প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

নিছক বৃদ্ধি নয়, দামের সমন্বয় ঘটুক

‘গ্রাহক পর্যায়ে আবার বাড়ল বিদ্যুতের দাম’ শিরোনামে যে খবর ছাপা হয়েছে গতকালের শেয়ার বিজে, তা সচেতন পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ না করে পারে না। বুধবার গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম গড়ে ৩৫ পয়সা তথা পাঁচ দশমিক ৩০ শতাংশ করে বৃদ্ধির এ ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ২০১০ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ নিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ল আটবার; যদিও সংশ্লিষ্টদের দাবি এবারই প্রথম দেশজুড়ে সব গ্রাহকের জন্য একক মূল্যহার ধার্য হয়েছে। জানামতে, বর্তমানে গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম গুনতে হচ্ছে ছয় টাকা ৫০ পয়সা। বর্ধিত দামে তা বিকোবে ছয় টাকা ৮৫ পয়সায়। বিইআরসি বলছে, দাম বাড়লেও প্রত্যাহার হয়েছে বিদ্যমান ন্যূনতম চার্জ। ফলে লাইফ লাইন গ্রাহক তথা মোট ১৩ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর বিল একদিক থেকে কমবে। এতে সামগ্রিকভাবে বিল কতটা কমে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার গণশুনানিতে বিতরণ সংস্থাগুলোর দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের সোজাসাপ্টা বিরোধিতা করেছিল কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম পাল্টা যুক্তিসহ বিদ্যুতের দাম হ্রাসেরও প্রস্তাব দেন সে সময়। দেখা যাচ্ছে, তাদের প্রস্তাবেরও তেমন প্রতিফলন নেই বিইআরসির ঘোষণায়। এতে তারা মর্মাহত হবেন, এটাই স্বাভাবিক। তবে কেউ কেউ মনে করেন, এক্ষেত্রে বিইআরসি’র নতুন ঘোষণার পেছনের যুক্তিকে ক্যাব বা অন্য কারও পক্ষে সরাসরি নাকচ করে দেওয়ারও সুযোগ নেই। তা বরং অধিকতর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

গত আট বছরে আটবার বিদ্যুতের দাম বেড়েছে বটে; তবে প্রথমবার যেমন শক তৈরি হয়েছিল, তেমনটি দেখা যায়নি পরের বারে। বিদ্যুৎবিভ্রাট নিয়ে অতীতে পত্রপত্রিকায় পাঠকের চিঠিপত্র আসত প্রচুর। এখন সে ধরনের চিঠিকে ব্যতিক্রম বলে গণ্য করা হয়। তার মানে এ-ই নয় যে, বিদ্যুৎ সমস্যা পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলা গেছে। বরং উল্লিখিত প্রবণতার ইঙ্গিত হলো, বিদ্যুতের ‘ইমার্জেন্সি ডিমান্ড’ মিটে গেছে মোটামুটি। আর তার পেছনে সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানে ব্যবহƒত জেনারেটরের। লক্ষণীয়, বিদ্যুৎ খাত ভর্তুকি পেয়ে এসেছে দীর্ঘদিন ধরে। হালে ক’মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কম থাকায় সে ঘাটতি অনেকটাই কমেছে, সন্দেহ নেই। ঘাটতি কমে ‘দাম সমন্বয়ে’ তথা বিদ্যুতের দাম বাড়লেও। প্রশ্ন হলো, একদিকে জ্বালানি তেলের স্বল্পমূল্য ও অন্যদিকে কয়েক দফা বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের পরও কী এমন ঘটল যে, এর দাম বাড়াতেই হচ্ছে ডিসেম্বর থেকে? দাম যেটুকু বাড়ানো হয়েছে, সেটি অবশ্য ভীতিপ্রদ নয়। তবু প্রত্যাশা থাকবে, সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তিটি ভোক্তাদের সামনে খোলাসা করবেন নীতিনির্ধারকরা। আরেকটি বিষয়, চার্জ একখানা প্রত্যাহার হয়েছে বটে; কিন্তু পাইকারি তথা বাল্ক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা সেভাবে দেখা দিল না কেন? তার একটি কারণ অনুমান করা যায়Ñমাঝারি ও ভারী শিল্পকে ‘অর্থনীতির স্বার্থে’ ছাড় দেওয়া হচ্ছে এক্ষেত্রে; যদিও কারও কারও ধারণা, পাইকারি পর্যায়েও ধীরে ও স্থিতিশীলভাবে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা দরকার। নইলে পরে হুট করে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি কষ্টদায়ক হয়ে উঠতে পারে। মোটকথা, দাম বাড়লেও সচেতন মানুষের হয়তো আপত্তি থাকবে না; কিন্তু তা যেন বাড়ে সমন্বয়ের স্বার্থে কোনো কোনো ক্ষেত্রকে (ভারী ও মাঝারি শিল্প) এর বাইরে রেখে এবং কিছু গ্রাহকের (ক্ষুদ্রশিল্প ও সাধারণ) ওপর ব্যয়ের বোঝা না বাড়িয়ে।