প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

নার্সারিতে পীরগঞ্জের ওয়াহাবের ভাগ্যবদল

এম আকমল হোসাইন: বিভাগীয় শহর রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ঝাড়বিশলা গ্রামের বাসিন্দা আবদুল ওয়াহাব। একসময় দিনমজুরি অথবা চালের ব্যবসা করে কোনো রকমে চলতো তার জীবন। অভাব শেষ হতো না কখনও। সপ্তাহের বেশিরভাগ দিনই ঠিকমতো আহার জুটতো না পরিবারে। বিভিন্ন জাতের ফলদ ও বনজ বৃক্ষের নার্সারি করে এখন বদলে গেছে তার জীবন। চারা বিক্রি করে উপার্জন করছেন মোটা অঙ্কের টাকা। পরাজিত করেছেন দরিদ্রতাকে। ইতোমধ্যে একজন সফল চারা ব্যবসায়ী হিসেবে বেশ পরিচিতি অর্জন করেছেন তিনি। তার দেখাদেখি এখন এলাকার অনেকেই এগিয়ে এসেছেন এ পেশায়। ধীরে ধীরে অভাব বিতাড়িত করছেন জীবন থেকে।

ওয়াহাবের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মধ্যযুগের সাধক কবি হেয়াৎ মামুদের গ্রামে জš§ নিলেও তার কোনো লেখাপড়া নেই। শিশুকালে হারিয়েছেন বাবা আফছার আলীকে। পরিবারে তিনিই সবার ছোট। পিতৃহারা আট ভাই-বোনের টানাটানির সংসারে স্কুলে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। অতি কষ্টে কেটেছে তার শৈশব। সুখের মুখ দেখেননি তখন। অভাগা ওয়াহাব ক্ষুধার জ্বালা নিয়ে বেড়ে উঠতে থাকেন। একসময় বিয়ে করেন আরেক অভাবী পরিবারের জমিলা বেগমকে। টানাটানি বেড়ে যায় তখন। তার উপর ঘরে আসে এক এক করে তিন সন্তান। মড়ার উপর যেন খাঁড়ার ঘা যোগ হয়। কূল-কিনারা পান না। আগে থেকেই দিনমজুরি করতেন। সংসার বড় হওয়ায় কোনোভাবেই আর চলতে পারেন না সামান্য সেই উপার্জনে। পাশাপাশি শুরু করেন চালের ব্যবসা। হাটবাজার থেকে ধান কিনতেন। তা থেকে চাল করার জন্য স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বাড়িতেই প্রক্রিয়াজাত করতেন। এরপর সেই ধান ভেনে বাজারে বিক্রি করতেন চাল। এতেও অভাব দূর হয় না। খেয়ে না খেয়ে থাকতে হতো। ঠিকমতো পড়ালেখা করতে পারতো না ছেলে-মেয়েরা। অভাবের কারণে নিজে অশিক্ষিত থেকেছেন। সেই দুঃখ ভুলতে পারেন না কখনও। তিনি চান না সন্তানরাও তার মতো বঞ্চিত হোক শিক্ষার আলো থেকে। ভেবে পান না একা কী করবেন পরিবারের জন্য। পূরণ হয় না চাওয়া-পাওয়ার ফর্দ। বাড়তে থাকে দুঃখ-যন্ত্রণা।

ওয়াহাবের একদিন দেখা হয় বোনের ছেলে রাঙ্গার সঙ্গে। রাঙ্গা তাকে পরামর্শ দেয় নার্সারি করার জন্য। ভাগ্নের কথা তার মনে ধরে। তখন নার্সারি করার সিদ্ধান্ত নেন ওয়াহাব। কিন্তু তার ছিল না পৈতৃকসূত্রে পাওয়া কোনো জমি। তাই প্রতিবেশীর এক খণ্ড জমি লিজ নেন। বীজের জন্য বন-বাদাড়সহ এ-বাড়ি সে-বাড়ি ঘোরেন। সংগ্রহ করেন ফলফলাদিসহ নানা জাতের বীজ। এগুলো থেকে তৈরি করেন বিশ হাজার চারার একটি পরিপূর্ণ নার্সারি। এই চারা বিক্রি করে খরচ বাদ দিয়ে প্রথমবার তার লাভ হয় ৭০ হাজার টাকা। এ লাভের পেছনে ছিল স্ত্রী জমিলা ও ছেলেমেয়েদের নিরলস পরিশ্রম। এতো টাকা লাভ দেখে ওয়াহাব মনে জোর পান। স্বপ্ন দেখেন নার্সারি বড় করার, নিজে বড় হওয়ার। এরপর আগের মতো করে আবার বীজ সংগ্রহ করেন। এবারের চারাগুলো বৃষ্টির অভাবে মরে যাওয়ায় লাভ করতে পারেননি। তাতে দমে যাননি তিনি। পুনরায় শুরু করেন চারা উৎপাদনের কাজ। চারা পরিপুষ্ট হলে সেগুলো বিক্রি করেন। এতে আগেরবারের ক্ষতি পুষিয়েও তিনি নিট মুনাফা করেন প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এভাবে শুরু হয় তার জীবনের স্বপ্নপূরণের পালা। তিনি থেমে থাকেননি। দেখতে দেখতে পার করেন দশ বছর। নার্সারির আয় থেকে কেনেন ১০ শতাংশ জমি। ইটের বাড়ি তৈরি করেন সেখানে। পাশাপাশি কেনেন আরও ৫০ শতাংশ আবাদি জমি। পাশেই নার্সারির পরিধি বাড়াতে ২৬ হাজার টাকায় লিজ নেন আরও দুই বিঘা। নিজের অংশের সঙ্গে লিজ নেওয়া জমি একত্র করে ব্যাপকভাবে শুরু করেন চারা উৎপাদনের কাজ। একসঙ্গে ৬০ হাজার চারা লাগান। এতে তার সব মিলিয়ে খরচ হয় ৮০ হাজার টাকা। ভালো যত্ন নেওয়ায় লকলকিয়ে বেড়ে ওঠে চারাগুলো। এর মধ্যে কিছু চারা বিক্রি করে তিনি খরচের টাকাটা পুষিয়ে নেন। বাকি চারাগুলো বিক্রি করেন আরও কিছুদিন পর। এতে খরচ বাদ দিয়ে তার লাভ দাঁড়ায় দেড় লাখ টাকার বেশি। আষাঢ়, শ্রাবণ ও কার্তিক মাসে বীজ সংগ্রহের পর রোপণ করতে হয়। ওয়াহাব প্রায় সারা বছরই বিভিন্ন জাতের আমের চারা বিক্রি করেন। তবে বৈশাখ থেকে আশ্বিন পর্যন্ত ছয় মাস ধরে সবচেয়ে বেশি চারা বিক্রি হয়। বর্তমানে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত খোঁজ রাখা হচ্ছে এ নার্সারির।

এভাবেই জীবনের মোড় ঘোরান ওয়াহাব। সংসারে আর অভাব নেই। স্বাচ্ছন্দ্যে চলছে গোটা পরিবার। ভালোভাবে চলছে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা। শাল্টি উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ে প্রথম সন্তান জহুরুল ইসলাম। বড় মেয়ে তানজিনা চতুর্থ শ্রেণিতে ও ছোট মেয়ে রতনা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে শাল্টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করার ইচ্ছা আছে তার। দশ-বারো বছর আগেও ওয়াহাবের পরিবারে দরিদ্রতা ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। এখন অদম্য চেষ্টা আর পরিশ্রমে বদলে ফেলেছেন ভাগ্যের চাকা। তার এ সফলতায় উৎসাহিত হচ্ছে সমাজের শত মানুষ। ঘুরে দাঁড়াচ্ছে টানাপড়েন থেকে। ভাগ্য পরিবর্তনে সমাজের জন্য ওয়াহাব একজন অনুকরণীয়।