আজকের পত্রিকা

নারীর প্রতি সহিংসতা আর কবে কমবে?

আরোশি আঁখি: মহামারির এই অসুখ হয়তো একদিন সেরে উঠবে, কিন্তু নারীর প্রতি সহিংসতা আদৌ কি কমবে? ‘নারী’ শব্দটার সঙ্গে ‘অবলা’ আর ‘অবহেলা’ শব্দটা যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। মানসিক ও শারীরিক আঘাত সহ্য করতেই মনে হয় নারীর জš§ হয়েছে। জš§ থেকে শুরু বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত নারীর দায়ভার বয়ে বেড়ায় কোনো না কোনো পুরুষ, যেমন বাবা, স্বামী ও সন্তান। যদিও দিন পাল্টেছে, নারীরা গুটি গুটি পায়ে যখন নিজের লক্ষ্য অর্জনে প্রস্তুত, আবার অনেকে পৌঁছে গেছে লক্ষ্যে, সে মুহূর্তেও চলছে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা। ঘরে-বাইরে বা অফিসে কোথাও তৈরি হয়নি নারীর শতভাগ নিরাপত্তা। নারীকে অবহেলা ও অবমাননার চাদরে মুড়িয়ে রেখেছে তথাকথিত এই পুরুষ সমাজ। যেখানে কোনো নারীর পরিচয় মা, মেয়ে ও অর্ধাঙ্গিনী, সেখানে এই সমাজের কিছু নরপিশাচ তাদের বিভিন্ন নোংরা নামে ডাকতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, যেমন মাল, সেক্সি, সুন্দরী প্রভৃতি। এ উসকানিমূলক শব্দগুলো নারীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। বাচ্চারাও পাচ্ছে না এই নরপিশাচদের কবল থেকে মুক্তি। তাই তো এখনই সময় নারীর প্রতি সহিংসতারোধে সবাইকে এক হয়ে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার। যখন নারীরা পাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি, তখনই দেশ পাবে ভিন্নধর্মী সফলতা ও পরিচয়। 

হয়তো নারী বটের ছায়া দিতে পারেনি, কিন্তু নিমগাছের মতো সমস্তটা দিয়ে আগলে রাখতে ভোলেনি। নারী রয়েছে সহ্যক্ষমতা। যুগের পর যুগ নারী কেবল তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সহিংসতা সহ্য করে চলছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে শুরু করে তথাকথিত সোশ্যাল মিডিয়ার সর্বত্র চোখে পড়ে নারীর প্রতি অবমাননা। দিন দিন উন্নয়নের দারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাংলাদেশে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে এই সহিংসতার মাত্রা। নারীর ওপর ঘরে-বাইরে সব জায়গায় উঠতে-বসতে চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত হোক বা অপ্রতিষ্ঠিতÑনারীরা কোথাও পাচ্ছে না সঠিক নিরাপত্তা। বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ সবার প্রতি সহিংসতার হার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারী হয়ে জš§ানো কি আজš§ পাপ হয়ে রয়ে যাবেÑএ প্রশ্ন থেকেই যায়। ইদানীং ফেসবুক নামক সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিনেত্রী বা যে কোনো নারী হোক তাদের কমেন্ট বক্সে দেখা যায় একদল বিকৃত মস্তিষ্কের পরিচয় দেয়া পুরুষকে। এই বিকৃত একদল মানুষ যেন কেবল নারীর ত্রুটি খুঁজতেই ব্যস্ত।

বিভিন্ন ধরনের পর্যালোচনা থেকে জানা যাচ্ছে, নারীরা নানাভাবে হচ্ছে সহিংসতার শিকার। আর প্রধানত সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে যা তা হলো যৌন নির্যাতনের আধিক্য। করোনাকালে যৌন নিপীড়নের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকাংশেই। তাছাড়া ইভটিজিং, আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, গলায় ফাঁস দিতে বাধ্য করা এবং অমানবিক নির্যাতন করা ছাড়াও এসিড নিক্ষেপের মতো ভয়ানক জিনিসও সমাজে বিদ্যমান, তবে আগের মতো নেই এ বিষয়টা। জাতিসংঘের ‘ডেকলারেশন অন দ্য এলিমিনেশন অব ভায়োলেন্স এগেন্স্ট উইমেন’ থেকে বলা হয় সহিংসতা হচ্ছে নারীর বিরুদ্ধে নারী ও পুরুষের মধ্যকার ঐতিহাসিক অসম ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ এবং নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা হচ্ছে প্রধান সামাজিক কৌশলগুলোর মধ্যে একটি, যার দ্বারা নারীকে পুরুষের অধীনস্থ অবস্থানে জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়।

২০১৫ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশের বেশি বিবাহিত মহিলা বা মেয়েরা সঙ্গীদের কাছ থেকে নানা মাত্রার নির্যাতনের শিকার হয় এবং তাদের মধ্যে অধিকাংশ নারী শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়, যাদের সিংহভাগ কখনও কাউকে কিছু জানায়নি। তিন শতাংশেরও কম ভুক্তভোগী আইনি পদক্ষেপ নিয়েছিল। ২০২০ সালের প্রথম ৯ মাসে কমপক্ষে ২৩৫ নারীকে তাদের স্বামী বা স্বামীর পরিবার হত্যা করেছে বলে জানা গেছে। নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা-সম্পর্কিত মাল্টি সেক্টরাল প্রোগ্রামের দেয়া তথ্যমতে, নারী ও মেয়েদের জন্য সরকারের ৯টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের কোনো একটির মাধ্যমে আইনি মামলা দায়ের করা ১১ হাজারেরও বেশি নারীর মধ্যে কেবল ১৬০টি ঘটনার সফলভাবে দণ্ডাদেশ এসেছে, যা প্রায় এক শতাংশ মাত্র। বাকি কেস বিচারহীনভাবেই রয়ে গেছে।

নারীর বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া সহিংসতার লাগাম টেনে ধরার এখনই সময়। আর গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধের দুর্গ। ইসলাম ধর্মে যেখানে নারীর সর্বোত্তম সম্মান নিশ্চিত করা হয়েছে, সেখানে নারীর প্রতি সহিংসতা অন্যতম ধর্মবিরোধী কাজ বলে গণ্য হয়। একজন নারী সমাজে অনেকগুলো পরিচয় বহন করে, তাই তাদের সুরক্ষা অবশ্যই রাষ্ট্র থেকে নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের একার পক্ষে এই সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ঘরে ঘরে দেখা যাবে এমন সমস্যা বিদ্যমান থাকতে। সমাজের নারী-পুরুষ সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে এই সমস্যা দূর করতে। সতর্ক করতে হবে প্রতিটা ব্যক্তিকে। প্রয়োজনে কঠিন থেকেও কঠিনতর আইন তৈরি করতে হবে, যাতে সংশ্লিষ্ট সবাই আইনের ভয়ে নিজেদের গুটিয়ে রাখে, পৈশাচিক স্বভাবকে এড়িয়ে চলে। একসময় বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যা ছিল এসিড নিক্ষেপ। প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হলে অথবা ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে এমনকি রাগ থেকেও এমন নির্যাতন চলত। পরে যখন আইন কঠিন হয় এ বিষয়ে, তার পর থেকে ধীরে ধীরে সমাজ মুক্তি পায় এমন পৈশাচিক কাজ থেকে। তবে ইদানীং যে পরিমাণ ধর্ষণ সংঘটিত হচ্ছে, তার সবগুলোর সঠিক বিচার বা তদন্ত নেই, ধর্ষণের বিরুদ্ধে তাই সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। আইনের যে ভয় তা ভেতরে প্রবেশ না করায় সমাজের নারীরা হচ্ছে লাঞ্ছিত। নারীরা সম্মান ও আশ্রয় হারানোর ভয়ে দিনের পর দিন নির্যাতন সহ্য করে যায়। তারা সবকিছু মেনে নেয়, কারণ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বিষয় নিয়ে ততটা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে না, যতটা তারা তেলে মাথায় তেল দিয়ে থাকে। নারী-পুরুষ সবাইকেই ধর্মীয় বিধান মেনে চলতে হবে, তাহলে সব সমস্যার সমাধান সহজ হবে। পরিবার থেকে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে এবং পরিবার থেকেই সেক্স এডুকেশন নিয়ে বিস্তারিত জানাতে হবে এবং কৌতূহল মিটাতে হবে, যাতে বাস্তব জীবনে এর প্রভাব না পড়ে বা কৌতূহল না বাড়ে। সন্তানের সামনে তার মাকে কখনও নির্যাতন করা দূরে থাক, হেয় করে কথা বলাও যাবে নাÑএতে সন্তানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে। ঘরে সারা দিন পরিশ্রম করা মানুষটাকে মূল্যায়ন করতে হবে। গৃহকর্মীরা অন্যের বাড়িতে কাজ করতে পারে, তাই বলে তাদের অসম্মান করা যাবে না, বরং তাদের প্রতি স্নেহশীল হতে হবে। সরকারকে পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্রের ব্যাবস্থা করা লাগবে। সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। নারীর জন্য গড়ে তুলতে হবে এক সুস্থ সমাজ এবং নিরাপদ আশ্রয়। ধর্ষক, ইভটিজারসহ যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা আজে-বাজে কমেন্ট করতে পিছপা হয় না, তাদেরও আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..