএস ২৬ পয়সা কমে যেত। মূলত পিছিয়ে পড়ার তথ্য আড়াল করতেই তথ্য প্রকাশে নয়-ছয় করেছে কোম্পানিটি।  

অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, কোম্পানির ডেফার্ড ট্যাক্স বা পুঞ্জীভূত বকেয়া আয়কর থাকলে তা কর-পরবর্তী মুনাফার সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। কিন্তু আরডি ফুড কর-পরবর্তী মুনাফা ও ইপিএস অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরতে সেই নিয়ম ভঙ্গ করেছে। অন্যদিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোম্পানির পুঞ্জীভূত মুনাফা (রিটেইনড আর্নিংস) প্রায় ১২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা থেকে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ টাকা পুঞ্জীভূত বকেয়া আয়কর হিসেবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে কোম্পানিটির মুনাফা ও ইপিএসের তথ্য অতিরঞ্জিত হয়েছে বলে মত দিয়েছেন নিরীক্ষকরা।

নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান খান ওয়াহাব শফিকুর রহমান অ্যান্ড কোংয়ের মতে, বিদ্যমান অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড না মেনে পুঞ্জীভূত বকেয়া আয়করের তথ্য আর্থিক প্রতিবেদনে তুলে ধরায় মুনাফা ও ইপিএসের তথ্য অতিরঞ্জিতভাবে উঠে এসেছে। যে কারণে এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানটি।

যদিও আর্থিক প্রতিবেদনে তথ্য উপস্থাপনে নয়-ছয়ের বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছেন আরডি ফুডের দায়িত্বশীলরা। আলাপকালে কোম্পানিটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও কোম্পানি সচিব ইয়াসিন আরাফাত শেয়ার বিজকে বলেন, ‘অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড চালু হওয়ার পর থেকে নতুন নিয়মে হিসাব করছি। নিরীক্ষকরা কোম্পানির প্রতিষ্ঠাকাল থেকে অদ্যাবধি ডেফার্ড ট্যাক্স হিসাব করেছেন। যেহেতু ওই টাকাগুলো সব চলতি আর্থিক বছরের নয়, তাই লাভ-লোকসানের জায়গায় দেখানো হয়নি। বরং পুঞ্জীভূত রিটেইনড আর্নিংস থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে নিরীক্ষকের সঙ্গে বিতর্কের কারণে ‘এভাবে হিসাব করায় মুনাফা-ইপিএস অতিরঞ্জিত হয়েছে’ বলে নিরীক্ষকরা কোয়ালিফায়েড অপিনিয়ন দিয়েছেন।’

উল্লেখ্য, ২০১১ সালে পুঁজিবাজারে আসা রংপুর ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টসের পরিশোধিত মূলধন প্রায় ৬৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৩১ দশমিক ৩৫ শতাংশ উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে। এর বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৫২ দশমিক ৯৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। প্রতি বছর বোনাস লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানিটি সর্বশেষ আর্থিক বছরে পাঁচ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছে। এর জের ধরে ‘বি’ ক্যাটেগরিতে নেমেছে আরডি ফুড। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গতকাল কোম্পানিটরি প্রতিটি শেয়ার সর্বশেষ ১২ টাকা ৯০ পয়সায় লেনদেন হয়েছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..