মত-বিশ্লেষণ

নারীর আয় বর্ধনমূলক কাজে সমৃদ্ধ হবে দেশের অর্থনীতি

কাজী রিয়াদ হোসেন: বাংলাদেশের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে, সব ধরনের কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করছে। পরিবারের সচ্ছলতা আনতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছে। সংসার, স্বামী-সন্তানকেও সামাল দিচ্ছে। স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে চাকরি করার হার দ্রুত বাড়ছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে ক্রমাগতভাবে। স্বামী-স্ত্রী দুজনই কাজ শেষে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরলেও টিভি দেখার সময় স্বামীর হাতে গরম চায়ের কাপটা তুলে দিচ্ছে নারীই। নারীরা কেবল তা পারে, নারী বলেই তা সম্ভব।

২০১৩ সালে শ্রমশক্তির বাইরে ছিল তিন কোটি ৬১ লাখ নারী, যা ২০১৭ সালে কমে তিন কোটি ৪৫ লাখে দাঁড়ায়। প্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। নারীরা পূর্ণকালীন কাজ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের খণ্ডকালীন কাজে নিয়োজিত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কাজে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। নারীরা এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মী হিসেবে যাচ্ছে এবং এ হারও যথেষ্ট ঊর্ধ্বমুখী। বিদেশে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত ৭৬ লাখ প্রবাসীর মধ্যে নারী ৮২ হাজার ৫৫৮ জন।

নারীর এ অগ্রযাত্রা শুধু চাকরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, উদ্যোক্তা হিসেবেও আত্মকর্মসংস্থানে নিজেকে নিয়োজিত করেছে। ক্ষুদ্রঋণের ৯০ শতাংশের ব্যবহারকারী হিসেবে রয়েছে আমাদের নারীরা। তাদের এগিয়ে যাওয়ার এ পথ কিন্তু কুসুমাস্তীর্ণ নয়। স্বামী, সন্তান ও পরিবারকে সামলিয়ে রাস্তাঘাট, যানবাহন ও কর্মস্থলের নানা ধরনের প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ করেই তাকে কর্মবাজারে টিকে থাকতে হচ্ছে।

বর্তমান যুগ বিশ্বায়নের যুগ। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সস্তাশ্রম, বিশেষত নারী কর্মীর পারিশ্রমিক কম বলে পৃথিবীর বড় কোম্পানিগুলো বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গড়ে তোলে। উচ্চ শ্রমমূল্যের কারণে উন্নত দেশগুলোতে যেসব পণ্য উৎপাদন ব্যয়বহুল, সেসব পণ্য তৈরির প্রতিষ্ঠান স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশে গড়ে উঠছে। আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পের অন্যতম উপকরণ সস্তাশ্রম। এ খাতের ৮০ শতাংশ কর্মীই নারী, যার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। এ শিল্পের যাত্রার শুরু থেকেই নারীর অবদান ব্যাপক এবং পর্যায়ক্রমে তা আরও বেড়েছে। তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণের পর থেকে পারিবারিক পর্যায়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনে পরিবারে তাদের গুরুত্ব বেড়েছে।

পুরুষের সমান কাজ করেও নারী শ্রমিক মজুরি পায় কম। অথচ বিআইডিএসের গবেষণায় পাওয়া তথ্যমতে, কর্মক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীর মনোযোগ ও আন্তরিকতা বেশি। নারী শ্রমিক পুরুষ শ্রমিকের সমান পারিশ্রমিক কেন পায় না? ধরেই নেওয়া হয়, পুরুষের সমান শ্রম দিতে পারে না কোনো নারী, এটা অবাস্তব যুক্তি। কোনো পুরুষ শ্রমিক সারা দিন আট বা ১০ ঘণ্টা কাজ করে, কোনো নারী শ্রমিকও সমপরিমাণ কাজই করছে। বরং পুরুষ শ্রমিকের কাজে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে।

সিপিডির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে নারীরা দৈনিক গড়ে সাত দশমিক সাত ঘণ্টা বেতনহীন ঘরের কাজে ব্যয় করে। পুরুষরা ব্যয় করে মাত্র দুই দশমিক পাঁচ ঘণ্টা। শ্রমবাজারে বাংলাদেশের নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও দৈনিক মজুরির ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েই গেছে। অবশ্য আগের তুলনায় উন্নতি হয়েছে, মজুরিবৈষম্য সামান্য কমেছে।

গত দুই দশকে নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দেখা যায়, অধিকসংখ্যক নারী ঘরে-বাইরে বেতনভুক্ত কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছে। ফলে তাদের মধ্যে বেকারত্ব ও অর্ধবেকারত্বের হার কমে আসছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে নারীর কাজের সুযোগ ও চাহিদা দুটোই বেড়েছে। সেইসঙ্গে নারীশিক্ষার হার বাড়ছে এবং উচ্চশিক্ষায়ও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় একক আয়ে পারিবারিক চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই নারীরা কম আয়ের কাজ হলেও সেগুলোতে নিয়োজিত হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতার অভাবে নারীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বল্প আয়ের এবং অপেক্ষাকৃত নিচু পর্যায়ের পেশাও গ্রহণ করছে।

বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষামতে, কৃষিতে নারীর অবদান গড়ে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ। তারপরও মোট দেশজ উৎপাদন জিডিপিতে তাদের অবদান অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। নারী যে কৃষিকাজ করে, তার স্বীকৃতিও আগে ছিল না। অর্থনৈতিক সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাব খোলা ও অনলাইন অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে আছে। পত্রপত্রিকা পড়া ও মুঠোফোন ব্যবহারে এখনও পিছিয়ে থাকায় অবাধ তথ্যপ্রবাহ থেকে গ্রামীণ নারীরা অনেকটা বঞ্চিত।

কর্মস্থল, রাস্তাঘাট, দোকানপাট ও গণপরিবহন ছাড়াও ক্ষেত্রবিশেষে স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী নারীদের প্রতি অশালীন আচরণ তাদের ঘরের বাইরে বের হওয়া বাধাগ্রস্ত করে। আধুনিক যুগে এসেও কর্মক্ষেত্রে সহমর্মিতা না পাওয়া একজন নারীর জন্য বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। নারী শ্রমিকদের মধ্যে যারা ইটভাঙা, মাটিকাটা, রাইস মিলের চাতালের কাজ এবং মালামাল বহনের কাজ করে, তাদের অনেককে শিশুসন্তান সঙ্গে নিয়েই কাজ করতে হয়। তীব্র রোদ ও প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির মধ্যে কোলের শিশুকে নিয়ে কাজ করা অত্যন্ত কষ্টকর। সন্তানকে নিয়ে কাজ করার কারণে মালিক পক্ষের বকাঝকাও শুনতে হয়।

দেশের অর্থনীতির গতিময়তা বজায় রাখতে হলে নারীদের কর্মসংস্থানের হার বাড়াতে হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। জনসংখ্যার অর্ধেক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে না পারলে প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। বর্তমানে দেশে ডেমোগ্রাফি ডিভিডেন্ড সুবিধাও উল্লেখযোগ্য। মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বেশি তরুণ। নারীদেরও একটি বড় অংশ তরুণ ও কর্মক্ষম। তাদের শ্রমবাজারে আনতে হলে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি খাতে বিভিন্ন ধরনের ইতিবাচক উদ্যোগ নিতে হবে। নারীদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতিমালার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। নারীদের উচ্চশিক্ষিত করতে হবে এবং এর সঙ্গে তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শ্রমবাজারের জন্য দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে মেয়েদের অংশগ্রহণের হার ছেলে শিক্ষার্থীদের চেয়ে বেশি। এ ধারা অব্যাহত রাখার জন্য বর্তমান সরকার ডিগ্রি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করেছে। উপবৃত্তি, স্কুলে দুপুরের খাবার, বিনা মূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ নারী শিক্ষায় প্রণোদনা জোগাচ্ছে।

বর্তমানে কারিগরি শিক্ষার প্রসারে জোর দিচ্ছে সরকার। দেশব্যাপী কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে। নারীদের কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দিলে শহরাঞ্চলে বেশি আয়ের কাজগুলোতে নারীরা অংশগ্রহণ করতে পারবে এবং তাদের আয় বাড়বে। কর্মজীবী মায়ের সন্তানের বিষয়টি মাথায় রেখে সরকার জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনে উদ্যোগী হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হলে একজন নারী শ্রমিক সেখানে সন্তান রেখে নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন। নারী শ্রমজীবীর সংখ্যা আরও বাড়বে। এ কাজে ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, সমাজসেবা অধিদফতর, মহিলাবিষয়ক অধিদফতর, জাতীয় মহিলা সংস্থা এবং নারী ও শিশু নিয়ে কাজ করা এনজিওগুলোকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।

গ্রামীণ কৃষিবহির্ভূত অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। বাড়ছে স্ব-নিয়োজিত নারীদের সংখ্যাও। বর্তমানে প্রায় এক-চতুর্থাংশ নারী নিজেই উদ্যোগ নিয়ে আয় বর্ধনকারী কাজে নিয়োজিত। সরকার নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। ইন্টারনেটসেবা গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। গ্রামীণ কিষানি অ্যাপ ব্যবহার করে কোন জমিতে কী ফসল ফলাতে হবে, কী সার দিতে হবে, তা জানতে পারছে। এসব সম্ভব হয়েছে সরকারের দূরদর্শী নীতি বাস্তবায়নের ফলে। এখন প্রয়োজন উচ্চ আয়ের পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং তাদের ধরে রাখার জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসা।

পিআইডি নিবন্ধ

সর্বশেষ..