মত-বিশ্লেষণ

নিরাপদ বসতি সবার অধিকার

লিপিকা আফরোজ: বর্তমান বিশ্বের জনসংখ্যা ৭০০ কোটির কিছু বেশি। এর মধ্যে ১০ কোটি মানুষ আশ্রয়হীন এবং ১৬ কোটি মানুষের আশ্রয় সমস্যাযুক্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ। সম্প্র্রতি মিয়ানমার সামরিক বাহিনী কর্তৃক সে দেশের রাখাইন রাজ্যে ব্যাপক নির্যাতন ও গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে। অন্যদিকে আসামের নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাসস্থান সংকটের আশঙ্কায় রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশে ছিন্নমূল, আশ্রয়হীন ও ভবঘুরে মানুষ তো রয়েছেই। আরও রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বিপুল জনগোষ্ঠীর আশ্রয়হীন হওয়ার আশঙ্কা। সব মিলিয়ে বাসস্থানের সংকট বর্তমান বিশ্বে একটি বড় সমস্যা। এ সমস্যা অতীতেও কমবেশি ছিল এবং ভবিষ্যতেও যে থাকবে না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। সংকট সমাধানে তাই সবার সমন্বিত উদ্যোগ এবং আন্তরিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন এখনই।
বসতি বলতে আমরা বুঝি ভূ-পৃষ্ঠের কোনো স্থানে মানুষের তৈরি ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, গৃহের গঠন প্রভৃতির সমন্বিত কাঠামোকে। প্রাচীনকালে মানুষ ঝড়বৃষ্টি, বন্যপশুর আক্রমণ প্রভৃতি থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য পাহাড়ের গুহা বা বৃক্ষকোটরে বসবাস করত। কালক্রমে মানুষ বাঁশ ও কাঠ দিয়ে ঘর তৈরি করে দলবদ্ধভাবে বসবাস করতে থাকে। সভ্যতা বিকাশের পথ ধরে মানুষ ইট, পাথর, রড, সিমেন্ট ইত্যাদির সমন্বয়ে পাকা দালান নির্মাণ করতে শেখে। পাশাপাশি বাঁশ, কাঠ, ছন, গোলপাতা প্রভৃতি উদ্ভিদ জাতীয় উপকরণের ঘরবাড়ির প্রচলনও থেকে যায় নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজে। নির্মাণশৈলী বা উপকরণ যাই হোক না কেন পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদে নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারাই মানুষের একমাত্র উদ্দেশ্য। খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ও শিক্ষার পাশাপাশি বাসস্থানের ব্যবস্থা মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার এবং এ অধিকার বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, এ দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের প্রাপ্য।
শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই বাসস্থান মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। এই স্বীকৃত মৌলিক অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করা পৃথিবীর অনেক দেশের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এমনকি অনেক উন্নত দেশও নাগরিকদের বাসস্থানের শতভাগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেনি। এই প্রেক্ষাপটে সবার জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য পরিবেশে আবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘ প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার বিশ্ব বসতি দিবস হিসেবে উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯৮৬ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। এ বছর ৭ অক্টোবর দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। (ঋৎড়হঃরবৎ ঞবপযহড়ষড়মরবং ধং ধহ রহহড়াধঃরাব ঃড়ড়ষ ঃড় ঃৎধহংভড়ৎস ধিংঃব ঃড় বিধষঃয) বাংলায় যার অর্থ করা হয়েছে, ‘বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার।’
বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এক লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বসবাস। এই স্বল্প আয়তনের দেশে বিপুল জনগোষ্ঠীর নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য নানামুখী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। নদীভাঙন কিংবা অন্য কোনো কারণে আশ্রয়হীন মানুষের পুনর্বাসনের জন্য সরকার আশ্রয়ণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ওই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষে এখন এর দ্বিতীয় পর্যায় অর্থাৎ আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প চলমান রয়েছে।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার চার হাজার ৫৩টি ব্যারাক নির্মাণ করে তাতে মোট ২২ হাজার ৪০টি পরিবারের বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছে। এছাড়া আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের মাধ্যমে এক লাখ ৪৩ হাজার ৭৭৭টি পরিবারকে সরকার তাদের নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। এসব প্রকল্প গ্রামে শুধু বাসস্থানের ব্যবস্থা নয়, অভ্যন্তরীণ রাস্তা নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, ঘাটলা নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ ও বিদ্যুৎ সংযোগও প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া এসব প্রকল্প গ্রামে বসবাসকারীদের বিভিন্ন আয়বর্ধক কার্যক্রমের প্রশিক্ষণ ও ঋণদানের ব্যবস্থা করেছে সরকার।
রাজধানী ঢাকা শহরের আবাসন সংকট নিরসনের লক্ষ্যে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প, উত্তরা ৩য় পর্বে উত্তরার ১৮নং সেক্টরে ২১৪ একর জমিতে ১৫ হাজার ৩৬টি, ঝিলমিল রেসিডেন্সিয়াল পার্কে ৮৫টি বহুতল ভবনে ১৩ হাজার ৭২০টি ফ্ল্যাট এবং গুলশান, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া ও ধানমন্ডি এলাকার ৯টি পরিত্যক্ত বাড়িতে বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ করছে সরকার। এছাড়া ঢাকার ইস্কাটনে গ্রেড-১ কর্মকর্তাদের জন্য ৩টি ২০ তলা ভবনে ১১৪টি ফ্ল্যাট, মালিবাগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৪৫৬টি ফ্ল্যাট এবং গুলশান, বনানী ও মোহাম্মদপুরে অন্য ২০টি পরিত্যক্ত বাড়িতে ৩৯৮টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করছে সরকার।
ঢাকার মিরপুরে (সেকশন-১১) বস্তিবাসীদের জন্য ৫৩৩টি, মিরপুরের ৯নং সেক্টরে মধ্যম আয়ের লোকদের জন্য এক হাজার ৪০টি, লালমাটিয়া নিউ কলোনিতে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ১৫৩টি, মোহাম্মদপুর এফ ব্লকে সীমিত আয়ের লোকদের কাছে বিক্রির জন্য ৯০০টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করছে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন আট শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে এই সুবিধা ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং শিগগিরই তা রাজধানী ঢাকা শহরে ২১ দশমিক ১৮ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করা যায়।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত দেশগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। আর্থিক অসঙ্গতির কারণে আশ্রয়হীন মানুষের সঙ্গে বন্যা, ঝড় বা নদীভাঙনের কারণে বাসস্থানের সংকট সৃষ্টি হয় প্রতি বছর। তাছাড়া অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প কিংবা জলোচ্ছ্বাসের কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষের ঘরবাড়ি। এসব দুর্যোগকালীন সময়ের জন্য সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নগদ টাকা, খাদ্যসামগ্রী ও গৃহনির্মাণ সামগ্রী দিয়ে সাহায্য করে থাকে।
অতি সম্প্র্রতি মিয়ানমার সেনাবাহিনী সে দেশের রাখাইন রাজ্যে ব্যাপক নির্যাতন ও গণহত্যা চালায়। এর প্রেক্ষিতে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা জনগণ বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশে এই বাড়তি ১০ লাখ লোকের আশ্রয়-অবাসনের ব্যবস্থা করা ছিল অত্যন্ত দুরূহ কাজ। কিন্তু বিশ্বমানবতা রক্ষায় কোমলমতি বাঙালি জাতি এবং এদেশের প্রধানমন্ত্রী সাফল্যের সঙ্গে তাদের আশ্রয় ও আবাসনের ব্যবস্থা করে, যা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসিত হয়।
যেখানে জনবসতি, সেখানেই মানুষের দৈনন্দিন কাজে সৃষ্টি হয় উচ্ছ্বিষ্ট ও আবর্জনা। জনবসতিকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য করতে হলে বাড়িঘর নির্মাণের পাশাপশি সুপেয় পানি, পয়োনিষ্কাশন, রাস্তাঘাট নির্মাণ ও আধুনিক সভ্যতার বিভিন্ন উপকরণের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। পয়োনিষ্কাশন ও আবর্জনা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে বাসস্থান অস্বাস্থ্যকর, অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। আধুনিক নগরায়ণের পূর্বশর্ত পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। বিপুল জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন কার্যে উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ বর্জ্যরে সঠিক ব্যবস্থাপনা যে কোনো শহর, দেশ বা সরকারের জন্যই অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। গৃহস্থালি কাজের বর্জ্যরে পাশাপশি শিল্পকারখানায় উৎপন্ন ও মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জরুরি। বিশাল জনগোষ্ঠীর উৎপন্ন বিপুল বর্জ্যকে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো সম্ভব। ইতোমধ্যে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে আবর্জনা থেকে জৈবসার, বিদ্যুৎ এবং বায়োগ্যাস উৎপাদন শুরু হয়েছে। রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে আবর্জনাকে পরিবেশবান্ধব উপায়ে পরিবেশেই স্থানান্তর সম্ভব। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (ঝউ)ে-এর ১১ নং টার্গেট অনুযায়ী নিরাপদ, সহনশীল, সমন্বিত ও টেকসই নগরায়ণের জন্য আবর্জনা ও বর্জ্যকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। আর মানবকল্যাণে আবর্জনা ও বর্জ্যরে সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই করতে হবে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এবারের বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাসস্থান মানুষের মৌলিক অধিকার। এ অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিটি রাষ্ট্র ও সরকারের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি প্রতিটি নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে নিজ বাসস্থানকে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ রাখার। সরকার ও জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতায় বিশ্বের সব নাগরিক নিরাপদ বাসস্থানে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করুক, বিশ্ব আবাসন দিবসে এমন প্রত্যাশা সবার।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..