প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

নারীর সুরক্ষায় চাই মানসিকতায় পরিবর্তন

 

দেশের পাবলিক প্লেসগুলোতে নারীরা খুব নিরাপদ সে কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। গণসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নারীরা সব ক্ষেত্রে নিজেদের সুরক্ষিত মনে করে না। শিকার হয় শারীরিক ও মানসিক হয়রানির। গত রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে অনুষ্ঠিত ‘মানসম্মত গণসেবা’ বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা তুলে ধরা হয় অ্যাকশনএইডের পক্ষ থেকে। তাদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে যাওয়া নারীদের ৪০ দশমিক ২ শতাংশ সেবাপ্রদানকারীর কাছ থেকে দুর্ব্যবহার পায় এবং ১৫ শতাংশ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। পুলিশ স্টেশনে সেবা নিতে যাওয়া ৩৫ শতাংশ নারী শারীরিক নির্যাতন ও ৩০ শতাংশ হয় হেনস্তার শিকার। এছাড়া ৫০ শতাংশ নারী বাজার-ঘাটে অনাকাক্সিক্ষত স্পর্শ ও এ ধরনের হয়রানির শিকার হয়। ৭০ শতাংশ নারী ও ৭৫ শতাংশ পুরুষ গণপরিবহন ও বাসস্ট্যান্ডকে মেয়েদের জন্য নিরাপদ মনে করে না। এসব তথ্য-উপাত্ত উদ্বেগজনক এ কারণে যে সেবাপ্রার্থী নারীরা অসহায় অবস্থায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় যেমন অনিরাপদ, তেমনি অরক্ষিত গণপরিবহন ও বাজারের মতো পাবলিক প্লেসে।

আমাদের সামাজিক পরিস্থিতি খুব একটা নারীবান্ধব নয়। এখানে সমস্যা মূলত দুটি পর্যায়ে। প্রথমত, পাবলিক প্লেস বা দৈনন্দিন সামাজিক পরিস্থিতিতে নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হয়। দ্বিতীয়ত, তারা যখন হয়রানির শিকার হয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরে যায়, তখন দ্বিতীয় দফায় শিকার হয় অসৌজন্যমূলক আচরণ বা সরাসরি শারীরিক ও মানসিক হয়রানির। একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে থানায় গেলে অনেক ক্ষেত্রে কিছু পুলিশ সদস্য এটি উপভোগের চেষ্টা করেন। ধর্ষণের পর মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে গেলেও অনেক সময় প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয় নারীর জন্য। কিছু চিকিৎসকসহ হাসপাতালের অন্যান্য কর্মী, এমনকি পুরুষ রোগীদের একটি অংশ অনেক সময় ভিকটিমকে লাঞ্ছিত করে। এসব রোধে সরকার উদ্যোগী হয়েছে অবশ্য। নারীদের জন্য নারী চিকিৎসক ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় নারী তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে সেখানে রয়েছে সীমাবদ্ধতা। নারী নির্যাতন বা হয়রানির ঘটনায় সব ক্ষেত্রে শুধু নারী সেবাদাতার মাধ্যমে সার্ভিস দেওয়া সম্ভব হয় না। এ পরিস্থিতি উত্তরণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সুশাসন, জবাবদিহিতা ও সামাজিকভাবে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। সমাজের একটি বড় অংশের পুরুষ অনেক ক্ষেত্রে নারীদের হয়রানির বিষয়টিকে তুচ্ছ করে দেখতে অভ্যস্ত কিংবা এতে একধরনের মৌন সমর্থন দিয়ে থাকে। অনেক নারীও এটি মেনে নিতে অভ্যস্ত। নারী-পুরুষ উভয়ের এ মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের প্রয়োজন উপযুক্ত জেন্ডার সংবেদনশীল প্রশিক্ষণ। পাবলিক প্লেসে ইভ টিজিং, অনাকাক্সিক্ষত স্পর্শ ও সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনা রোধে আইন প্রয়োগের সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। একবিংশ শতকে এসে আমাদের মানসিকতার কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে অস্বীকার করা যাবে না। তবে নারীবান্ধব সমাজ গড়তে আরও সভ্যতার পরিচয় দিতে হবে।