দিনের খবর প্রথম পাতা

নিয়ন্ত্রণে আসছে না সোনালী ও রূপালী ব্যাংকের ফোর্সড ঋণ

শেখ আবু তালেব:পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে ন্যূনতম মার্জিনে এলসি খোলার সুযোগ দেয় ব্যাংক। রাজনৈতিক ও করপোরেট চাপে বেশিরভাগ সময়ই এসব অর্থায়নের বিপরীতে খুব একটা জামানত রাখা হয় না। পণ্য বিক্রি করেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করার নিয়ম। কিন্তু প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরও অনেক সময় তা পরিশোধ করছেন না ব্যবসায়ীরা।

পরবর্তীকালে এসব অর্থায়নকে গ্রাহকের বিরুদ্ধে নতুন ঋণ মঞ্জুর হিসেবে দেখায় ব্যাংক। এসব ঋণকেই ফোর্সড লোন বলা হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় ফোর্সড ঋণ কয়েক বছর ধরেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সর্বশেষ গত ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ও রূপালী ব্যাংকে বৃদ্ধি পেয়েছে ফোর্সড ঋণ। এর আগে অস্বাভাবিক ফোর্সড ঋণ বৃদ্ধির বিষয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংককে হুশিয়ারি দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালানাগাদ তথ্য বলছে, গত ডিসেম্বর শেষে সোনালী ব্যাংকের ফোর্সড ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৭২২ কোটি টাকা। ২০১৯ সাল শেষে এ পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বৃদ্ধি পেয়েছে ১৪ দশমিক ২৭ শতাংশ বা ৩৪০ কোটি টাকা।

অপরদিকে রূপালী ব্যাংকের ২০২০ সালে ফোর্সড ঋণ ১৪৩ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে স্থিতি হয়েছে ৯৯০ কোটি টাকা। এক বছর আগে ২০১৯ সাল শেষে ছিল ৮৪৭ কোটি টাকা।

আর্থিক প্রতিবেদন বিশেষ করে ঋণমান উন্নয়নে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রতি বছর একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে ব্যাংকগুলোকে বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেয়া হয়। গত বছরের সম্পাদিত ওই চুক্তিতেও উল্লেখ করা ছিল ফোর্সড ঋণ কমিয়ে আনার কথা, একপর্যায়ে যা শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনার তাগাদা দেয়া হয়। কিন্তু এর পরও দুই ব্যাংকের ফোর্সড ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতাউর রহমান প্রধান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘করোনা মহামারিতে এখন আমদানি বাণিজ্য কমে গেছে। তাই খুব একটা ফোর্সড লোন হচ্ছে না। আগের বছরের অনেক ঋণই নিয়মিত হয়ে গেছে। কিছু সময় ফোর্সড ঋণ সাময়িক সময়ের জন্য তৈরি করা হয়, যা পরিশোধও হয়ে যায়। আবার কিছু ঋণকে দীর্ঘ মেয়াদে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে সোনালী ব্যাংকের ফোর্সড ঋণ এখন বেশি নয়। সামনের দিনেও খুব একটা বাড়বে বলে মনে হয় না।’

যদিও ফোর্সড ঋণ বৃদ্ধির জন্য ব্যাংকাররাও দায়ী বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। কারণ হিসেবে তারা বলছে, সাধারণত ঋণ মঞ্জুর করতে বেশ কিছু ধাপ অতিক্রম করতে হয়। ক্রেডিট রেটিং দেয়া হয়। রাখা হয় প্রয়োজনীয় জামানত। কয়েকটি ধাপ শেষে চূড়ান্ত অনুমোদন হয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে। এভাবে অনেক ত্রুটিপূর্ণ প্রস্তাবই বাদ পড়ে যায়।

অপরদিকে আগাম বা আমদানি পণ্যে অর্থায়নে এতসব ধাপ নেই। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকই এক্ষেত্রে অনুমোদন দিতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে শুধু পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে লিমিট বা সীমা বেঁধে দেয়া হয়। এভাবে ব্যাংকারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ঋণ নিয়ে নেয় ব্যবসায়ীরা। এতে খরচও কম। এজন্য আগাম ও আমদানি পণ্যের বিপরীতে অর্থায়নে আগ্রহী হয়ে পড়ছে ব্যাংকগুলো। এর ফলে ব্যাংক খাতে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে ফোর্সড ঋণ। ঝুঁকিপূর্ণ এসব ঋণই খেলাপির পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনেও এর প্রমাণ মেলে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, ব্যাংক খাতে ২০২০ সালের এপ্রিল মাসের তুলনায় চলতি বছর এপ্রিল শেষে ব্যাংকগুলোর আগাম দেয়া অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৮ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। ২০২০ সালের এপ্রিলে আগাম দেয়ার স্থিতি ছিল ১০ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। গত এপ্রিলে তা হয়েছে ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা।

গত এপ্রিল শেষে ব্যাংক খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বিতরণ করা ঋণের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে আগাম হিসেবে।

এদিকে গত বছর ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকে ফোসর্ড ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। আর সবচেয়ে কম থাকা অগ্রণী ব্যাংকে দাঁড়িয়েছে ২১৩ কোটি টাকা। যদিও গত বছরের তুলনায় এ দুই ব্যাংকে ফোসর্ড ঋণ কিছুটা কমেছে, তবে ফোর্সড ঋণের থাবা পড়ছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও।

ব্যাংক খাতে অস্বাভাবিক ফোর্সড ঋণের বৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদবির ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সরকারি ব্যাংকগুলোয় আগাম দেয়া হচ্ছে বেশি। এর গ্রহীতারা রাজনৈতিক দিক দিয়ে প্রভাবশালী হওয়ায় কিছুতেই তাদের নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..