Print Date & Time : 28 February 2021 Sunday 12:29 pm

নিরাপদ খাদ্য, ভোক্তা অধিকার ও বর্তমান সমাজ

প্রকাশ: December 5, 2020 সময়- 11:41 pm

তাসনিম হাসান আবির: বাংলাদেশসহ বর্তমান বিশ্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করা। ভেজালমুক্ত খাদ্য জনগণকে সরবরাহ করাই এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ দিনকে দিন ভেজাল খাদ্যের পরিমাণ এত পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে যে সেটা এখন সীমাহীন ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভেজালকে বলা হয় জাতিধ্বংসের সূক্ষ্ম কারিগর। কারণ মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অন্ন। অর্থাৎ জনগণকে নিরাপদ অন্ন সরবরাহ করা রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। জনগণ যদি শুদ্ধ খাদ্য না পায়, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজš§ অসুস্থতার সঙ্গে বেড়ে উঠবে। আর এভাবে একটি জাতির ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। কিন্তু ইদানীং আমরা লক্ষ করছি এই ভেজালের পরিমাণ সমাজে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। বাংলাদেশে এর পরিমাণটা বেশি। এদেশে এমন কোনো খাদ্য অবশিষ্ট নেই যার মধ্যে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভেজাল মেশায়নি! চাল, ডিম, মাংস ও মাছ থেকে শুরু করে মসলা, ফল সব জায়গায় ভেজাল। নকল চাল ও ডিম এখন বাজারে সয়লাব হয়ে গেছে। মাছ-মাংসে ফরমালিন দিয়ে বিক্রি তো অনেক আগে থেকেই হচ্ছে। ইদানীং বিভিন্ন ফল ফরমালিন দিয়ে পাকানোর প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফা লাভের আশায় নির্দিষ্ট সময়ের আগেই গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করে ফরমালিন দিয়ে পাকিয়ে বাজারজাত করছে, আর মানুষও সেটা কিনছে। এর ফলে তারা এসব ফরমালিনযুক্ত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে এবং বর্তমানে হাসপাতালে এমন রোগীর সংখ্যাও অনেক।

কিন্তু স্বাধীনতার এই এত বছর পর এসে বাংলাদেশে খাদ্য নিয়ে এমন ভেজাল কি আমাদের কাম্য ছিল? অবশ্যই না। জনগণের মৌলিকা চাহিদায় যদি ভেজাল থাকে তাহলে বাকি সবকিছুতে এর নেতিবাচক প্রভাব আসবে, এটাই স্বাভাবিক। আমরা যদি একটি সুস্থ-সুন্দর ভবিষ্যৎ প্রজš§ কামনা করি, তবে খাদ্যে ভেজাল বন্ধ করতে হবে এবং জনগণকে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। সমাজ থেকে এই ভেজালযুক্ত খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করতে হলে সমাজের সকল পক্ষের মিলিত কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এখন সেই পদক্ষেপগুলো নিয়ে আলোকপাত করা যাক।

প্রথমত, সরকারকে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ভেজাল খাদ্য প্রতিরোধে যে আইন আছে, সেটার কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে। কিংবা এই আইনে যদি কোনো ফাঁকফোকর থাকে তবে সেটা বিশ্লেষণ করে আইন সংশোধন করতে হবে। কারণ আমরা দেখি যে, এই অভিযোগে যারা গ্রেপ্তার হয় তারা বিভিন্ন সময়ে জামিনে মুক্ত হয়ে বের হয়ে আসে এবং আবারও সেই একই কাজে লিপ্ত হয়ে যায়। এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। তাছাড়া ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে বাজারগুলোয় নিয়মিত টহল দেওয়াতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতকে আরও কার্যকর করতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ীদের জেল-জরিমানার পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে। আমরা লক্ষ করি যে, সাধারণত বড় কোনো উৎসবের আগে এই ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এটা পুরা বছর অব্যাহত রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, যারা ভেজাল খাদ্য বিক্রি করে সেই অসাধু ব্যবসায়ীদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। সমাজে তারা যাতে এরকম অবৈধ পন্থায় ব্যবসায় করতে না পারে ,সেটার ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে। তাদের কাছ থেকে কোনো খাদ্যদ্রব্য কেনা যাবে না। তারা যদি কম মূল্যেও খাদ্য বিক্রি করে তবুও তাদের কাছ থেকে কোনো কিছু কেনা যাবে না। তাদের চিহ্নিত করে সমাজে কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে, যাতে মানসম্মান বা জীবন রক্ষার তাগিদে হলেও ভেজাল খাদ্য বিক্রি বন্ধ করে।

তৃতীয়ত, আমাদের সমাজের বণিক সমিতিকে এ বিষয়ে আরও কার্যকর হতে হবে। তাদের মধ্যে যারা ভেজাল খাদ্য বিক্রি করে তাদের চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে। তাদের কোনো ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করা যাবে না। তাদের জন্য কোনো ব্যবসায়িক পরিবেশ দেওয়া যাবে না। সমিতির নেতাদের জনগণের কথা মাথায় রেখে ব্যবসা করতে হবে। কম মুনাফা হলেও জনগণ যেন পরিপূর্ণ, সুস্থ খাদ্য পায়, সেদিকে তাদের খেয়াল রাখতে হবে। নিজেদের স্বার্থের আগে জনগণের স্বার্থ মাথায় রাখতে হবে।

চতুর্থত, জনগণকে এ বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। তাদের চারপাশে যদি কোনো অসাধু ব্যবসায়ী থেকে থাকে, তবে তাকে আইনের হাতে তুলে দিতে হবে। তাদের যেকোনো ধরনের সহায়তা করা বন্ধ করতে হবে। অনেক সময় আমাদের সমাজে দেখা যায়, মানুষ যেটা সবচেয়ে কম দামে পায় সেটাই কেনে। অর্থাৎ মানুষ সবসময় সস্তার জিনিস খোঁজে। আর অসাধু ব্যবসায়ীরা এটার সুযোগ নিয়ে ভেজাল বা নকল পণ্য কম দামে বিক্রি করে অধিক মুনাফা লাভ করে। তাই জনগণকে সবসময় সজাগ থাকতে হবে। কম দামে পণ্য পেলেই সেটা না কিনে যাচাই-বাছাই করে কিনতে হবে।

পঞ্চমত, সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সভা-সেমিনার, টিভিতে বিজ্ঞাপন বা পাঠ্যপুস্তকে ভেজালবিরোধী পাঠ্যক্রম যুক্ত করতে হবে। দেশের প্রতিটি থানা, উপজেলা ও জেলায় সভা-সেমিনার করতে হবে। ভেজালের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরতে হবে এবং জনগণকে এ বিষয়ে সাবধান করতে হবে। টিভিতে সরকারিভাবে ভেজালবিরোধী বিজ্ঞাপন দিতে হবে। সংবাদপত্রে এ বিষয়ে নিয়মিত লেখালেখি করতে হবে। আর পাঠ্যপুস্তকে ভেজাল সম্পর্কে পাঠ্যক্রম যুক্ত করতে হবে। তাতে শিক্ষার্থীরা বিষয়টা পড়বে এবং অল্প বয়স থেকেই এ বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করবে। শিক্ষকদের দায়িত্ব নিয়ে ভেজাল সম্পর্কে জ্ঞান দিতে হবে।

ষষ্ঠত, নিজেদের মাঝে ধর্মীয় মূল্যবোধ, পারিবারিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ ব্যক্তি নিজে যদি সঠিক পথে না আসে, তবে দেশে যতই আইন থাকুক না কেন সে ঠিকই এর ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে আসবে। তাই আমাদের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। কারণ কোনো ধর্মই অনৈতিক ও অবৈধ কাজ করতে বলে না। সব ধর্মেই নৈতিকতার কথা বলা হয়েছে। ইসলাম ধর্মের লোকজন পরকালের কথা ভেবে হলেও এসব ভেজাল কাজ থেকে বিরত থাকবে। পারিবারিক মূল্যবোধ বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ পরিবারে যদি সঠিক জ্ঞান দেওয়া হয়, তবে সে কখনও খারাপ পথে যাবে না। ছোট থেকেই একটা বাচ্চাকে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান দিতে হবে। তাহলে বড় হলে সে ব্যবসায়ী হলেও ভেজাল থেকে দূরে থাকবে।

আমাদের বর্তমান সমাজে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হচ্ছে ভোক্তা অধিকার। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ সঠিক মূল্যে পণ্যটি পাচ্ছে কি না এ বিষয়টা নিশ্চিত করা। অনেক সময় দেখা যায়, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মূল্য মানা হয় না। বিক্রেতারা অধিক মুনাফার আশায় ইচ্ছামতো মূল্য বাড়িয়ে দেয়। এতে ক্রেতাদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়। ভোক্তা অধিকারের এ বিষয়টা দেখভালের জন্য বাংলাদেশ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ আছে। তারা নিয়মিত বাজারে টহল দেয়। কিন্তু তবুও সমাজে এর বিস্তার কমছে না। প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় অধিক মূল্যে পণ্য বিক্রির অভিযোগ আসে। ভোক্তা সংরক্ষণ পরিষদে এ বিষয়ে নিয়মিত অভিযোগ আসে এবং আশাজনক এটা যে, এসব অভিযোগের সুষ্ঠু সমাধানও হচ্ছে। অর্থাৎ জনগণ সচেতন হচ্ছে। আগে মানুষ ঠকলেও সেভাবে প্রতিবাদ করত না। কিন্তু এখন মানুষ প্রতিবাদ করছে, অভিযোগ দায়ের করছে এবং জরিমানার পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সেই অনুসারে ভোক্তার অধিকার পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। অর্থাৎ সবাই তো এটার প্রতিবাদ করছে না। সরল ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করে অসাধু ব্যবসায়ীরা রাতারাতি অধিক মুনাফা অর্জন করে ধনী হয়ে যাচ্ছে। আর গরিব মানুষেরা নিয়মিত প্রতারিত হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটাতে হবে। বাজার ব্যবস্থার আরও আধুনিকায়ন করতে হবে। যেখানে-সেখানে অবৈধভাবে যেন কোনো দোকান না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোর প্রতি কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে, কারণ অনেকে অস্থায়ীভাবে দোকান গড়ে অধিক লাভ করে অন্যত্র চলে যায়। সরকারি নীতিমালা আরও জোরদার করতে হবে। আইনের সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে। ভোক্তা অধিকারের বিষয়টা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ভোক্তা যেন কোনোভাবে প্রতারিত না হয় সেদিকে আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে। আবার ভোক্তা যদি প্রতারিত হয়, তবে সে যেন দ্রুততার সঙ্গে সঠিক জায়গায় অভিযোগ দায়ের করতে পারে আর তার অভিযোগেরও যেন সঠিক সমাধান হয়, সে বিষয়ে দৃষ্টি রাখতে হবে।

আমাদের সবার মনে রাখা উচিত, আমরা একটি সভ্য সমাজের মানুষ। বাঙালি সভ্যতা অনেক উঁচু মানের সভ্যতা। আমাদের ইতিহাস সংগ্রামের। যুদ্ধ করে, মহান আত্মত্যাগ করে আমরা পেয়েছি এই স্বাধীন রাষ্ট্র। তাই এই মহান রাষ্ট্রের জনগণ হয়ে আমরা যদি ভেজালকে প্রশ্রয় দিই, ভোক্তা অধিকারকে খর্ব করি, তবে সেটা হবে অনেক বড় অন্যায়। খাদ্যে ভেজাল দেয়ার মতো এত বড় অপরাধ মনে হয় আর হয় না। কারণ এটার সঙ্গে মানুষের জীবন জড়িত। এটার গুরুত্ব অনেক বলেই প্রতিবছর ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস হিসেবে পালিত হয়। প্রতিটা দেশে এদিন সভা, সেমিনারসহ আরও অনেক আয়োজন হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ফরমালিনযুক্ত খাবার খেলে শিশুদের প্রতিবন্ধী হওয়ার শঙ্কা থাকে অনেক। একটি জাতিকে বিকলাঙ্গ করে ফেলে এই ভেজাল। এটি হচ্ছে একটি সুপ্ত জীবননাশক বিষ, যেটা আপনাকে একটু একটু করে শেষ করে দেবে। তাই ভেজাল থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি কৃষকদেরও ন্যায্যমূল্য দিতে হবে এবং ব্যবসায়ীদেরও সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে, যেন তারা ভেজালের পথে না যায়। সুস্থ-সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে ভেজালকে দূর করতে হবে। কোনো দেশপ্রেমিক এই ভেজালের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে না। যারা ভেজালের সঙ্গে সম্পর্কিত তারা দেশের শত্রু, রাষ্ট্রের শত্রু। আর এসব শত্রুদের কাছ থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। ভোক্তাকে সঠিক মূল্যে পণ্য ক্রয়ের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। ভেজালমুক্ত সমাজই পারে যেকোনো একটি দেশকে মেধাবী প্রজš§ উপহার দিতে। তাই আমাদের সেøাগান হওয়া উচিতÑ‘ভেজালকে পরিহার করি, সুস্থ-স্বাভাবিক দেশ গড়ি।’

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]