সম্পাদকীয়

নামসর্বস্ব কোম্পানিকে নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিহাস

 

ঢাকা-পায়রা বন্দর রেলপথ নির্মাণের উদ্দেশ্যে ব্রিটেনের ডিপি রেলের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয় গত বছর ডিসেম্বরে। এ এমওইউতে নন-বাইন্ডিং রয়েছে তথা বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা নেই। তবু এই নন-বাইন্ডিং ফ্যাক্টরটি তাৎপর্যপূর্ণ সন্দেহ নেই। তাছাড়া ওই একটিমাত্র ফ্যাক্টরের আলোচনাতেও এ তথ্যগুলো উদ্ভাসিত যে, ৭৫০ কোটি ডলার বা আনুমানিক ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির নকশা প্রণয়ন, লাইন নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালনে ইচ্ছুক ডিপি রেল। অবশ্য এখানে তাদের সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকবে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিআরসি)। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, এফডিআই পদ্ধতিতে এর অর্থায়ন তহবিল সংগ্রহ করবে ডিপি রেল। এসব প্রত্যাশা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ডিপি রেল আলোচ্য প্রকল্প অর্থায়নের সামর্থ্য রাখে কি নাÑপ্রশ্ন উঠেছে সেটি নিয়েই। তার কারণ অযৌক্তিক নয়। জানা যায়, ২০১৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর লন্ডনে কোম্পানিজ হাউজে লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয় প্রতিষ্ঠানটি। এর মোট জনবল ১১ জন, যার মধ্যে একজন আবার কোম্পানি সচিব হিসেবে নিযুক্ত। বাকিদের সবাই নাকি পরিচালক এবং এদের বেশিরভাগের নিয়োগ ২০১৬ সালের ২ এপ্রিল বা তার পরে। এদিকে কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে যে ধরনের তথ্যাদি মেলে, তা থেকেও আশাবাদী হওয়া কঠিন। ২০১৪ ও ২০১৫ সালের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী কোম্পানিটির মূলধন ১০০ পাউন্ড তথা প্রায় ১০ হাজার টাকাতেই অপরিবর্তিত। উপরন্তু এর ১০০ পাউন্ডের মূলধন ১ পেনি বা ১ টাকা মূল্যের ১০ হাজার শেয়ারে বিভক্ত। আরও জানা যায়, তিন বছর বয়সী এ ক্ষুদ্র কোম্পানিটি গঠনের পর থেকে কোনো কাজ করেনি অর্থাৎ ডরমেন্ট অবস্থায় ছিল। প্রথম কথা হলো, ১০ হাজার টাকার মূলধন নিয়ে কোনো কোম্পানি যদি ঢাকা-পায়রা বন্দর রেলপথ নির্মাণে সক্ষম হয়, তাহলে সেজন্য দূরদেশে যাওয়ার কী প্রয়োজন ছিল? স্থানীয় একজন তৃতীয় শ্রেণির ঠিকাদার ধরলেই হতো!

খেয়াল করার মতো বিষয়, কোনো কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি এমনি এমনি হয় না। প্রধানত আগ্রহী কোম্পানির আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা, কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভার, একই ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা ও কাজ-সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ জনবল প্রভৃতি বিষয়ের সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নের পরই কোম্পানির নাম উঠে আসে সুপারিশের জন্য। সেসব ধাপ কীভাবে পেরোলো ডিপি রেল, তার একটা অনুসন্ধান হওয়া প্রয়োজন বৈকি। শোনা যায়, ডিপি রেলকে ওই প্রকল্পের কাজটি দেওয়ার জন্য নাকি খোদ ব্রিটিশ হাইকমিশনারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছিল। সে অনুরোধের সিদ্ধান্ত কি ব্যক্তিগত না অফিসিয়াল ছিল, আমাদের জানা নেই। তবে ইস্যুটি যখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত গড়িয়েছে, ওই সরকার ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত করবে এমনটাই প্রত্যাশিত। এক্ষেত্রে গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘ঢাকা-পায়রা বন্দর রেলপথ নির্মাণ: ডিপি রেলের বিষয়ে খতিয়ে দেখছে ব্রিটিশ সরকার’ শীর্ষক খবরটি অনেক পাঠকের মনে আশাবাদ জাগিয়ে তুলবে। ব্রিটিশ সরকার দ্রুত তা জনসমক্ষে প্রকাশ করবে, এটাও কাম্য। আমাদের প্রান্ত থেকেও একই রকম তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, কে বা কারা এবং কোন উদ্দেশ্যে ১০ হাজার টাকার একটি কোম্পানিকে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে কাজ করার জন্য মনোনীত করছিল। প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়ন আবশ্যক বটে। কিন্তু যেনতেন ও নামসর্বস্ব কোম্পানিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে নিযুক্ত করা অনেকের কাছেই পরিহাস মনে হতে পারে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক অক্ষুন্ন রেখে শুধু নয়, বরং গুণগত বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সুসম্পর্ক বৃদ্ধিতে জোর দেবে এমনটাই প্রত্যাশিত।

সর্বশেষ..