মত-বিশ্লেষণ

নিম্ন আয়ের শীতার্তদের নিয়ে উদাসীনতা কেন?

তৌহিদুর রহমান: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে কয়েক বছর ধরে। এতে যে দেশগুলোয় বেশি প্রভাব পড়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কয়েক বছর ধরেই অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টিসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। এমনকি মৌসুমি আবহাওয়াতেও পরিবর্তন আসছে। অতীতে যে সময়টাতে শীত কিংবা গরম অনুভূত হতো, এখন তাতে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যখন শীত অনুভূত হওয়ার কথা, তখন তার দেখা মিলছে না। আবার হঠাৎ করেই তীব্র শীত কিংবা গরম পড়া শুরু হচ্ছে। খালি চোখে এগুলো হয়তোবা জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবেই মনে করা হতে পারে। অবশ্য এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে যারা কমপক্ষে দুই থেকে তিন দশকের আবহাওয়া দেখে অভ্যস্ত, তাদের কাছে আবহাওয়ার পরিবর্তনটা ধরা পড়ছে বেশ ভালোভাবেই। ২০১৯ সালের আবহাওয়া পরিস্থিতি দেখলেও তা সহজেই অনুমান করা যায়।

গ্রীষ্ম মৌসুমে হঠাৎ করেই তীব্র গরম পড়তে দেখা গেছে। আবার বছরের যে সময়টাতে বৃদ্ধি হওয়ার কথা, তখন তার দেখা মেলেনি। মৌসুমের শেষের দিকে আবার হঠাৎ করেই বৃষ্টির আধিক্য। গত কয়েক বছরের অতিবৃষ্টি কিংবা অনাবৃষ্টির মতো বিষয়গুলোও ভালোভাবেই টের পাওয়া গেছে। পরে যে সময় থেকে শীত শুরু হওয়ার কথা, তখনও গরম অনুভূত হয়েছে। গত ডিসেম্বর থেকে হঠাৎ করেই পরিস্থিতির পরিবর্তন। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে শীতের দেখা না মিললেও মাসের শেষে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন হয়। হঠাৎ করে জেঁকে বসেছে তীব্র শীত। আবার এ বছরের শুরুতে কিছুটা উষ্ণতা বাড়লেও জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আবার তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। গত তিন-চার সপ্তাহের মধ্যে তাপমাত্রার ওঠানামা আমরা কয়েকবারই দেখেছি।

আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার ওপর এদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের ভাগ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোনো কারণে আবহাওয়া খারাপ হলে খেটে খাওয়া দিনমজুর মানুষের ওপর চাপ পড়ে। আর তারা কাজ না পেলে পুরো পরিবারকেই চাপে পড়ে যেতে হয়। চলতি শীত মৌসুমেও আবহাওয়ার যে লুকোচুরি খেলা চলছে, তাতে এর ব্যতিক্রম কিছু ঘটছে না। তীব্র শীতের কারণে বিশেষত দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে অনেক। অনেক মানুষের কাজের জন্য বাড়ির বাইরে বের হওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন আবহাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য, তাই ভালো খবর নয় নিঃসন্দেহে। তীব্র শীতে তাদের জীবন-জীবিকায় টান পড়ার খবরও আসছে গণমাধ্যমে। কিন্তু হতাশাজনকভাবে এবার তাদের জন্য পর্যাপ্ত সহযোগিতার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

চলতি বছরের শুরুর দিনগুলোয় উষ্ণতা থাকলেও কয়েক দিন ধরে কমতে শুরু করেছে তাপমাত্রা। উত্তরাঞ্চলে অনেক স্থানে তাপমাত্রা ছয় ডিগ্রি পর্যন্ত নেমে গেছে। এ মাসে আরও কয়েক দিন তাপমাত্রা কমা অব্যাহত থাকতে পারে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে। রাজধানীতেও দিনে ও রাতে তাপমাত্রার পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। বছরের এ সময়টাতে শীতের তীব্রতা থাকা স্বাভাবিক। তবে এটি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য তীব্র কষ্টের তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের জন্য পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা করা জরুরি। প্রতি বছর সরকারি-বেসরকারি এমনকি ব্যক্তিপর্যায় থেকে তাদের শীত নিবারণ ও জীবিকানির্বাহের জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এবারও কিছু উদ্যোগ চোখে পড়ছে। তবে চলতি বছর এ ধরনের উদ্যোগ এখনও পর্যাপ্ত নয় বলে অভিমত অনেকের।

অন্য মৌসুমের তুলনায় শীতের সময়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ভোগান্তি বৃদ্ধি পায় কয়েকগুণ। বিশেষত দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলে শীতের তীব্রতা বেশি থাকায় তাদের ভোগান্তির পরিমাণও বেশি। ওই অঞ্চলে নিম্ন আয়ের দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি বলে প্রচলিত একটি ধারণা হয়েছে। ফলে বাড়তি খরচে কোনো কিছু কিনতে গেলে তাদের সংকটও বাড়ে, শীত মৌসুমে যা বৃদ্ধি পায় বহুগুণ। কারণ শীতের পোশাকসহ নানা সামগ্রীর দাম বেশি হওয়ায় অনেকেরই কেনার সামর্থ্য নেই। বিত্তশালীদের ও সরকারি সহায়তার ওপর অনেকাংশে তাদের শীত নিবারণ নির্ভর করে। ফলে সহযোগিতা না পেলে তাদের শীত নিবারণ দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। দুঃখ-দুর্দশার ও ভোগান্তির শেষ থাকে না।

শীত মৌসুমে ঠাণ্ডাজনিত নানা রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাবও দেখা যায়। এতে প্রাণহানির নজিরও অনেক। ঠাণ্ডাজনিত রোগ থেকে মুক্তি পেতে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হয় অনেককে। সময়মতো অনেক রোগের চিকিৎসা করতে না পারলে তা জীবনহানির কারণ হতে পারে বৈকি। অবশ্য প্রতিবছর সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিপর্যায়ে নি¤œ আয়ের মানুষের রোগমুক্তিতেও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু চলতি বছর তাতেও অনেকটা ভাটা দেখা যাচ্ছে। ফলে তীব্র শীতেও পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাচ্ছে না অসহায় মানুষগুলো। আবার তাদের মধ্যে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কাও বাড়ছে। এ অবস্থা চলতে পারে না।

অসহায় মানুষদের সহযোগিতা করতে আমাদের দেশে খুবই খারাপ ধরনের নিন্দনীয় কিছু সংস্কৃতির প্রচলন রয়েছে। দেখা যায়, যেসব ক্ষেত্রে অধিক প্রচারণা পাওয়া যায়, কিংবা অধিকাংশ মানুষকে জানানো যায়, তাতে তাদের আগ্রহ বেশি। কিন্তু অনেকে আছেন, যারা প্রচারণা না পেলে এ পথে পা বাড়ান না। অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কিছু ঘটার নজিরও রয়েছে। অনেকে আছেন, যারা এমনভাবে সহযোগিতা করেন কেউ জানতেও পারেন না। এগুলো করা হয় একেবারেই ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে। তবে তাদের সংখ্য একেবারেই কম। এছাড়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কিছু সংগঠন আছে, যেগুলো বিভিন্ন মহল থেকে সা হায্য-সহযোগিতা সংগ্রহ করে শীতার্ত মানুষের শীত নিবারণের ব্যবস্থা করে। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এতে বেশি।

অসহায় মানুষদের সহযোগিতার ক্ষেত্রে অভিযোগের তীর রাজনৈতিক নেতাদের নিয়েই সবচেয়ে বেশি, এবারও যার ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। কিছুদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে এ নিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সামনে নির্বাচন কিংবা পদ-পদবি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা বা উপলক্ষ থাকলে রাজনৈতিক নেতাদের তৎপরতা বেড়ে যায়। তারা সহজে কেন্দ্রের কিংবা সাধারণ মানুষের মনোযোগ পেতে চান। আর এজন্য অসহায় মানুষকে সহযোগিতার পথ বেছে নেন। কিন্তু এবার নির্বাচন কিংবা পদ-পদবি পাওয়ার মতো উপলক্ষ না থাকায় তাদের তৎপরতাও নেই। ফলে সাহায্য পাচ্ছে না অসহায় শীতার্ত মানুষগুলো। রাজনৈতিক নেতাদের এ ধরনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের প্রকৃতি সেবক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে হবে, অসহায় নিম্ন আয়ের মানুষকে ব্যবহার করে সুবিধা আদায় করে নেওয়ার জন্য নয়।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, দেশের বেশকিছু এলাকায় শৈত্যপ্রবাহ কয়েক দিন অব্যাহত থাকবে। কিছু এলাকায় নতুন করে শুরু হতে পারে। চলতি মাসজুড়ে এ ধারা অব্যাহত থাকার শঙ্কা রয়েছে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের ভোগান্তি সহসাই দূর হচ্ছে না বলা চলে। বিষয়টি আমলে নিয়ে ভুক্তভোগী মানুষের জন্য সরকার থেকে শুরু করে বিত্তবানদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসারও ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলায় কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে দুই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, নিম্ন আয়ের মানুষকে ভোগান্তি থেকে বাঁচাতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শীত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা যাতে শীত নিবারণের প্রয়োজনীয় পোশাক-আশাক পায় সে ব্যবস্থা নিতে হবে। তারা খাবারের অভাবে যাতে কষ্ট না পায় সেজন্য ত্রাণ বিতরণের উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকে। সমাজের উচ্চবিত্তশ্রেণিরও দায় রয়েছে তাদের সহযোগিতা করার। আর দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে সমাজের এ শ্রেণির মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলার পদক্ষেপ নিতে হবে। ছিন্নমূল ও আশ্রয়হীন যারা আছেন, তাদের চিহ্নিত করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি। সরকারি-বেসরকারি নানা পর্যায়ের পদক্ষেপে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে অনেক। তবে পদক্ষেপগুলো আরও ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, আবহাওয়ার বিচিত্র আচরণের কারণ অনুসন্ধান করে বের করতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের মনুষ্যসৃষ্ট নানা কর্মকাণ্ডের দায় রয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনেরও ভূমিকা রয়েছে। তাতে অবশ্য আমাদের তুলনায় বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর দায় বেশি। এক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে নিতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে একজোট হয়ে দূষণ থেকে বিরত থাকতে উন্নত দেশগুলোকে বাধ্য করতে হবে। এছাড়া আমাদের যেসব ক্ষেত্রে দায় রয়েছে পরিবেশ দূষণ করার, তা থেকে বিরত থাকতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রকৃতির অনেক বিষয় আছে যেগুলো হারিয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্বটাও তাই আমাদের নিতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হয়তো এ ভূমি বাসযোগ্য রাখাটা অনেক কঠিন হয়ে যাবে। তখন তারা দায় চাপাবেন আমাদের ওপরই।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..