সারা বাংলা

নানা প্রতিবন্ধকতায় হতাশ নোয়াখালীর কৃষকরা

আকাশ মো. জসিম, নোয়াখালী:‘জীবন ও জীবিকার তাগিদে মাটির সঙ্গে সংগ্রাম করেই বেঁচে আছে বাংলার কৃষক। বলা হয়ে থাকে, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। আর দেশ বাঁচলে আমরা বাঁচব। তবুও কৃষকের ন্যায্য পাওনাটা দিতে কৃপণতা করি আমরা।’ কথাগুলো বলেন সুবর্ণচরের পেশাদার কৃষক আমান উল্লাহ মিয়া। তিনি আরও বলেন, ফসল উৎপাদনে অনেক ক্ষেত্রে তারা কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি সংস্থা থেকে আর্থিক সহযোগিতা বা ঋণ পান না। তবুও ধারদেনা কিংবা চড়া দাদন নিয়ে চাষাবাদের মাধ্যমে কেবল পরোপকারে জীবন দিয়ে লড়াই করে চলছেন।

জেলার আরেক কৃষক সুলতান আহমেদ বলেন, প্রকৃত দেশপ্রেমিক এই কৃষকরা। যদি কোনোদিন তারা তাদের ন্যায্য পাওনার অধিকার আদায়ে প্রতিশোধস্বরূপ ফসল উৎপাদন বন্ধ রাখেন, তবে অট্টালিকায় থাকা প্রভাবশালীসহ আমাদের প্রত্যেকেরই বেঁচে থাকা দায় হয়ে পড়বে।

জেলার সুবর্ণচর উপজেলাধীন চর ওয়াপদা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল উত্তর চরকাজী মোখলেছ গ্রামে সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ৯ একরের বিশাল এলাকাজুড়ে আবাদকৃত মৌসুমি সবজি ক্ষেত, কিন্তু কৃৃষকের মুখে হাসি নেই। তারা কৃষকের দুর্দশা ও মৌসুমি সবজি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে নানা প্রতিবন্ধকতার কথা জানান।

কথা হয় উত্তর চরকাজী মোখলেছ গ্রামের মৃত মমিন উল্লার ছেলে কৃষক জয়নাল আবেদীন হাজারী ও আবু তাহেরের ছেলে কৃষক আবু জাহেরের সঙ্গে। তারা জানান, এ বছর তারা ৯ একর জমিতে চাষ করেন শীতকালীন সবজি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে লাউ, মিষ্টিকুমড়া, মিষ্টিআলু, বেগুন, টমাটো, শসা, শিম ও রবিশস্য কাঁচামরিচ। ৯ একর জমি চাষে হালচাষ, বীজ, সার, কীটনাশক, কৃষি উপকরণ ও মজুরিতে তাদের খরচ হয়েছে প্রতি একর জমিতে ৬৬-৬৭ হাজার টাকা।

এ বছরের অনাবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, বারবার শৈত্যপ্রবাহ প্রভৃতি কারণে যথাসময়ে সবজি পরিপক্ব হয়নি। ফলে প্রায় সব ধরনের সবজিই দেরিতে তুলতে হচ্ছে মাঠ থেকে। এতে বর্তমানে তারা বাজারেও পাচ্ছে না সবজির নায্যমূল্য। যেটুকু মূল্য পাচ্ছে তাতেও সুবিধা নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী সবজি ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা। কারণ ক্ষেত থেকে সবজি তুলে নিজ দায়িত্বেই পৌঁছে দিতে হচ্ছে স্থানীয়সহ জেলার সোনাপুর, দত্তেরহাট, পৌরবাজার, বেগমগঞ্জ চৌরাস্তা ও চৌমুহনীর কাঁচা বাজারের আড়তগুলোতে। আড়তদাররা সবজি বুঝে নিয়ে সাত-আট দিন পর কম পরিমাণে পরিশোধ করছে সবজির মূল্য। প্রতিবার টাকা আনতে গিয়ে যানবাহনসহ পথ খরচ হয় প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এর ফলে বিক্রীত সবজির প্রতি কেজির মূল্য হ্রাস পেয়ে ১০ টাকারও নিচে নেমে এসে দাঁড়ায়। অথচ খুচরা বাজারে প্রতিটি লাউ ৮০ থেকে ১০০ টাকা, টমাটো প্রতি কেজি ৩৫-৪০ টাকা, শিম প্রতি কেজি ৩০-৩৫ টাকা, মিষ্টিকুমড়া প্রতি কেজি ৩৫-৪০ টাকা, মিষ্টিআলু প্রতি কেজি ২৫-৩০ টাকা, বেগুন প্রতি কেজি ৩৫-৪০ টাকা ও কাঁচামরিচ প্রতি কেজি ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এতে কৃষকের ঘামঝরানো পরিশ্রমের সুফল প্রকৃত চাষিরা পাচ্ছে না, পাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। এ কারণে মাঠভরা সবজি থাকলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। ঋণের দায়ে দিশাহারা কৃষক। ফলে ক্রমান্বয়ে কৃষকেরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে সবজি ও অন্যান্য রবিশস্য চাষাবাদ থেকে। ধান, রবিশস্য, সবজি ইত্যাদির জন্য বিখ্যাত নোয়াখালীর দক্ষিণাঞ্চল হারাচ্ছে তার ঐতিহ্য।

এ বিষয়ে জেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. আবুল হোসেন আলাপকালে দেশের জলবায়ুর পরিবর্তনের অভিযোগের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কৃষকদের কৃষি অফিসের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার বিষয়কে দায়ী করেন। তিনি আরও জানান, প্রতিটি এলাকায় তাদের মাঠকর্মী থাকা সত্ত্বেও দু-একজন কৃষক ছাড়া কেউই মাঠকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ না করায় তারা যেমন কৃষকের সমস্যা জানছে না, তেমনি কৃষকও প্রতিনিয়িত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কৃষিকাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগীর বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, এ বিষয়ে কোনো কৃষক তাদের প্রত্যক্ষ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে আশ্বস্ত করেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..