চট্টগ্রাম ব্যুরো : রমজানের প্রথম পাঁচ দিন অতিবাহিত হলেও বন্দরনগর চট্টগ্রামে রান্নাঘরে স্বস্তি ফেরেনি। একদিকে নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম, অন্যদিকে পাইপলাইনের গ্যাসের তীব্র সংকট-এই দুয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট নগরবাসী। বিকল্প হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর ভরসা করতে চাইলেও সেখানে চলছে অরাজকতা। সরকার নির্ধারিত দামকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিটি সিলিন্ডারে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা অতিরিক্ত বাড়িয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু চক্র, যা মধ্যবিত্তের পকেটে যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পবিত্র রমজান শুরুর পর থেকে বন্দরনগরের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বাকলিয়া, চকবাজার, হালিশহর, বহদ্দারহাটসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাস যেন ‘সোনার হরিণ’। দিনভর লাইনে গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবারকে সেহরির রান্না করতে হচ্ছে মাঝরাতে, অথবা চড়া দামে বাইরের খাবার কিনে ইফতার সারতে হচ্ছে। গৃহিণীদের অভিযোগ, ইবাদত-বন্দেগির এই মাসে রান্নাঘরের চিন্তা আর বাড়তি খরচের চাপে উৎসবের আমেজটুকুও হারিয়ে গেছে। চকবাজারের বাসিন্দা নিতু চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রোজার আগেই শুরু হয়েছিল গ্যাসের সমস্যা। এরপর এলপিজি দিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছিলাম। এখন চুলায় গ্যাস নেই, এলপিজির দাম আকাশছোঁয়া। বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছি। এখন গ্যাস বিলও দেব, আবার বাড়তি বিদ্যুৎ বিলও গুনব।’
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩৫৬ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে তা ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকার কমে মিলছে না। নগরের ষোলশহর, ২ নম্বর গেট, চকবাজার, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, আগের তুলনায় দোকানে সিলিন্ডারের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই। ব্যবসায়ীরা সরবরাহ সংকটের অজুহাত দিলেও ভোক্তাদের প্রশ্নÑ সরকার নির্ধারিত মূল্যের সুফল কেন সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না?
বহদ্দারহাট এলাকার বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স সালাউদ্দিন ট্রেডিংয়ে প্রতিদিন দুই শতাধিক সিলিন্ডারের চাহিদা থাকে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান মিলছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মোহাম্মদ সেলিম জানান, ১২ কেজির সিলিন্ডার পরিবেশকের কাছ থেকে তাকে কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। বিক্রি করছেন ১ হাজার ৬০০ টাকায়। অথচ সরকার নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। তার ভাষ্য, এ দামে কোথাও বিক্রি হচ্ছে না। পরিবেশক পর্যায়ে দাম না কমলে খুচরা পর্যায়ে কমানো সম্ভব নয়।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গত বছরের শুরুতে কয়েকটি কোম্পানি আমদানি করলেও শেষ দিকে অনেকেই আমদানি কমিয়ে দেয়। সেই ঘাটতির প্রভাব পড়ে বাজারে। হঠাৎ সংকটে পড়েন গ্রাহকরা। এলপিজি পরিবেশক সমিতির সভাপতি খোরশেদুর রহমান জানান, শহরে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা রয়েছে। এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ ঘাটতি আছে। তার দাবি, সরবরাহ বাড়লেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নিয়ে বাড়তি দাম নিচ্ছেন।
তবে ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক দোকানে সিলিন্ডার থাকলেও চাহিদার তুলনায় কম। দর-দামের সুযোগ থাকে না। ক্রেতা বেশি, পণ্য কম- এই বাস্তবতায় বাড়তি দাম যেন অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। নগরের বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা নাইমুর হাসান বলেন, ‘গত শনিবার ১ হাজার ৭০০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনেছি। দোকানে সিলিন্ডার ছিল অল্প। দাম কমানোর কথা বলার সুযোগই পাইনি।’
দেওয়ানহাটের বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বাসার পাশে সিলিন্ডার না পেয়ে এক কিলোমিটার দূরের দোকান থেকে কিনেছেন। ১২ কেজির সিলিন্ডারে তাকেও ২০০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। আগ্রাবাদ, হালিশহর, মুরাদপুর, জামালখানসহ বিভিন্ন এলাকার অন্তত ১৫ জন গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় সবাইকে অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৩০০ টাকা গুনতে হয়েছে। কোথাও কোথাও দাম আরও বেশি।
দোকানিরাও স্বস্তিতে নেই। একদিকে ক্রেতার চাপ, অন্যদিকে পরিবেশকের বাড়তি দরÑ এই দুইয়ের মধ্যে পড়েছেন তারা। ষোলশহর এলাকার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সোহেল বলেন, ‘ক্রেতারা মনে করেন, আমরা বেশি নিচ্ছি, কিন্তু পরিবেশকের কাছ থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকার পাঁচজন খুচরা বিক্রেতা জানান, যে পরিমাণ সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে দোকানভাড়া ও শ্রমিকের খরচই কষ্টে ওঠে। মুনাফা কমেছে। তবু বাড়তি দাম রাখার দায় তাদের ঘাড়েই পড়ছে।
দেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৭ লাখ টন। বাজারটি পুরোপুরি বেসরকারি আমদানি-নির্ভর। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ৫২টি। এর মধ্যে ৩২টি কোম্পানির নিজস্ব প্ল্যান্ট রয়েছে। আমদানির সক্ষমতা আছে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের। তবে গত বছর কোনো না কোনো মাসে আমদানি করেছে ১৭টি কোম্পানি। আর নিয়মিত আমদানি করেছে
মাত্র ৮টি। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে সরকার গত ১৬ ফেব্রুয়ারি পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৩০ জুন পর্যন্ত উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং আমদানি পর্যায়ে ২ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহার করেছে। উদ্দেশ্য ছিল বাজার স্থিতিশীল রাখা। তবে মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান নয়।
এলপিজি সিলিন্ডারের বাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকির অভাবকেই দায়ী করেছে ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণকারী সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, অতীতেও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দাম নির্ধারণ করলেও খুচরা বাজারে ভোক্তাদের বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। তার অভিযোগ কাগজে-কলমে মূল্য নির্ধারণ করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়েছে; বাস্তবে নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে কি-না, তা তদারকির বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা বা কার্যকর নজরদারি দেখা যায়নি।
মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় ও বাজার পর্যবেক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। ফলে বড় এই জ্বালানি খাতে সাধারণ ভোক্তারা ধারাবাহিকভাবে চাপে পড়ছেন, কিন্তু প্রশাসনিক তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। এলপিজি সিলিন্ডারের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের সুস্পষ্ট ও কার্যকর উদ্যোগ থাকলে পরিস্থিতি এতদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত থাকত না। সমস্যাটি নতুন নয়; দীর্ঘ সময় ধরে একই অভিযোগ উঠে আসছে। আশা করছি, নতুন সরকারের সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এলপিজি বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। তবে এখন পর্যন্ত ভোক্তাদের জন্য অপেক্ষা ছাড়া দৃশ্যমান কোনো বিকল্প নেই।
অন্যদিকে পরিবেশক প্রতিষ্ঠান আলী অ্যান্ড সন্সের কর্ণধার আয়ুব আলী চৌধুরী জানান, আমদানি কম হওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে খরচ ওঠে না বলেই অনেককে বাড়তি দাম রাখতে হচ্ছে। তার দাবি, বাজার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। ১০ রোজার মধ্যেই দাম কমে আসবে।
পাইপলাইনের গ্যাস সংকট ও এলপিজির বাড়তি দামের চাপে রমজানে নগরবাসীর ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করতে তদারকি জোরদার না হলে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন ভোক্তারা।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post