নিম্নমানের প্রসাধন পণ্যে সয়লাব অনলাইন বাজার

কর্মব্যস্ত জীবনে সময় বাঁচাতে এবং সশরীরে শপিংয়ের ঝক্কি-ঝামেলা থেকে রেহাই পেতে নারী-পুরুষ সবাই এখন অনলাইন কেনাকাটায় ভরসা করছেন। প্রযুক্তি এবং ইন্টারনেটের বদৌলতে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব দ্রব্য এখন বাসায় বসে অর্ডার করলেই পাওয়া যাচ্ছে। নানা সুবিধার কারণে বর্তমানে ই-কমার্সের জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। এসবের সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন উপায়ে প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করছে; যার মধ্যে অন্যতম ভেজাল প্রসাধনী সামগ্রীর ব্যবসা। অনলাইনে চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে  বাছবিচার ছাড়াই রূপচর্চার জন্য সেসব প্রসাধন সামগ্রী কিনে অনেকেই ঠকেছেন চরমভাবে। প্রায় অধিকাংশ সময়েই সৌন্দর্যবর্ধনকারী এসব প্রসাধনী সামগ্রী কোনো উপকারে তো আসেই না বরং তা আরও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনলাইনে এসব ভুয়া, অসাধু ব্যবসায়ীদের ভিউয়ার্স ও রীতিমতো অবাক করার মতো। জমকালো বিজ্ঞাপন, ইন্টারনেটের সহজ প্রাপ্যতার ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে অত্যধিক সময় কাটানো এবং কেনাকাটার ঝামেলা এড়াতে অনলাইন কেনাকাটায় ঝুঁকে পড়াই এত এত ভিউয়ের মূল কারণ।

সৌন্দর্যবর্ধনকারী এসব সামগ্রী কিনে অনেকেই হয়েছেন প্রতারিত। এসব পণ্য ব্যবহারের ফলে তৎক্ষণাৎ ত্বক জ্বালাপোড়াসহ শুরু হয় নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। নিঃসন্দেহে এসব সামগ্রীতে অতিমাত্রায় মেশানো হচ্ছে ত্বকের জন্য ক্ষতিকারক  কেমিক্যাল, যার ফলে প্রায়ই সাময়িকভাবে ত্বক ফর্সা কিংবা অন্যান্য সমস্যা দূর করলেও পরে ত্বকে হরেক রকম সমস্যা দেখা দেয়। স্কিন স্ক্রাব ও নানা ধরনের ময়েশ্চারাইজার দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য প্যারাবেনস নামক প্রিজারভেটিভস ব্যবহার করা হয়; যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় হতে পারে স্তন ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ। রং ফর্সাকারী ক্রিমে মেশানো হয় অতিরিক্ত মাত্রায় হাইড্রোকুইনোন; যার ফলে মারাত্মক অ্যালার্জি, ত্বক জ্বালাপোড়া, শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা, জিহ্বা ও মুখ ফুলে ওঠা ছাড়াও হতে পারে স্কিন ক্যান্সার। তাছাড়া হাইড্রোকুইনোন ত্বকে মেলানিনের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে ত্বকে অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব বাড়িয়ে দিতে পারে। প্যারা-ফেনিলেনেডিয়ামাইন (পিপিডি) নামক ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহƒত হচ্ছে লিপস্টিক, মাশকারা কিংবা হেয়ার কালারের মতো পণ্যে। এই পিপিডি হলো এক ধরনের নিউরোটক্সিন, দীর্ঘদিন এর ব্যবহারে দেখা দিতে পারে কিডনির সমস্যা। শ্যাম্পু-কন্ডিশনার, টুথপেস্টে সোডিয়াম লরেথ সালফেটের অতিরিক্ত ব্যবহারে ত্বকের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয় এবং শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাছাড়া এসব পণ্যে পারদ, লেড, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, ডাই অক্সেন, ইউরিয়া, ট্রাইক্লোসানের মতো ক্ষতিকর উপাদানের অতিমাত্রায় ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য। উল্লেখ্য, প্রসাধন সামগ্রীতে প্রায় ১৩ হাজার বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান ব্যবহƒত হয়। এসব উপাদানের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার প্রভাব ফেলছে ব্যবহারকারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি। ডায়রিয়া, অ্যালার্জি, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, বমি, ক্যান্সার, লিভার এবং স্তন ক্যান্সারের সমস্যা ছাড়াও অতিমাত্রায় ব্যবহারের ফলে হরমোনজনিত সমস্যা এবং বিকলাঙ্গ শিশু জম্ন দেয়ার কারণ হতে পারে।

অসাধু ব্যবসায়ীদের এসব ভেজাল এবং ক্ষতিকর প্রসাধনসামগ্রীর দৌরাত্ম্য কমাতে হলে প্রয়োজন রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারে কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং সচেতনতা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এই, ইউরোপ আমেরিকার মতো উন্নত দেশে যেখানে মোট রাসায়নিক উপাদানের মাত্র ১০ শতাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, সেখানে আমাদের দেশের কী অবস্থা হতে পারে তা অনেকটাই অনুমেয়। তাছাড়া অননুমোদিত রাসায়নিক উপাদানের ব্যবহার এবং অনুমোদিত রাসায়নিক উপাদানের অতিমাত্রায় ব্যবহারে সে রকম কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন লক্ষ্য করা যায় না। ব্যবহারকারীদের অসচেতনতার ফলে এসব অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ পেয়ে বসেছে। প্রসাধনসামগ্রীর উৎপাদন, সরবরাহ এবং বিপণন প্রতিটি ক্ষেত্রই কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। আর সৌন্দর্যবর্ধনসামগ্রী তৈরির ভেজাল সব কারখানা সিলগালা করে দেয়ার পাশাপাশি করতে হবে জরিমানার ব্যবস্থা। এসবের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পদক্ষেপ নিলে ভবিষ্যতে সতর্ক হবে আরও অনেকেই। চটকদার বিজ্ঞাপনে নিষেধাজ্ঞা জারিসহ বিজ্ঞাপনদাতাদের বিরুদ্ধেও নিতে হবে কঠোর আইনি পদক্ষেপ। এছাড়া প্রসাধনসামগ্রী ব্যবহারকারীদের হতে হবে অধিক সচেতন। ক্রয় করার আগেই দেখে নিতে হবে পণ্য প্রস্তুতের উপাদানসামগ্রী। আমাদের দেশে ভেজাল প্রসাধনী নিয়ে অনেকে অনেক কথা বললেও এর পরিপ্রেক্ষিতে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ খুব একটা নেয়া হয়নি। তাই এক্ষেত্রে ব্যক্তি সচেতনতাই এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। প্রসাধনী ব্যবহারে ব্যক্তিগত সচেতনতাই পারে এসব ভেজাল এবং ক্ষতিকর পণ্যের বিস্তার রোধ করতে এবং সেই সঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ীদের পতন ঘটাতে।

বিলকিস নাহার পিংকি

শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯০  জন  

সর্বশেষ..