দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

নিয়ন্ত্রণহীন বিকল্প ওষুধের বাজার

আয়নাল হোসেন: দেশে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের বাজার সম্প্রসারণ হওয়ায় বিকল্প ওষুধ (অল্টারনেটিভ মেডিসিন) ইউনানি, হোমিও, হারবাল ও আয়ুর্বেদিক ওষুধের কদর অনেকটাই কমে গেছে। ঔষধ প্রশাসনেরও নজরদারি কম থাকায় বিক্রেতারাও তাদের ইচ্ছামতো দামে বিক্রি করছেন এসব ওষুধ। পাশাপাশি সমাজে এসব খাতের চিকিৎসকদের নিয়ে নানা নেতিবাচক ধারণা প্রচলিত থাকায় মেধাবীরা এ খাতে আসতে চান না। যে কারণে হোমিও ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থার আশানুরূপ অগ্রগতি হচ্ছে না।

জানা যায়, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর অর্ধযুগ আগে বিকল্প এসব ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে একটি কমিটি গঠন করেছিল। কিন্তু সেই কমিটির কোনো কার্যক্রম এখনও চোখে পড়েনি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২৭৩টি ইউনানি, ২০৫টি আয়ুর্বেদিক, ৭৯টি হোমিওপ্যাথিক ও ৩৫টি হারবাল ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি রয়েছে। এগুলো বিকল্প ওষুধ হিসেবে পরিচিত। ২০১৮-১৯ সময়ে দেশে বিকল্প ওষুধের বাজার ছিল প্রায় ৯০০ কোটি টাকার। ওষুধবিদ্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ওষুধ কার্যকরী থাকলেও দেশে কোনো গবেষণা হচ্ছে না। ফলে এসব ওষুধ ব্যবহার ও কার্যকরিতা নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পোশার মানুষের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হচ্ছে।

বিকল্প ওষুধ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্বীকৃত চিকিৎসা ব্যবস্থা। চীন ও ভারতে এ ওষুধের চিকিৎসায় ব্যাপক অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ওষুধ ও এসব ওষুধ তৈরির কাঁচামালের গুণমান পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে না। এমনকি প্রস্তুতকারকরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্যাকটিস (জিএমপি) গাইডলাইনও অনুসরণ করছে না। এ নিয়ে গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান জিএমপি অনুসরণ না করে ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করছে তাদের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশে বিকল্প ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল প্রায় অর্ধযুগ আগে। কিন্তু ওই কমিটি এখনও ওষুধের দাম নির্ধারণ করতে পারেনি। ফলে উৎপাদনকারী থেকে শুরু করে পরিবেশক, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা তাদের ইচ্ছামতো দামে এসব ওষুধ বিক্রি করছেন। এতে রোগী ও তাদের স্বজনরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দেশের দরিদ্র ও হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশ বিকল্প ওষুধ হিসেবে হোমিও, আয়ুর্বেদিক, ইউনানি ও হারবাল ব্যবহার করেন।  

জানতে চাইলে রাজধানীর পুরানা পল্টনের ইনো হোমিও হলের স্বত্বাধিকারী চিকিৎসক রাশিদুল হক

বলেন, যেসব হোমিওপ্যাথি ওষুধ জার্মানিসহ অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি হচ্ছে সেগুলোর মূল্য নির্ধারণ করেন আমদানিকারক ও পাইকারি বিক্রেতারা। প্যাটেন্ট ওষুধের ক্ষেত্রে মূল্য লেখা থাকলেও ক্লাসিক হোমিওপ্যাথি ওষুধের মূল্য বিক্রেতারা নিজেরাই লিখছেন।

অ্যালোপ্যাথিক, ইউনানি, আয়ুর্বেদিক, হোমিওপ্যাথিক ও হারবাল ওষুধের মূল্য নির্ধারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনেও একটি কমিটি রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে ১১ সদস্যের ওই কমিটিও এখন পর্যন্ত বিকল্প ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করতে পারেনি।

বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি মেডিকেল বোর্ডের চেয়ারম্যান দিলিপ কুমার রায় শেয়ার বিজকে বলেন, বিকল্প ওষুধের দাম নির্ধারণ মূলত ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এখতিয়ারভুক্ত। বিষয়টি তাদের দেখভাল করার কথা। আমাদের দায়িত্ব মূলত চিকিৎসকদের সনদ ও অন্যান্য বিষয় দেখভাল করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, কয়েক বছর আগে বিকল্প ওষুধ ব্যবহার-সংক্রান্ত একটি জরিপ চালানো হয়েছিল। ওই জরিপে দেখা গেছে, দেশের ১১ শতাংশ মানুষ ইউনানি, এর চেয়ে কিছুটা কমসংখ্যক মানুষ আয়ুর্বেদিক এবং সাড়ে আট শতাংশ মানুষ হোমিওপ্যাথি ওষুধ ব্যবহার করছেন। ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে এ সংখ্যাটি নেহায়েত কম না। এজন্য এসব ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত নিয়মনীতির মধ্যে আনতে হবে বলে জানান তিনি। ২০১৬ সালে প্রণীত ওষুধ নীতিতে বিকল্প ওষুধের ব্যাপারে বিস্তর বলা আছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আইয়ুব হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, বিকল্প ওষুধের মূল্য নির্ধারণে অধিদপ্তর একটি কমিটি গঠন করেছিল। ওই কমিটির কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে এ মুহূর্তে জানা যাচ্ছে না। তবে অধিদপ্তরে লোকবলের সংকট রয়েছে। এসব ওষুধের কাঁচামাল ও তৈরিকৃত ওষুধ স্ব স্ব কোম্পানি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকে। এসব ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে তাদের সক্ষমতাও ঘাটতি রয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..