মত-বিশ্লেষণ

নারী নির্যাতন প্রতিরোধ হোক আমাদের অঙ্গীকার

দিলারা পারভীন:দুই মেয়েসহ জাহেদা ও চান মিয়ার চারজনের অভাবের সংসার। রাজধানীর কামরাঙ্গীর চরে ঘর ভাড়া নিয়ে পাঁচ বছর ধরে তারা বাস করছেন। চান মিয়া পেশায় রিকশাচালক। কিন্তু নেশা করে অনেক রাতে বাসায় ফেরা এবং এক দিন রিকশা চালালে দুই দিন ঘরে বসে থাকা তার স্বভাব। সংসারের খরচ মেটাতে জাহেদা বাসায় বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করেন। পরিবারের ভার পুরোটাই জাহেদার ওপর। এ নিয়ে প্রায়ই জাহেদা ও তার স্বামীর মধ্যে ঝগড়া হয়। কিছুদিন আগে জাহেদাকে মেরে হাড় ভেঙে দেন তার স্বামী। জাহেদা তার নিজের জীবন এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত।

গত ২৫ নভেম্বর ছিল নারীর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণ দিবস। ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে তিন নারী নির্যাতিত হয়েছিলেন ১৯৬০ সালের ২৫ নভেম্বর। ১৯৮১ সালের জুলাইয়ে প্রথম লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন সংগঠনের ২০০ নারী ঘটনাটি স্মরণীয় করে রাখতে ২৫ নভেম্বর দিনটিকে নারী নির্যাতন-বিরোধী দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। জাতিসংঘ ১৯৯৩ সালের ২৫ নভেম্বর নারী নির্যাতন দূরীকরণ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ প্রতিবছর ২৫ নভেম্বরকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন দূরীকরণ দিবস হিসেবে গ্রহণ করে এবং ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পক্ষকালব্যাপী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশ হওয়ায় প্রতিবছর ২৫ নভেম্বর নারীর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণ দিবস পালন করে আসছে। ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস পর্যন্ত আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশও ১৫ দিনব্যাপী এই পক্ষ উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে।

দিবসটি উপলক্ষে জাতিসংঘ বলেছে, কভিড-১৯ পরিস্থিতির মধ্যেও বিভিন্ন দেশে নারী ও মেয়েশিশুর প্রতি নানা ধরনের সহিংসতা, বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা বেশি ঘটে চলেছে। কভিড সংকটের মধ্যেও সহিংসতার এই ছায়া মহামারি বেড়ে চলেছে। এই সহিংসতাকে বন্ধ করতে বিশ্বকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। চলমান মহামারিতে সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য সহায়তা নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে তহবিল সংগ্রহের ওপর জোর দেয়া হয়েছে।

করোনা পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বের মতো দেশজুড়ে নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন, নিপীড়ন ও হত্যার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন প্রতিরোধে মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল লেগেই আছে। তবুও নারী নির্যাতনের অবসান ঘটছে না।

আমাদের সমাজে নারী নির্যাতনের ঘটনা নীরবে-নিভৃতে ঘটেই চলেছে। হয়তো অনেক ঘটনা আমরা জানতে পারি না। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা এখন শুধু আমাদের দেশের নয়, এটা এখন বৈশ্বিক সমস্যা। প্রতিবছর ২৫ নভেম্বর ‘আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন দিবস’ থেকে শুরু করে ১০ ডিসেম্বর ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস’ পর্যন্ত এ ক্যাম্পেইন অব্যাহত থাকে। এ সময় সারা পৃথিবী ঐক্যবদ্ধ হয়ে নারীর প্রতি সব সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা চালায়। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার ক্ষেত্রে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতারোধ করা অত্যন্ত জরুরি।

জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সম্প্রতি নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে নতুন এজেন্ডা গ্রহণ করেছে। এই এজেন্ডাতে ১৭টি গোল এবং ১৬৯টি টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জন করা, যেখানে নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে এবং একই সঙ্গে লিঙ্গসমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন বেগবান হবে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, পৃথিবীতে প্রতি তিনজনে একজন নারী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। এর মধ্যে পারিবারিক নির্যাতনসহ সব ধরনের নির্যাতনের কথা বলা হয়েছে। সহমর্মিতা এবং অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করার মাধ্যমে সহজেই নারীকে এসব পারিবারিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়ন থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব। তাই নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। এ পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সরকার, বিভিন্ন সংস্থাসহ সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

করোনাকালে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও বেড়েছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। এসব ঘটনায় নির্যাতিতদের আইনি সুরক্ষা দিতে ২০০০ সালে সরকার ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ প্রণয়ন করে। সে আইনকে ২০২০ সালে সংশোধন করে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২০’ জারির মাধ্যমে আরও যুগোপযোগী করা হয়। ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২০’ অনুযায়ী নারী ও শিশু পাচার, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ধর্ষণ, ধর্ষণজনিত কারণে মৃত্যু, নারীর আত্মহত্যায় প্ররোচনা, যৌন নিপীড়ন, যৌতুকের জন্য মৃত্যু, ভিক্ষাবৃত্তির উদ্দেশ্যে শিশুর অঙ্গহানি, ধর্ষণের ফলে জন্মলাভকারী শিশু প্রভৃতি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনার আওতাভুক্ত।

‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২০’-এর আওতায় নারী ও শিশু উল্লিখিত যেকোনো ঘটনার শিকার হলে পার্শ্ববর্তী থানায় গিয়ে বিষয়টি জানাতে হবে। এছাড়া প্রতিটি জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২০’ অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করবেন। ট্রাইব্যুনাল যদি ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তার কারণ-সংবলিত একটি প্রতিবেদন ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করবেন।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় বাদীর নিজস্ব কোনো আইনজীবী নিয়োগের প্রয়োজন নেই। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯২ ধারা অনুযায়ী তিনি সরকারের পক্ষ থেকে আইনজীবী পাবেন, যিনি মামলার সব তত্ত¡াবধান করবেন। সরকারের পক্ষ থেকে নিয়োগ দেয়া আইনজীবীকে কোনো খরচ দিতে হবে না। ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২০’ অনুযায়ী এসব অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া রয়েছে অর্থদণ্ডের বিধান।

বাংলাদেশের নারীরা কোথাও পিছিয়ে নেই। নেতৃত্ব, সেনাবাহিনী, জনপ্রশাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা, ক্রীড়াসহ সব ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়েছে। আমাদের দেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইন রয়েছে। নারী নির্যাতন হলেই প্রতিরোধও করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতারোধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।

বর্তমান সরকার নারীর ক্ষমতায়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, নারী নেতৃত্বকে উৎসাহিত করছে। মেয়েদের জন্য প্রাথমিক থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়েছে, উপবৃত্তি দেয়া হচ্ছে, বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হচ্ছে এবং মিড-ডে মিল কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় অধিকসংখ্যক নারী শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সরকারের এসব কর্মযজ্ঞের ফলে মেয়েরা স্বাবলম্বী হচ্ছে, অর্জন করছে অর্থনৈতিক মুক্তি এবং হ্রাস পাচ্ছে নারী নির্যাতন।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নারীদের এই অগ্রযাত্রাকে আরও এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। তার এই আন্তরিক প্রচেষ্টার জন্য জাতিসংঘ তাকে ‘প্ল্যানেট ফিফটি ফিফটি’ ও ‘এজেন্ট অব চেইঞ্জ অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করেছে। তার এই আন্তর্জাতিক সম্মানপ্রাপ্তি পুরো নারীসমাজকে নেতৃত্বের পথে এগিয়ে যেতে প্রেরণা জোগাবে।

সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সব পরিমণ্ডলে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে প্রয়াস চালানো হচ্ছে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে ব্যক্তি ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। নারীমুক্তি ছাড়া দেশের সার্বিক উন্নতি সম্ভব নয়। দেশ ও জাতির স্বার্থে যেকোনো মূল্যে নারীর ওপর সব ধরনের সহিংস আচরণ ও নির্যাতন বন্ধ করে সমাজে নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু আইন করলেই চলবে না, আইনের সঠিক বাস্তবায়ন এবং মানুষের মাঝে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে পারলে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..