মত-বিশ্লেষণ

নারী-শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দুর্যোগে

ইলিয়াছ হোসেন পাভেল: দুর্যোগকালে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় নারী ও শিশু। এ সময় নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার সময়ও মারা যাচ্ছে অনেক নারী ও শিশু। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। বিশ্ব ঝুঁকি প্রতিবেদন-২০১২ অনুযায়ী, বিশ্বের সর্বাধিক দুর্যোগপ্রবণ ১৭৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান পঞ্চম। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, নদীভাঙন, খরা, জলোচ্ছ্বাসসহ বজ পাতের মতো দুর্যোগ এদেশে বারবারই আঘাত হানে। ১৯৮০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ২০০-এর বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব বিপর্যয়ে দুই লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানি এবং প্রায় ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হয়েছে নারী ও শিশুরা। আর প্রাণহানিও বেশি ঘটেছে তাদেরই।

রাহেলা খাতুন থাকেন কড়াইল বস্তিতে। তার বাড়ি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে। ২০০৯ সালে আইলায় তার স্বামী ও এক সন্তান মারা যায়। এরপর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। তার স্বামীর রোজগারে সংসার চলত। এখন নিজে বাসায় ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালান।

সাম্প্রতিক জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোয় বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশকে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বলে চিহ্নিত করেছেন। দুর্যোগ মোকাবিলার বাংলাদেশের সক্ষমতাও বেড়েছে। দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে জলাবদ্ধতা, অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধসের পাশাপাশি ভূমিকম্পের আশঙ্কাও বাড়ছে এদেশে। শুধু তাই নয়, নতুন দুর্যোগ হিসেবে যোগ হয়েছে বজ্রপাতের ব্যাপকতা।

ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে ব্যাপকহারে বনজঙ্গল ও গাছপালা নিধন, নদ-নদী ও খাল-বিল ভরাট, ভূগর্ভস্থ পানি ও তেল উত্তোলন, উঁচু বাঁধ নির্মাণ, ফসল উৎপাদনে ক্ষতিকর রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার করে মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এসব কারণেই সিডর ও আইলার মতো ভয়াবহ দুর্যোগ বেশি দেখা দিচ্ছে।

আইপিসিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগামী ২০ বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ শতকরা ৩২০ ভাগ বাড়বে। পাশাপাশি বাড়বে শিশুমৃত্যুর হারও। ওই প্রতিবেদনে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ২০০৯ সালে আইলার আঘাতে দুর্ভোগের শিকার মানুষের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা হয়। উল্লেখ করা হয়, আইলায় বিপর্যয়ে ক্ষত-বিক্ষত মানুষ এখনও অর্থনৈতিকভাবে আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারেনি। তারা এখনও প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে। খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের নারীদের লবণমুক্ত খাবার পানি সংগ্রহ করার জন্য কয়েক কিলোমিটার পথ হাঁটতে হচ্ছে। প্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে কন্যাশিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া ও বাল্যবিয়ের শিকার হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্ষার অতিরিক্ত পানি দেশের জলাবদ্ধ এলাকার বিস্তৃতি ক্রমশ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে এসব এলাকায় খাদ্য সংকট সৃষ্টি করছে, পাশাপাশি এলাকার নারীদের জীবন নানাভাবে সংকটাপন্ন করে তুলছে। বাংলাদেশের সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় একজন নারীর জীবনে অধিক সামাজিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনে। দেখা যায়, একজন পুরুষ অবলীলায় আশ্রয়কেন্দ্রে যায় এবং আশ্রয় নেয়। পক্ষান্তরে একজন নারীর পক্ষে এটা সবসময় সম্ভব হয় না। নারী গৃহস্থালি সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এবং অনেক সময় সন্তানের কারণে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না। বন্যা-উত্তর পর্যায়ে দেখা গেছে, শতকরা ৮৫ শতাংশ লাশ নারী ও শিশুর। কারণ তারা গৃহে থাকে এবং শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ার কারণে পানিতে ভেসে গিয়ে মারা যায়। আর বেঁচে গেলেও পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রিলিফ সংগ্রহ করতে সমর্থ হয় না।

কোনো নারীর স্বামী বন্যায় মারা গেলে ওই নারী সামাজিক ও আর্থিক কোনোভাবেই আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে না। একজন পুরুষ সামাজিকভাবে পুনর্বাসিত হয় এবং নতুন করে পারিবারিক জীবনযাপন শুরু করে। এছাড়া অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন খরার কারণে নারীদের দীর্ঘপথ অতিক্রম করে খাবার ও অন্যান্য গৃহস্থালি কাজের জন্য পানি সংগ্রহ করতে হয়। দুর্যোগের সময় নারী ছাড়া শিশুরাও অধিক হুমকির মুখে পড়ে। দুর্যোগকাল ও দুর্যোগ-পরবর্তী শিশুর সুরক্ষার জন্য জাতীয় শিশুনীতি ২০১১-তে বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো তেমনভাবে মানা হয় না।

প্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগকালীন ছেলেশিশুদের তুলনায় কন্যাশিশুদের কম খাবার দেওয়া হয়। সাইক্লোন, সিডর ও আইলা-পরবর্তী সময়ে বরগুনা জেলায় নারী ও শিশু পাচার বেড়ে গিয়েছিল। এ সবই দুর্যোগ-পরবর্তী নারী ও শিশুদের অবস্থার কমবেশি সামগ্রিক চিত্র। অ্যাকশনএইডের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে কোনো দুর্যোগে নারী ও পুরুষের মৃত্যুর অনুপাত ৪:১। নারীর ক্ষমতায়ন এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হলেই এ ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রতিবেদনে বলা হয়, নানা দুর্যোগের সময়েও শতকরা ৫৫ জন নারী আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে নিরাপদ মনে করে না।

বিশ্বব্যাপী সংঘাত বা দুর্যোগের মধ্যে বসবাসকারী নারী ও শিশুরা ভয়াবহ সহিংসতা, দুর্দশা ও আতঙ্কের ভেতর দিয়ে যায়। যখন শিশুদের নিরাপদ খেলার জায়গা থাকবে না, যখন তারা তাদের পরিবারের সঙ্গে পুনরায় মিলিত হতে পারবে না, যখন তারা মানসিক সহায়তা পাবে না, তখন তারা যুদ্ধের অদৃশ্য ক্ষত থেকে সেরে উঠবে না। ইউনিসেফের হিসাব অুনযায়ী, তিন কোটি ৪০ লাখেরও বেশি শিশু সুরক্ষা সেবা ছাড়াই সংঘাত ও দুর্যোগ-আক্রান্ত পরিবেশে বসবাস করছে, যাদের মধ্যে ইয়েমেনে ৬৬ লাখ, সিরিয়ায় ৫৫ লাখ ও ডমিনিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআরসি) ৪০ লাখ শিশু রয়েছে।

শোষণ, অবহেলা, নির্যাতন, আতঙ্ক ও সহিংসতা প্রতিরোধে উদ্যোগ গ্রহণসহ সব প্রচেষ্টাই শিশু সুরক্ষা সেবার অন্তর্ভুক্ত। শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য সম্ভাব্য বিপদগুলো চিহ্নিত করা এবং তা কাটিয়ে উঠতে পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পানি, পয়োনিষ্কাশন পরিচ্ছন্ন, শিক্ষা কার্যক্রমের অন্য ক্ষেত্রসহ সবক্ষেত্রে পরিচালিত মানবিক প্রকল্পগুলোর কেন্দ্রে যাতে শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে কাজ করে।

মিয়ানমারে সহিংসতা থেকে বাঁচতে ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে চার লাখ শিশুসহ সাত লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারে এসে আশ্রয় নিয়েছে। শরণার্থী অন্তঃপ্রবাহের এই বিপুল ব্যাপ্তি ও দ্রুতগতি থাকা সত্ত্বেও সরকারের প্রশংসনীয় সহায়তার পাশাপাশি ইউনিসেফ ১২ লাখেরও বেশি শরণার্থী ও আশ্রয়দানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে জীবন রক্ষাকারী সেবা প্রদান করছে। এর আওতায় তিন লাখ ৮০ হাজার মানুষ সুপেয় পানির সুবিধা পায়, ২০ হাজার শিশু যাদের বয়স পাঁচ বছরের নিচে এবং চরম অপুষ্টির স্বীকার তারা চিকিৎসা পেয়েছে এবং ১২ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি জনসংখ্যা যাদের বয়স এক বছরের বেশি তারা কলেরার টিকা পেয়েছে। এসব কিছুর জন্য সরকার এবং দাতা সংস্থাগুলোর উদার সহায়তা প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার দাবিদার।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে প্রাকৃতিক বিপর্যয় একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। দুর্যোগ এর আগে কিংবা পরে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। প্রাকৃতিক এবং মানুষের তৈরি দুই রকমের দুর্যোগেরই শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। এসব দুর্যোগের ঝুঁকি বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মানুষকে ব্যাপকভাবে সচেতন করতে গণমাধ্যম একটি বড় ভূমিকা পালন করছে।

বিশাল এলাকাজুড়ে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকাকে প্রভাবিত করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এক্ষেত্রে সংবাদের একটি উল্লেখযোগ্য উপাদান হলো হালনাগাদ অবস্থার চিত্র জানার আগ্রহ, যেমন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, আহত নিহতের পরিসংখ্যান, পুনঃউদ্ধার ইত্যাদি সঠিক তথ্য ও বহুমাতৃক চিত্র ফোকাস করা মিডিয়ার কাজ। দুর্যোগ-পূর্ব সময়ে গণমাধ্যম দুর্যোগ প্রস্তুতি সম্পর্কে মানুষকে তথ্য দেয়। দুর্যোগ শুরুর আগে এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে মৌলিক ভূমিকা পালন করে থাকে গণমাধ্যম।

বাড়িঘরের মায়া, সিদ্ধান্তহীনতা এবং নিরাপত্তার কারণে ঘূর্ণিঝড়ের সময় নারীরা শুরুতেই শেল্টার হোমে যেতে চান না। শেষ সময়ে বের হওয়ার কারণে তারা দুর্যোগের কবলে পড়েন। আর মা আক্রান্ত হলে শিশুও আক্রান্ত হয়। ফলে যে কোনো দুর্যোগে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকার দুর্যোগ মোকাবিলায় নারী ও শিশুকে বেশি প্রধান্য দিয়ে থাকে। দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ যে সক্ষমতা অর্জন করেছে তা সারা বিশ্বে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। অনেক উন্নত দেশ বাংলাদেশের এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায়। কাজেই দুর্যোগকালীন নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের সবার সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

পরিবারের প্রতি অনেক দায়িত্ববোধের কারণে দুর্যোগের সময় নারী ও শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থা উত্তরণে নারীদের সচেতন করার কোনো বিকল্প নেই। আর নারীদেরও এ ব্যাপারে উদাসীন হলে চলবে না। দুর্যোগকালীন তাদের সচেতনতা এবং ক্ষমতায়ন তাদের জীবন রক্ষা করতে সহায়তা করার পাশাপাশি একটি পরিবারকেও রক্ষা করতে পারে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..