আনোয়ার হোসাইন সোহেল : পরিচালকদের দ্বন্দ্বের জেরে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত নন-লাইফ নিটল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির শেয়ারদর কমছে। দীর্ঘদিন ধরে বাড়তে থাকা নিটল ইন্স্যুরেন্সের কোম্পানির শেয়ারদর গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কমছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে পুঁজিবাজারে লেনদেন ও শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় ভালো হলেও একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় নিটল ইন্স্যুরেন্সের ব্যবসায় তার প্রভাব পড়েছে। যদিও কোম্পানির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান শেয়ারদর যথেষ্ট স্বাভাবিকই আছে।
গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারদর ৩২ দশমিক ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি থেকে শুরু করে কোম্পানিটির শেয়ারদরে ক্রমাগত ধস লক্ষ করা যাচ্ছে। গত ২৫ জানুয়ারি থেকে কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারদর ২ দশমিক ৯২ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ কোম্পানিটির প্রতিটি ৩০ টাকা ৮০ পয়সার শেয়য়াদর ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কমে দাঁড়িয়েছে ২৮ টাকা ৭০ পয়সায়।
নিটল ইন্স্যুরেন্সের একটি সূত্র জানায়, নিটল-নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মাতলুব চৌধুরীর নিকটাত্মীয় এস এম মাহবুবুল করিমকে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান করা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানিটির পরিচালকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। চেয়ারম্যানের নিকট আত্মীয় হওয়ার এস এম মাহবুবুর করিম কোম্পানিটিতে একক কর্তৃত্ব চালু করেছেন। তার একক সিদ্ধান্তে অনেক অযোগ্য কর্মীকে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিটির উচ্চপদে পদায়ন করা হলেও বঞ্চিত হয়েছেন অনেক যোগ্যকর্মী। এ নিয়ে ইন্স্যুরেন্স কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। চাকরিচ্যুত করার থেকে শুরু করে অকারণে কোম্পানির সাধারণ কর্মীদের চাকরিচ্যুত করার মতো ঘটনারও অভিযোগ রয়েছে। ন্যায্য অনেক দাবি-দাওয়া কিছুই মানছেন না চেয়ারম্যান এস এম মাহবুবুল হক। তার অবাধ্য হলেই পরিচালকদেরও ধমকের ওপরে রাখেন মাহবুবুল হক। তার ভয়ে কোম্পানির মিটিংয়ে কোনো পরিচালক টু শব্দ পর্যন্ত করতে পারেন না।
ডিএসই সূত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ হিসাব বছরে কোম্পানিটির আয় যেখানে ছিল ১১ কোটি ৪৩ লাখ ও ১১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। সেখানে ২০২২ সালে এসে কোম্পানিটির আয়ে বড় ধরনের ধস লক্ষ করা যায়। ওই বছর কোম্পানিটির আয় কমে দাঁড়ায় ৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকায়। সেখান থেকে ২০২৩ সালে এসে দাঁড়ায় ৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকায়। যদিও ২০২৪ অর্থবছরের কিছুটা আয় বেড়েছে। তবে দুই অঙ্কের কোটির ঘরে পৌঁছাতে পারেনি নিটলের আয়। একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ২ দশমিক ৮৪ শতাংশ থেকে কমতে কমতে বর্তমানে ১ দশমিক ৯৭ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। নিটল ইন্স্যুরেন্সের মুনাফা কমায় ধীরে ধীরে বিনিয়োগকারীদেরও মধ্যে নগদ লভ্যাংশ বিতরণের পরিমাণও কমিয়ে আনা হয়েছে। সর্বশেষ হিসাব বছরে কোম্পানিটির বিনিয়োগকারীদের ৫ শতাংশ নগদ ও ৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিটল-নিলয় গ্রুপের জনসংযোগ কর্মকর্তা নিটল-নিলয় গ্রুপের জনসংযোগ কর্মকর্তা নিয়াজ শেয়ার বিজকে বলেন, নিটল ইন্স্যুরেন্সর মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। মাতলুব সাহেব মাত্র ৪০ কোটি টাকা পেইড-আপ ক্যাপিটালের এই কোম্পানিটির দিকে তেমন একটা মনোযোগ দেন না। তবে শেয়ারহোল্ডার হিসেবে তিনি নিটল ইন্স্যুরেন্স থেকে নিয়মিত লভ্যাংশ নেন।
নিটলের মুনাফা কমার কারণ জানতে চাইলে কোম্পানি সচিব শেয়ার বিজকে মো. মিজানুর রহমান বলেন, মাহবুবুল করিম সাহেব মাতলুব সাহেবের আপন শেলক। তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে কোম্পানি পরিচালনা করছেন। তবে পারিবারিক মনমালিন্য কম-বেশি সব পরিবারেই আছে। এটা ব্যবসায় প্রভাব ফেলার মতো কোনো দ্বন্দ্ব নয়। তার ভাষায় ‘এটা আজগুবি কথা’। তাহলে কোম্পানির মুনাফা কমছে কেন জানতে চাইলে মো. মিজানুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ শতাংশ (৫% নগদ এবং ৫% স্টক) লভ্যাংশ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নিটল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বড় বিনিয়োগ আসে নিটল মটরস থেকে। দ্বন্দ্ব থাকলে তো আর এত বিনিয়োগ আসত না বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক টানা পড়েন কি লভ্যাংশ কম দেওয়ার কারণ? জানতে চাইলে মো. মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ-ভারত চলমান টানা পড়েন পরিস্থিতিতে নিটল ইন্স্যুরেন্সের ব্যবসায় কোনো প্রকার প্রভাব পড়েনি।
ডিএসইর তথ্যমতে, কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা, পরিশোধিত মূলধন ৪০ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০০৫ সালে ২৩ জুন কোম্পানিটিকে পুঁজিবাজার থেকে ৯ কোটি টাকা উত্তোলনের জন্য অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ অনুযায়ী বর্তমানে কোম্পানিটিতে উদ্যোক্তা বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৩৫ শতাংশ, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৩৮ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী রয়েছে ২৬ দশমিক ২৮ শতাংশ।
সবশেষ গত ৩ ফেব্রুয়ারি কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারদর ২৯ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২৮ টাকা ৮০ পয়সায়। গত ৫২ সপ্তাহের হিসাবে কোম্পানির শেয়ারদর ২২ টাকা থেকে ৩১ টাকা ৮০ পয়সায় ওঠানামা করেছে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post