Print Date & Time : 11 May 2021 Tuesday 2:19 pm

নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় টেকসই কৃষি

প্রকাশ: March 3, 2021 সময়- 12:59 am

মাসুদ রানা: খাদ্য মানবজাতির মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিষ্ঠিত হয়। সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান, দারিদ্র্য ও পুষ্টিহীনতা দূর করার মাধ্যমে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে এফএও কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে শুরু করে অদ্যাবধি এই সংস্থাটি সমগ্র বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠী বিশেষত অনুন্নত ও দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলের মানুষের কৃষিব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। এই সংস্থাটির গৃহীত বিভিন্ন সময়োপযোগী ও  প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা অধ্যুষিত পৃথিবীর প্রায় ৭৫০ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ খাদ্যের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। একটি দেশের নাগরিকদের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে খাদ্য অন্যতম। তাই কয়েক দশক ধরে পৃথিবীব্যাপী আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চাষযোগ্য জমি সংরক্ষণ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম বনায়নের মাধ্যমে সবুজায়ন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সব দেশ একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, যেমনÑবৈশ্বিক উষ্ণতা, লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করবে। খাদ্য নিরাপত্তা বলতে খাদ্যের লভ্যতা এবং মানুষের খাদ্য ব্যবহারের অধিকারকে বোঝায়। বিশ্ব খাদ্য সম্মেলন (১৯৯৬) অনুযায়ী ‘খাদ্য নিরাপত্তা তখনই আছে বলে মনে করা হয়, যখন সব নাগরিকের সব সময়ের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যপ্রাপ্তির প্রত্যক্ষ ও অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা থাকে, যা তাদের সক্রিয় ও সুস্থ জীবন নিশ্চিতকরণের জন্য সঠিক পরিমাণ খাদ্যের চাহিদা পূরণ করে।’ বিশ্বে সব মানুষের খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বিশ্বের প্রতিটি দেশ নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা সামনে রেখে তা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে সব খাদ্য উপাদান, যেমনÑখাদ্যশস্য, মাছ, প্রাণিজ আমিষ ও ফলমূল উৎপাদনের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। সময়ের পরিক্রমায় কৃষি ব্যবস্থাপনা ও মানুষের খাদ্যাভাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এখন বিশ্বব্যাপী নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ক্রমবর্ধমান বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের চাহিদা মেটাতে ষাটের দশকের গোড়ায় বিশ্বব্যাপী সবুজ বিপ্লব ঘটে। ফলে কৃষিতে উচ্চ ফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার ক্রমাগতভাবে বেড়েছে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও ক্রমাগত যুদ্ধবিগ্রহ বেড়েই চলেছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে পরিবেশের ওপর এবং মানুষ প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। উচ্চমাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, পরিবেশ দূষণ ও  অপরিকল্পিত চাষাবাদের ফলে মাটির উর্বরতা ক্রমেই বিনষ্ট হচ্ছে। ইটভাটা ও ঘরবাড়ি তৈরিতে উপরিস্তরের মাটি অপসারণ করার ফলে মাটির গুণাগুণ বিনষ্ট হচ্ছে। মাটির জীববৈচিত্র্য হলো ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, কেঁচো ও মাটির মধ্যে বসবাসকারী বিভিন্ন উপকারী জীব। উপরিস্তরের এক চা চামচ মাটিতে বহু প্রজাতির ৬০০ কোটির মতো অণুজীব থাকতে পারে। মাটির জীববৈচিত্র্য রক্ষণাবেক্ষণ পরিবেশ ও কৃষিশিল্প উভয়ের জন্যই প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বে অরগানিক ফার্মিং বা জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহƒত হচ্ছে পরিবেশবান্ধব ও বিরূপ আবহাওয়া-সহিষ্ণু প্রযুক্তি। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয়েছে, তারই জের ধরে বাড়ছে অভুক্ত মানুষের সংখ্যা। জেনেভায় জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য পরিকল্পনার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই মুহূর্তে গোটা বিশ্বে অভুক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ। কভিডের ভয়াবহ প্রকোপে সংখ্যাটি প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে খাদ্য সংকট মোকাবিলায় বর্তমান সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপসমূহ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীরা টেকসই কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও সুষম খাদ্য উৎপাদন, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ এবং সর্বোপরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এর ফলে দেশ এখন দানাদার খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। কৃষি গবেষণায় প্রভূত উন্নতির ফলে কৃষি আজ বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত হয়েছে। পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃক অসংখ্য টেকসই প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে, যা দেশের সার্বিক কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিসহ দেশের খাদ্য ও পুষ্টিচাহিদা পূরণ করছে। তাছাড়া পুষ্টিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক গবেষণায় ধানসহ বিভিন্ন ফলদ ও শাকসবজির সব মৌসুমে চাষযোগ্য পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে অদ্যাবধি ১০৬টি উফশী ধানের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। উফশী ধানের জাতগুলো মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান, যেমনÑআয়রন, জিংক ও প্রোটিনসমৃদ্ধ। ব্রি থেকে অদ্যাবধি ৫৭৯টি উফশী জাত ও ৫৫১টি প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। মৎস্য চাষে ধারাবাহিক সফলতার ফলস্বরূপ বাংলাদেশ এখন মৎস্য উৎপাদনের মাধ্যমে  আমিষের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয়েছে। প্রাণিসম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে উন্নত জাত উদ্ভাবন, খামার ব্যবস্থাপনা ও রোগ বালাই দমনে কাজ করে যাচ্ছে প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া টেকসই কৃষি উন্নয়নের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধায়নে জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি প্রকল্প (এনএটিপি) ২০০৮ সাল থেকে দেশব্যাপী খাদ্যশস্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে কৃষিকে আধুনিকায়নের জন্য ‘জাতীয় কৃষিনীতি, ২০১৮’ প্রণীত হয়েছে। নতুন গৃহীত এই নীতিতে কৃষি খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা, গবেষণা ও সম্প্রসারণ, কৃষি সমবায়, কৃষি বিপণন ও বাজারজাতকরণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

কভিডসহ যে কোনো রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এজন্য আমাদের দৈনিক খাদ্যতালিকায় শর্করাজাতীয় খাবারের পাশাপাশি আমিষ ও ভিটামিনসমৃদ্ধ পুষ্টিকর খাবার, যেমনÑ দুধ, ডিম, মাছ, মাংস, ফলমূল ও শাকসবজি রাখতে হবে। আমাদের দেশের প্রতিটি বসতবাড়ির আঙিনা বা ছাদ হতে পারে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের প্রধান উৎস। পরিকল্পনা মোতাবেক বসতবাড়ির বিভিন্ন জায়গায় মৌসুম ও প্রজাতিভেদে বিভিন্ন শাকসবজি, যেমন শীতকালে ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, পালংশাক, পেঁয়াজ, টমেটো, লেটুস এবং গরমকাল ও বর্ষাকালে পুঁইশাক, ঢেঁড়স, ডাঁটা, লালশাক ও কচু এবং বিভিন্ন প্রজাতির মৌসুমি ফল, যেমনÑআম, জাম, মাল্টা, লেবু, কাঁঠাল, পেয়ারা, লিচু, কলা এবং ঔষধি গাছ, যেমনÑবাসক, থানকুনি, তুলসী ও পুদিনা আবাদ করা যেতে পারে। নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টির জন্য শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদনে জৈব সার, কেঁচো সার ও সবুজ সার এবং বালাই দমনে সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) অনুসরণ করতে হবে। এর ফলে পরিবেশের ওপরে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না এবং খাদ্য গ্রহণে কোনো স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি থাকবে না। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য বসতবাড়িতে গবাদিপশু, যেমন গরু, ছাগল ও ভেড়া পালন এবং পুকুরে মাছ চাষ করা যেতে পারে। উপরিউক্ত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পারিবারিক নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টিচাহিদা পূরণের পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব।

সময় এসেছে নিরাপদ খাদ্য আন্দোলন জোরদার করে নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের জন্য সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। বিশ্বব্যাপী নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টিকে সর্ব্বোচ্চ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করার মাধ্যমে নিরাপদ ও বাসযোগ্য আগামী গড়তে সময়োপযোগী ও যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে সবাইকে সম্মিলিতভাবে ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।

সহকারী অধ্যাপক, কৃষি সম্প্রসারণ শিক্ষা বিভাগ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়