প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

নিরাপত্তা ইস্যুতে দুটি সমঝোতা স্মারক সই হবেঃ পররাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক: মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চির বিশেষ দূত চাও তিন ঢাকা সফর করেছেন। তার কাছে বাংলাদেশে অবস্থানরত মিয়ানমারের নাগরিকদের দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ। এজন্য মূল কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশল নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া রাখাইন রাজ্যের সংখ্যালঘু মুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সম্মানজনক জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান করা হয়েছে। এদিকে নিরাপত্তা ইস্যুতে দেশটির সঙ্গে দুটি সমঝোতা স্মারক সই করার বিষয়ে উভয় দেশ রাজি হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব কথা জানান। তিনি বলেন, গত বুধবার অং সান সু চির বিশেষ দূত ঢাকায় এসে পররাষ্ট্র সচিব, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এ সময় সু চির পাঠানো একটি পত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেছেন দূত। এতে, আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার মতপার্থক্য দূর করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ ব্যক্ত করে মিয়ানমার। সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

মন্ত্রী জানান, গত ৯ অক্টোবর ২০১৬’র ঘটনার পর হতে বিপুলসংখ্যক মিয়ানমার নাগরিকের বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ তুলে ধরা হয় সু চির দূতের কাছে। এ সময় প্রতিবেশী দেশটির দূতকে বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে প্রায় ৬৫ হাজার মিয়ানমারের নাগরিক বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছে এবং অনুপ্রবেশের ধারা অব্যাহত রয়েছে। বিপুলসংখ্যক মিয়ানমারের নাগরিকের সাম্প্রতিক অনুপ্রবেশ এবং আনুমানিক তিন লাখ অনিবন্ধিত মিয়ানমারের নাগরিকের দীর্ঘ অবৈধ অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বিনষ্ট এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী মিয়ানমারের নাগরিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা ও জীবিকার নিশ্চয়তা দিয়ে দ্রুত নিজ আবাসে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। এজন্য রাখাইন রাজ্যে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া, রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলমান জনগোষ্ঠীর গণহারে বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান ও মূল সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার জন্য মিয়ানমারকে অনুরোধ জানানো হয়। এজন্য বাংলাদেশে অবস্থানরত নিবন্ধিত শরণার্থী, অনিবন্ধিত মিয়ানমার নাগরিক এবং নবাগতদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে একটি কর্মকৌশল নির্ধারণের প্রস্তাব করে ঢাকা। এটি যাচাইয়ের জন্য একটি যথাযথ কমিটি গঠনের পাশাপাশি প্রয়োজন মোতাবেক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা গ্রহণেরও প্রস্তাব করা হয়। মিয়ানমারের বিশেষ দূত প্রস্তাবটি তার দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কাছে তুলে ধরবেন বলে আশ্বস্ত করেন। এজন্য প্রত্যাবাসন প্রত্যাশীদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টি যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা জানায় দেশটির দূত।

এ প্রসঙ্গে মিয়ানমার বলেছে প্রাথমিকভাবে গত দুই মাসে যারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন তাদের নাগরিকত্বের দাবি যাচাইয়ে আগ্রহী তারা। কিন্তু, বাংলাদেশ নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত সব অনুপ্রবেশকারীর প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে একই সঙ্গে উদ্যোগ নেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে। এ সময় ফিরিয়ে নেওয়াকে কার্যকর ও টেকসই করার জন্য রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা ও টেকসই জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করার উপরও গুরুত্ব দেয় বাংলাদেশ। এছাড়া রাখাইন মুসলিমদের প্রান্তিকীকরণ রোধ ও তাদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি বলে মত দেওয়া হয়।

মন্ত্রী বলেন, রাখাইন রাজ্যের ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সশস্ত্র চরমপন্থা বিকাশের আশঙ্কা উল্লেখ করে তা মোকাবিলায় বাংলাদেশের সহযোগিতা চেয়েছে মিয়ানমার। এ বিষয়ে সন্ত্রাস ও উগ্র জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে নিজস্ব ভূমি ব্যবহার করতে দেয় না এবং ইতোপূর্বে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। এ বিষয়ে মিয়ানমারকে পূর্ণ সহযোগিতার নিশ্চয়তার পাশাপাশি রাখাইন রাজ্যে সন্ত্রাস ও উগ্র জঙ্গিবাদ যাতে বিস্তার লাভ না করে সে লক্ষ্যে অধিকার বঞ্চিত হতাশায় নিমজ্জিত রাখাইন মুসলমান জনগোষ্ঠীর মূল সমস্যা সমাধানে আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।

সফররত দূতের সঙ্গে আলোচনায় নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ার লক্ষ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক দ্রুত স্বাক্ষরের বিষয়ে উভয়পক্ষ সম্মত হয় বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। এগুলো হলো নিরাপত্তা সংলাপ ও সহযোগিতা এবং বর্ডার লিয়াজোঁ অফিস। এছাড়া এ লক্ষে দুই দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের সফর বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে দুই পক্ষ একমত হয়। এ সময় মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চিকে বাংলাদেশ সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী।