মত-বিশ্লেষণ

নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসনে গৃহীত পদক্ষেপ ও করণীয়

প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য:পৃথিবীতে যা কিছু কল্যাণকরÑঅর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অভ্রভেদী এ উক্তি কখনও ম্রিয়মাণ হবে না। সভ্যতার প্রাথমিক স্তর থেকে পরিবার তথা সমাজ বিনির্মাণের প্রতিটি ধাপে নারীর ভূমিকা ছিল সবার ঊর্ধ্বে। আবার সভ্যতার ভিত্তিমূল হচ্ছে কৃষি। কৃষিকে ভিত্তি করেই সভ্যতা বিকশিত হয়েছে। যতদূর জানা যায়, কৃষির উৎপত্তি হয়েছে নারীদের হাতেই। পর্যায়ক্রমে পরিবার, সমাজ, নিরাপত্তা, চাহিদা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ ক্রমান্বয়ে বিকশিত হয়ে আজকের আধুনিক সমাজব্যবস্থায় পুরুষের পাশাপাশি নারীদের অবদান অনস্বীকার্য। মহাবিশ্বের পৃথিবী নামক গ্রহের ওপর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব স্থাপন করেছে মানুষ। সেই মানুষই লিঙ্গভেদে বিভাজিত হয়েছে প্রকটভাবে। লিঙ্গগত কারণেই মানুষকে স্ত্রী ও পুরুষ প্রজাতিতে বিভক্ত করা হয়েছে। কালের পরিক্রমায় সামাজিক বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নারী-পুরুষের মধ্যে বিভাজন ক্রমাগত বাড়তে থাকে। লিঙ্গগত এ বিভাজন নানাভাবে সামাজিক, অর্থনৈতিক এমনকি রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করেছে নারী-পুরুষের মাঝে। বিভাজন ধীরে ধীরে নারী-পুরুষের মাঝে প্রকট বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। নারীরাই এই বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৈষম্য নারী নির্যাতনের পর্যায়ে চলে যায়।

নারীর প্রতি বৈষম্য শুধু যে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর তা কিন্তু নয়, বরং উন্নত দেশেও নারীর প্রতি বিভিন্ন মাত্রার বৈষম্য রয়েছে। এটিকে বৈশ্বিক সমস্যা বলা যেতে পারে। বৈশ্বিক সমস্যার কারণেই জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রায় আটটি লক্ষ্যের মধ্যে দুটিই ছিল নারীর উন্নয়ন-সংক্রান্ত। এ লক্ষ্যমাত্রার তৃতীয় লক্ষ্যটি ছিল লিঙ্গসমতা উন্নীত করা এবং নারীর ক্ষমতায়ন। পঞ্চম লক্ষ্যটি ছিল মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়ন। একইভাবে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের পঞ্চম লক্ষ্যটি হচ্ছে লিঙ্গসমতা অর্জন এবং সব নারী ও মেয়ের ক্ষমতায়ন।

নারী ক্ষমতায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে রাষ্ট্র ও পুরুষ সমাজ। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে নারীর অবস্থান আগের তুলনায় অনেক সুদৃঢ় হলেও তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এমনকি রাজনৈতিক অবস্থান এখনও দুর্বল। এই দুর্বলতা থেকে উত্তরণের পথ হচ্ছে নারীর জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে একটি সমন্বিত আইনি পরিকাঠামো গঠন করা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে নারী অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এই সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জš§স্থানের কারণে নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না।’ ২৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ ২৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোনো বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোনো নাগরিককে কোনোরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না।’ ২৮(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান-প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।’

বাংলাদেশের সংবিধানে নারী অধিকার নিশ্চিত করার দৃঢ় অঙ্গীকার রয়েছে এবং এই সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বহুমাত্রিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সংবিধান ছাড়াও বাংলাদেশের নারীদের সুরক্ষা এবং কল্যাণের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন আইন, যেমনÑবাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭, বাল্যবিবাহ নিরোধ বিধিমালা-২০১৮, যৌতুক নিরোধ আইন-২০১৮, ডিএনএ আইন-২০১৪, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন-২০১০, এসিড নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন-২০১০, এসিড অপরাধ দমন আইন-২০০২ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ প্রণীত ও বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব আইনের মাধ্যমে নারী নির্যাতনের ঘটনা কমিয়ে আনার আইনি পরিকাঠামো সৃষ্টি করা হয়েছে। তারপরও শুধু আইনি পরিকাঠামোর মাধ্যমে নারী নির্যাতন বন্ধ করে নারীকে ক্ষমতায়িত করা সম্ভব নয়। আইনের নিখুঁত প্রয়োগের পাশাপাশি সমাজের মূলশক্তি ও সমাজশক্তির সমন্বিত এবং দৃঢ় প্রতিবাদের প্রয়োজন রয়েছে।

নারীর প্রতি বৈষম্য কোনো দেশের একক সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই শুধু জাতীয়ভাবে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও নারীর প্রতি বৈষম্য এবং নারীর অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৪৮ সালে নারী-পুরুষ সবার সমান মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ কর্তৃক মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (Universal Declartion of Human Rights) গৃহীত হওয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে নারী অধিকারের পথ প্রশস্ত হয়। নারীর রাজনৈতিক অধিকার, বিবাহিত নারীর জাতীয়তা সংরক্ষণ, মানবপাচার ও পতিতাবৃত্তির অবসানসহ নারীর উন্নয়নে জাতিসংঘ বহুমাত্রিক বৈশ্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ১৯৭৫ সালকে নারী বছর ঘোষণা, ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত এই ১০ বছরকে নারী দশক হিসেবে ঘোষণা করে জাতিসংঘ। এছাড়া ১৯৭৯ সালে সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের লক্ষ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ কনভেনশন গৃহীত হয়। প্রয়োজনীয় সংখ্যক রাষ্ট্রপক্ষের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে ১৯৮১ সালে কনভেনশনটি কার্যকারিতা লাভ করে। নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ কনভেনশন সবচেয়ে ব্যাপক ও আইনগতভাবে অবশ্যপালনীয় নারীর মানবাধিকার। এটিকে নারীর আন্তর্জাতিক বিল অব রাইটস হিসেবে অবহিত করা হয়। এই কনভেনশন নারীর প্রতি বৈষম্যের অবসান ঘটাতে জাতীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা গ্রহণের একটি অ্যাজেন্ডা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

জাতিসংঘ ৮ মার্চকে বিশ্ব নারী দিবস হিসেবে গ্রহণ করেছে, যা নারীর ক্ষমতায়নের একটি মাইলফলক। জাতিসংঘের প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী দিবস উদ্যাপন করে। নারী দিবস পালনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী নারী-পুরুষের বৈষ্যম্য রোধে গণসচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নারীর মৌলিক মানবাধিকার, নারী পাচার রোধ, যৌতুক, বাল্যবিয়ে, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ, ইভটিজিং প্রভৃতি নির্যাতনমূলক কার্যক্রমকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে তা বন্ধের আইনি পরিকাঠামো সৃষ্টি হয়েছে। নারীর প্রজনন-স্বাস্থ্য উন্নয়ন, মাতৃমৃত্যু হ্রাস, মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ নানা কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাংলাদেশসহ অধিকাংশ রাষ্ট্রই বাস্তবায়ন করছে। তারপরও নারীর প্রতি বৈষম্য সম্পূর্ণ বিলোপ হয়েছে, তা বলা যাবে না।

বাস্তবতা হচ্ছে নারী-পুরুষের বৈষম্য শূন্যে নিয়ে আসতে হলে নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিপূর্ণ সক্ষমতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। যদিও সক্ষমতা অর্জন একটি বহুমাত্রিক ও তাত্ত্বিক শব্দ। যখন ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞান উপযুক্ত পরিবেশে প্রয়োগ করা যায়, কেবল তখনই সক্ষমতা বিকশিত হতে পারে।

বাংলাদেশে নারীর উন্নয়নে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ একাধিক মন্ত্রণালয় কাজ করছে। নারী উন্নয়নে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মসূচি, যেমনÑনারীদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জয়িতা ফাউন্ডেশনের অধীনে বিভিন্ন সমিতির নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য বাজারজাতকরণ, মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের অধীন নিবন্ধিত মহিলা সমিতিভুক্ত দরিদ্র নারী এবং দুস্থ অসহায় নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তাদের তৈরি পোশাক, পণ্যসামগ্রী বিক্রির জন্য রাজস্ব বাজেটের আওতায় অধিদফতরের সদর কার্যালয়ে বিক্রয় ও প্রদর্শনী কেন্দ্র ‘অঙ্গনা’ পরিচালনা, আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম, মাতৃত্বকালীন ভাতাপ্রাপ্ত মায়েদের জন্য ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগী মায়েদের স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারসহ আবাসনের ব্যবস্থা করা; গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের আয়বর্ধক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা, দুস্থ অসহায় নারীদের সেলাই মেশিন বিতরণ; স্বল্প ব্যয়ে আবাসন সুবিধা প্রদানে কর্মজীবী নারীদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা; গার্মেন্টে কর্মরত নারীদের স্বল্প ব্যয়ে আবাসন সুবিধা প্রদানের জন্য আশুলিয়া, সাভার ও ঢাকায় বহুতল ভবন নির্মাণ; কর্মজীবী মায়ের সন্তানদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার চালু করা প্রভৃতি। এছাড়া মা ও শিশুর মৃত্যুহার হ্রাস, মাতৃদুগ্ধ পানের হার বৃদ্ধি, ইপিআই, প্রসব ও প্রসব-উত্তর সেবার গুরুত্ব ও পরিবার পরিকল্পনা এবং আয়বর্ধক ও সামাজিক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ প্রদানসহ নারীর উন্নয়ন এবং সব ধরনের বৈষম্য কমিয়ে আসার জন্য নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা করছে সরকার।

বর্তমানে দেশের সেনাবাহিনী, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন অনেক পদেই নারীরা কাজ করছেন। এটি নারীর ক্ষমতায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে নারী-পুরুষের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্র থেকে সব ধরনের বৈষম্য দূর করা সম্ভব এবং সম্ভব নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা।

পিআইডি নিবন্ধ

সর্বশেষ..