শেয়ার বিজ ডেস্ক : জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ছাত্র-জনতার ওপর যে দমন-পীড়ন হয়েছিল, সেটার পেছনে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘মূল সমন্বয়কের’ ভূমিকায় ছিলেন বলে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে এলেও তা অস্বীকার করেছেন তিনি।
তীব্র জনরোষের মুখে ঢাকা ছেড়ে পালানোর ১৫ মাস পর এক লিখিত সাক্ষাৎকারে হাসিনা সেই হত্যাকাণ্ডের দায় চাপিয়ে দিয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর। তবে ভুল স্বীকার করে তিনি বলেছেন, গত বছরের সেই ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি’র সময় নিরাপত্তা বাহিনী যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল, তাতে ‘নিঃসন্দেহে ভুল হয়েছিল’।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে ইমেইল মারফত দেয়া ওই লিখিত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে নির্বাচন আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি সন্দিহান।
২০১৪ সালে রাজনৈতিক দলগুলোর বয়কট সত্ত্বেও ‘বিনা ভোটের নির্বাচন’, ২০১৮ সালে ‘নিশিরাতের নির্বাচন’ ও ২০২৪ সালে ‘আমি-ডামি নির্বাচনে অভিযুক্ত হাসিনা দাবি করেন, আসন্ন নির্বাচন হলে সেটা বৈধ হিসেবে স্বীকৃত হবে না, যদি তার দল অংশগ্রহণের সুযোগ না পায়।
সম্প্রতি বিদেশি কয়েকটি গণমাধ্যমে ইমেইল মারফত দেয়া সাক্ষাৎকারে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানালেও এবার সুর পাল্টে তিনি বলছেন, এমন কোনো আহ্বান তিনি জানাননি।
গত বছরের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। প্রথমে এই আন্দোলন ছিল একেবারেই শান্তিপূর্ণ। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার তার ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে শিক্ষার্থীদের দমনে মাঠে নামালে সহিংসতার শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে কটূক্তি করলে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অগ্নিগর্ভ হলে আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে হাসিনার সরকার। একইভাবে লেলিয়ে দেয়া হয় আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের। তাদের উš§ত্ততায় রাজপথে বয়ে যায় রক্তের নদী। একপর্যায়ে আন্দোলন রূপ নেয় সরকার পতনের এক দফা দাবিতে। তীব্র জনরোষের মুখে শেখ হাসিনা আর টিকতে পারেননি, পালিয়ে যান ভারতে। তার আগে-পরে পালিয়ে যান আওয়ামী লীগের অনেক মন্ত্রী-এমপি ও নেতা-কর্মী। এমনকি পুলিশ-প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাও গা ঢাকা দেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে, জুলাই-আগস্টে অভ্যুত্থান চলাকালে এক হাজার চারশ’র বেশি মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো সামরিক অস্ত্র ও শটগানের গুলিতে মারা যান। হাজার হাজার ছাত্র-জনতা গুরুতর আহত হয়েছেন। পঙ্গু হয়েছেন অনেকেই। অনেকের দুই চোখ, কারও কারও এক চোখ অন্ধ হয়ে গেছে। ১১ হাজার সাতশর বেশি মানুষকে র?্যাব ও পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
বিবিসির যাচাই করা ওই রেকর্ডিং অনুসারে, শেখ হাসিনা তার নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছেন এবং তারা যেখানেই আন্দোলনকারী পাবে, তারা গুলি করবে।
ওই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, ষড়যন্ত্র ও সম্পৃক্ততার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়েছে এবং এর বিচার চলছে।
সেই হত্যাকাণ্ডের দায় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর চাপিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত পরিবর্তিত এবং সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছিলেন। সহিংসতার প্রতিক্রিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্যের আচরণে নিঃসন্দেহে ভুল হয়েছিল, তবে জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তগুলো ছিল স্বভাবতই সামঞ্জস্যপূর্ণ, সৎ উদ্দেশ্যপ্রসূত এবং প্রাণহানি কমানোর লক্ষ্যে নেয়া।’
শেখ হাসিনার শাসনামলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার চলাকালে আসামিপক্ষের সাক্ষী গুম হওয়া, স্কাইপি কেলেঙ্কারিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও ক্ষমতাচ্যুত এ শাসক এখনকার আদালতের বিচারের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি বলেছেন, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায়টি আগে থেকেই নির্ধারিত। যখন তা ঘোষণা করা হবে, আমি অবাক হব না। কিন্তু এই আইসিটি আসলে এক প্রহসনমূলক আদালত, যা আমার রাজনৈতিক শত্রুরা নিয়ন্ত্রণ করছে, যাদের উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ধ্বংস করা। মৃত্যুদণ্ডের দাবি আসলে সেই একই হত্যাপ্রবণ লক্ষ্যকেই পরিবেশন করে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করতে হলে রাষ্ট্রপতির কাছে একটি চিঠি জমা দিতে হয়। আমি কখনও এমন কোনো চিঠিতে সই করিনি, রাষ্ট্রপতিও কোনো পদত্যাগপত্র পাননি।’
কেবল ভারতের প্রশ্রয় ও সমর্থনে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন করা শেখ হাসিনা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নির্বাচন আয়োজনের আহ্বানে কোনো সাড়া দিচ্ছে না। আমি নিশ্চিত নই যে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আদৌ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন যদি হয়ও, আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারলে তা বৈধ হবে না।
আগের সাক্ষাৎকারগুলোয় প্রকাশিত নির্বাচন বর্জনের আহ্বানের সুর পাল্টে শেখ হাসিনা বলেন, ‘স্পষ্ট করে বলি, আমি বর্জনের আহ্বান জানাইনি। আমি শুধু বলেছিলাম, যদি আওয়ামী লীগকে ভোটে অংশ নিতে না দেয়া হয়, তাহলে কোটি কোটি সমর্থক ভোট দেবে না, কারণ তারা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন করার সুযোগ পাচ্ছে না।’
বাংলাদেশে না ফেরার কারণ হিসেবে ‘চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি’কে দায়ী করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ইউনূস তার মন্ত্রিসভায় কিছু ‘উগ্রপন্থিকে’ নিয়োগ দিয়েছেন, এই ঘটনাটা তাদের (উগ্রপন্থিদের) জন্য একধরনের উৎসাহের বার্তা দিচ্ছে এবং নিঃসন্দেহে তাদের বাস্তব সহায়তাও দিচ্ছে।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post