মত-বিশ্লেষণ

নিজেকে সুপারম্যান ও কর্মজীবী শ্রেণির নায়ক হিসেবে দেখতে চান জনসন

থেরেসা রাফায়েল: গত ডিসেম্বরে নির্বাচনে জয়লাভের পর তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন তার মূল অভ্যন্তরীণ নীতির কথা ঘোষণা করেন। সে অনুযায়ী, ব্রিটেনের অর্থনীতিতে ভারসাম্য আনার কথা বলেন তিনি। এর মানে হলো, দেশটির অর্থনীতির যে অংশ অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে আছে, সেখানে সমতা তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া। সম্প্রতি গ্রিনউইচে ন্যাশনাল ম্যারিটাইম মিউজিয়ামে এক বক্তব্যে তিনি তার প্রধান বৈদেশিক নীতি নিয়েও কথা বলেন। সে অনুযায়ী, মুক্ত বাণিজ্যের জয়যাত্রায় ব্রিটেনকে বৈশ্বিক ‘সুপারম্যান’ হিসেবে গড়ে তুলতে চান তিনি।

উভয় আকাক্সক্ষার ক্ষেত্রে তার খুবই যুক্তিসংগত উচ্চাভিলাষ রয়েছে, এমনকি এটি বেশ উদার নীতিও বলা চলে। জনসনের সরকার এমন একটি শ্রেণির ভোটে ক্ষমতায় এসেছেন, যাদের মধ্যে সাবেক লেবারদলীয় শ্রমিক শ্রেণি ও পুরোনো ব্রেক্সিটপন্থি কনজারভেটিভদের মিশেল রয়েছে। তারা চান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণ থেকে শক্তিশালী বা সমৃদ্ধ ব্রিটেনকে বের করে নিয়ে আসা। সমস্যা হলো, জনসন ব্রাসেলসের সঙ্গে যে বাণিজ্য আলোচনা শুরু করছেন, এটা নির্বাচনী কারণে খুশির খবর হলেও তার পূর্বসূরিদের হতাশাগ্রস্ত করার কারণ হতে পারে।

যদি তিনি তার এই নতুন রক্ষণশীল জোট ধরে রাখতে চান, তাহলে জনসনকে লেবারদের সাবেক শক্ত ঘাঁটি উত্তর ইংল্যান্ডের শিল্প খাতে অর্থনৈতিক সুবিধা প্রদান করতে হবে। একই সঙ্গে ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ব্রেক্সিটপন্থিদের যে আশ্বাস দিয়েছেন তা পূরণ করতে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে অবশ্যই অনেক উদার হতে হবে।

জনসনের অভ্যন্তরীণ নীতির ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী নৈতিক ব্যাপার জড়িত রয়েছে। এর আলোকে অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রভাববলয় থেকে যুক্তরাজ্যকে বের করে আনা এবং শহর হিসেবে লন্ডনের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার মতো ব্যাপার রয়েছে। এটা ব্রিটেনের দুর্বল উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে পূর্বশর্ত হতে পারে। মুক্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে জনসনের দিক থেকে একটি ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হচ্ছে, এতে মানুষের কোনো ভুল নেই। এমনকি কোনো একক ভোক্তারও কোনো ভুল নেই। আমি এ কারণে উদ্বিগ্ন যে, রাজনীতিবিদরা নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। সব জায়গায় বাণিজ্যবাদী মনোভাব রয়েছে। সংরক্ষণবাদীরাও তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন।’

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড

এখন পর্যন্ত বরিস জনসন যেসব উদ্যোগ নিয়েছেন, কিংবা বক্তব্য দিয়েছেন, তার মাধ্যমে সমর্থক সব পক্ষকেই সন্তুষ্ট রাখার একটা প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। জনসন দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাজ্য কথিত ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বিধানে স্বাক্ষর করবে না। এর মাধ্যমে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার বিধিবিধানে ব্যাপক শ্রেণিবিন্যাস তৈরি হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া নীতিনির্ধারণের জায়গাগুলোতে বিশেষত পরিবেশগত নীতি, ট্যাক্স ও রাষ্ট্রীয় সেবার মতো জায়গাগুলোতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হবে। কিন্তু ইইউ জানিয়ে দিয়েছে, এই প্রতিশ্রুতি না দেওয়া হলে তারা যুক্তরাজ্যকে শূন্য শুল্ক ও কোটা সুবিধা দেবে না পণ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে। অথচ ব্রিটিশরা এ সুযোগ পাওয়ার প্রত্যাশা করে।

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান সুযোগ তৈরির করা মতো ব্যাপারে জনসন নিজেকে আত্মসমর্পণ করতে চান না। কারণ তারা একটি নতুন সার্বভৌম ব্রিটেন দেখতে চান, যেখানে বিশ্ব বাণিজ্যের সব ক্ষেত্রে নিজেদের বিচরণ দেখতে পাবেন। অন্যথায় যুক্তরাজ্য ব্রাসেলসের নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হতে পারে। জনসন মূলত কানাডার মতো বাণিজ্য ব্যবস্থা চান। তবে এটি যদি সম্ভব না হয়, তাহলে অস্ট্রেলিয়ার মতো বাণিজ্য ব্যবস্থার সুযোগ পেতে চাইবেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার কোনো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নেই। সুতরাং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতির আলোকে এটা কিছুটা সহজ নীতির আশ্রয় নেওয়া বলা চলে। অথবা ইউরোপের বাণিজ্য অংশীদারিত্ব থেকে বিভক্ত করার মতো ‘চুক্তিহীন’ নীতি নিতে হতে পারে, যার কারণে অনেক কিছুতে নিজেদের মধ্যকার বিষয়গুলো অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। সম্ভবত এক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পার্শ্বচুক্তিরও প্রয়োজন হতে পারে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বর্তমানে থাকা শূন্য শুল্ক কিংবা শূন্য কোটার মতো ব্যাপারগুলোয় আরও অধিকতর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশটি অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। এছাড়া এর ফলে উত্তর ইংল্যান্ড অঞ্চলের যারা তার পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তাদের জন্য ব্যাপারটি আরও কষ্টদায়ক হয়ে উঠতে পারে। এমনকি কানাডাকেও পোলট্রি, মাংস ও ডিমে শুল্ক দেওয়ার পাশাপাশি কোটা ব্যবস্থাকেও সমীহ করতে হয়। যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা হিসাব করে দেখেছেন যে, কানাডার মতো মুক্ত বাণিজ্য সমঝোতার কারণে আগামী ১৫ বছরে জিডিপির চার দশমিক ৯ শতাংশ হারাতে হতে পারে। ইইউ’র সঙ্গে যুক্তরাজ্যের অবস্থান করার সময়ের সঙ্গে তুলনা করে এ হিসাব করা হয়েছে। আর একটি ডব্লিউটিও ব্যবস্থাপনায় চলা এর থেকেও খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির সব অংশ সমানভাবে নতুন এই ক্ষতির মুখোমুখি হবে না। ইইউর সঙ্গে নতুন বাণিজ্য সংঘাতের ফলে যে অংশগুলো অনেক বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে, সে জায়গাগুলোয় তিনি ‘সমতা’ তৈরির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

অবশ্যই জনসনের বক্তব্য সব ধরনের বাণিজ্য সমঝোতায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মূল পরিকল্পনার সূচনা মাত্র। একই সময়ে ইইউ’র মিশেল বার্নিয়ারও আলোচনা প্রস্তাবনা দিয়েছেন, যে বিষয়ে কাজ চলছে। ঘড়ির কাঁটা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হয়তো আরও অনেক কিছুই পরিবর্তন হবে, যে সময়সীমা চলতি বছরের শেষ নাগাদ নির্ধারিত রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ইইউ সমতা তৈরির বিষয়ে যুক্তরাজ্যকে শর্তসাপেক্ষে ছাড় দেবে, যার বিনিময়ে ব্রিটিশ মৎস্যসমৃদ্ধ জলসীমায় অব্যাহত প্রবেশাধিকার চাইবে তারা। এমনকি জিব্রাল্টার ইস্যু ইইউ’র প্রস্তাবনায় দর কষাকষির কেন্দ্রে চলে আসতে পারে।

অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে জনসনের নীতিগুলো সঠিক প্রমাণ করতে হলে বেশকিছু ব্যাপার তার অনূকূলে থাকতে হবে। এটি তার ব্রেক্সিট-পরবর্তী সবচেয়ে বড় জুয়াও বলা চলে। এ সময়ে নিঃসন্দেহে ইইউ হবে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় আলোচনার পক্ষ। এছাড়া ব্রিটেনের ভূরাজনৈতিক ক্ষমতা এবং এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের নৈকট্য গুরুত্ববহ হয়ে উঠবে। তার আরও একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে যে, ইইউ’র সঙ্গে আরও বাণিজ্য দূরত্ব তৈরি হলে তার দেশের অর্থনীতিতে কী ক্ষতি তৈরি হতে পারে। এটা ধীরে ধীরে হবে এবং সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ছড়িয়ে দিতে হবে। অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে এটির সমাধান হতে পারে।

স্বস্তির জায়গা হলো, দীর্ঘদিন ধরে চলমান ব্রেক্সিট বিতর্কের সমাপ্তি ঘটেছে। পার্লামেন্টের ব্রেক্সিট পক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়েছে। এছাড়া এমন একজন প্রধানমন্ত্রী রয়েছেন, যিনি পশ্চাদপসরণের জন্যও সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন বেশ সক্ষমতার সঙ্গে, জনসন সময়কেও নিজের মতো করে নিতে পারেন। কিন্তু তাকে এটাও অবশ্যম্ভাবী রূপে মেনে নিতে হবে যে, ইইউ এখনও অনেক প্রভাবশালী। ব্রিটেনের দোরগোড়ায় তাদের বিশাল বাণিজ্যিক কেন্দ্র রয়েছে। তিনি হয়তো নিজেকে বাণিজ্যিক সুপারম্যান হিসেবে পরিণত করতে চান, তবে ব্রাসেলসের এক্ষেত্রে এখনও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করার বা তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রয়েছে।

ইউরোপীয় রাজনীতি ও

অর্থনীতিবিষয়ক লেখক, ব্ল–মবার্গ

গালফ নিউজ থেকে ভাবানুবাদ: তৌহিদুর রহমান  

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..