দিনের খবর বাণিজ্য সংবাদ শিল্প-বাণিজ্য

নিত্যপণ্যের আমদানি ব্যয় ৯০ দিনে পরিশোধ করা চ্যালেঞ্জিং

আমদানিকারকদের দাবি

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: ভোগ্যপণ্য জাহাজীকরণ থেকে দেশের বন্দরের খালাস পর্যন্ত ১০০ থেকে ১২০ দিন সময় লাগে। এর মধ্যে এলসি নেগোসিয়েশন হয়ে বন্দরে আসতে সময় লাগে ক্ষেত্রবিশেষে ৪৫ থেকে ৬০ দিন এবং খালাসে সময় লাগে ৬০ থেকে ৭৫ দিন। এছাড়া বিভিন্ন সময় জাহাজজট, লাইটার জাহাজের স্বল্পতা, বৈরী আবহাওয়া, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের কর্মবিরতিসহ নানা কারণে পণ্য খালাসে অতিরিক্ত সময় লাগে। অথচ ভোগ্যপণ্যের আমদানি-পরবর্তী অর্থায়নের (পিআইএফ) মেয়াদ পিআইএফ ইস্যুর তারিখ থেকে অনধিক ৯০ দিন। এ সময়ে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করা আমদানিকারকদের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সূত্রে জানা যায়, দেশে ভোগ্যপণ্যের সংকট থাকায় আমদানির মাধ্যমে সিংহভাগ চাহিদা পূরণ করা হয়। সাধারণত বিদেশ থেকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন ধারণক্ষমতার বড় জাহাজে কুতুবদিয়ায় সমুদ্রে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে ভোগ্যপণ্য খালাস করা হয়। তারপর নদীপথে চট্টগ্রামের সদরঘাটসহ দেশের বিভিন্ন নদী বন্দর ও নৌঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় একটি জাহাজের ভোগ্যপণ্য জাহাজীকরণ থেকে দেশের বন্দরের পণ্য খালাস পর্যন্ত ১০০ থেকে ১২০ দিন সময় লাগে।

এর মধ্যে এলসি নেগোসিয়েশন হয়ে বন্দরে আসতে সময় লাগে ক্ষেত্রবিশেষে ৪৫ থেকে ৬০ দিন এবং জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে সময় লাগে ৬০ থেকে ৭৫ দিন। এছাড়া আমদানিকারক বাকিতে পাইকারদের কাছে পণ্য সরবরাহ করে। তাদের কাছ থেকে পাওনা আদায়ে অনেক সময় লেগে যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন সময় জাহাজজট, লাইটার জাহাজের স্বল্পতা, বৈরী আবহাওয়া, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের কর্মবিরতিসহ নানা কারণে পণ্য খালাসে অতিরিক্ত সময় লাগে। এতে পণ্য আমদানি ও সরবরাহে বিপাকে পড়তে হয় আমদানিকারকদের। যদিও এ সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের দর হ্রাস-বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা হ্রাস ও বৃদ্ধির ঝুঁকি নিয়ে একজন আমদানিকারকে পণ্য আমদানি করতে হয়ে। অথচ গত ১৩ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা বিআরপিডি সার্কুলার নং-১২-এর ধারা ২.২ (ক) অনুযায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে পিআইএফের মেয়াদ পিআইএফ সৃষ্টির তারিখ থেকে অনধিক ৯০ দিন নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে অধিকাংশ আমদানিকারকের পক্ষে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হবে না।

ভোগ্যপণ্যের আমদানিকারক এবং দি চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম শেয়ার বিজকে বলেন, জাহাজ থেকে খালাসের পর ভোগ্যপণ্য গুদামজাতকরণ ও পরবর্তী সময়ে বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ৬০ থেকে ৮০ দিন সময় লাগে। তাছাড়া দেশের বাজারে এসব পণ্য শতভাগ বাকিতে বিক্রি করতে হয়। সে অর্থ বাজার থেকে আদায় করতে ১০০ থেকে ১২০ দিন সময় লেগে যায়। সহজ হিসাবে আমদানি করা ভোগ্যপণ্যের ক্যাশ কনভারশন সাইকেল সাধারণত ২০০ থেকে ২৪০ দিন। কাজেই পিআইএফ-পরবর্তী ৯০ দিন সীমা প্রতিপালন করে আমদানিকারকদের পক্ষে ভোগ্যপণ্য আমদানি করে ব্যবসা করা সম্ভব হবে না। সময় মতো ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে না পারার কারণে অনেক ব্যবসায়ী খেলাপিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এছাড়া বর্তমানে বিশ্ব মহামারির কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে নি¤œমধ্যবিত্ত ও নি¤œ আয়ের মানুষ জীবন ও জীবিকা নির্বাহে কঠিন সময় পার করছে। এ পরিস্থিতিতে উল্লিখিত সময়সীমার কারণে আমদানি কার্যক্রম ব্যাহত হলে এবং খাদ্যপণ্য বা ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলে তা অসচ্ছল মানুষের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় হয়ে দেখা দিতে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্মকর্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর সীমানায় জাহাজ এলে দিনে দিনে খালাস করার সুযোগ আছে; যদি আগে থেকে সব ধরনের শুল্ক-কর পরিশোধ করা থাকে। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো ধরনের জাহাজজট নেই। আর এখন সর্বোচ্চ জাহাজ হ্যান্ডলিং হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস হচ্ছে। আমদানিকারকদের বক্তব্য সঠিক নয়।

এ বিষয়ে একাধিক বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেয়ার বিজকে বলেন, সাধারণত ভোগ্যপণ্য আমদানিতে আগে ঋণ পরিশোধে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না। ফলে এ ঋণ পরিশোধের বেশি সময় নিত। তবে ভালো আমদানিকারকরা দ্রুত সময়ে পরিশোধ করে। আর ভোগ্যপণ্য আমদানির ঋণ ভিন্ন খাতের ব্যবহারের সুযোগ নেয় কিছু অসৎ ব্যবসায়ী। এতে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হওয়ার সুযোগও ছিল। আর বর্তমানের খেলাপি ঋণ জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রধান অন্তরায়। এসব কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানি-পরবর্তী অর্থায়নের (পিআইএফ) মেয়াদ পিআইএফ সৃষ্টির তারিখ থেকে অনধিক ৯০ দিন নির্ধারণ করে দেয়। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে আমদানিকারকের অনুরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক আরও কিছু সময় বাড়িয়ে দেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে। এক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদনে সবার জন্য এ সুবিধা বাড়ালে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। এ সুবিধার অপব্যবহারে হয়তো ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি কিংবা অর্থ পাচার বাড়তে পারে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..