প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক সংঘাত নয়, চাই সমঝোতা

মো. আতিকুর রহমান: দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর হীন স্বার্থের বেড়াজালে বন্দি সাধারণ মানুষ। সমঝোতার বিপরীতে সরকার ও বিরোধী দলের কর্মসূচি ও পাল্টা কর্মসূচি এবং নতুন নতুন প্রস্তাবে অনিশ্চয়তার মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। আগামী ১০ ডিসেম্বর ঘিরে রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত হওয়ার শঙ্কা করা হচ্ছে, যা কাম্য নয়।

এর ফলে সাধারণ জনগণের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েই চলছে। এই ধরনের উদ্বেগের অবসান হওয়াটা অনেক জরুরি বলে মনে করি।

যদিও বাস্তবতা, এদেশের অধিকাংশ মানুষ জানে না সংবিধান কী, সংবিধান সংশোধন কী? এসব বিষয় নিয়ে তাদের তেমন কোনো মাথাব্যথাও নেই। তারা কেউ ক্ষমতায়ও যেতে চায় না; শুধু চায় একটু সুখ, শান্তি ও স্বস্তিতে কাজকর্ম করে বেঁচে থাকার স্বস্তিদায়ক সুন্দর পরিবেশ। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো দেশে অচলাবস্থার সৃষ্টি করে মানুষের সুখ-শান্তি ও স্বস্তি বিনষ্ট করার মতো কর্মসূচি এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তি প্রদর্শন কাম্য হতে পারে না। ভাবতে কষ্ট লাগে, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের জনগণের সেবক হিসেবে জাহির করলে এবং জনগণের জানমালের রক্ষার নিশ্চয়তা দিলেও পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে সাধারণত মানুষকে বলির পাঁঠা বানাচ্ছে, যা হীন রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করি। জানি না সামনের দিনগুলোয় এহেন রাজনৈতিক সংঘাতে আর কত নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাবে! এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সংঘাত-সংঘর্ষের শিকার হয়ে যারা মারা যাচ্ছে, তাদের দায়ভারই বা কে নেবেÑসরকার না বিরোধী দল, প্রশ্ন রইল।

রাজনৈতিক সমঝোতার বিপরীতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার যে বিষয়টি শঙ্কা করা হচ্ছে, তা উদ্বেগজনক। নির্বাচনকালীন সরকার, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনসহ (ইভিএম) বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এ সংকট নিরসনে দুই দলের মধ্যে আলোচনা বা সংলাপ জরুরি হলেও এর কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না; বরং নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সমান্তরালে দল দুটির মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়ছে, যা মোটেই কাম্য নয়। এ পরিস্থিতি রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত, তা বলাই বাহুল্য। বলার অপেক্ষা রাখে না, পরিস্থিতির উন্নয়ন না ঘটলে রাজপথ উত্তপ্ত হওয়ার পাশাপাশি রাজধানীসহ সারাদেশে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে মানুষের জানমালের ক্ষতি ছাড়াও অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা দেশ তথা জনগণ কারও জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে দলগুলোকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করি আমরা।

অতীতে বিভিন্ন বিষয় ও ক্ষমতার পালাবদলের প্রেক্ষাপটে দেশে সহিংস রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি ও মাসের পরপর হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালনকালে সহিংসতায় বহু প্রাণহানি ছাড়াও দেশজুড়ে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে যে ব্যাপক ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সম্পদহানি হয়েছিল, এ সবকিছুর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল অর্থনীতিতে। বর্তমানে নানা অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সীমিত সম্পদের এই দেশে আবারও যদি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তা হবে দুঃখজনক। এমনিতেই  করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে বিপর্যস্ত অর্থনীতি মধ্যে যদি রাজনৈতিক সহিংসতা শুরু হয়, তবে দেশ ও জনগণ এর ধকল কতটা মোকাবিলা করতে পারবে, এ প্রশ্ন বিবেচনায় নিয়ে মানুষের জানমালসহ অর্থনীতির ক্ষতি এড়াতে রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধের জন্য রাজনৈতিক নেতাদের সুস্থ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অধিক মনোনিবেশ করতে হবে। ভাবতে হবে, আমরা কি শুধু সাংবিধানিকভাবে বৈধ একটি সরকার চাই, নাকি দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই, নাকি দেশ ও জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ চাই।

এর আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দেশে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে বিরোধী দল, বিশেষ করে বিএনপির সহায়তা চাওয়ার পাশাপাশি এমন নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তোলার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করা হয়েছিল, যাতে নির্বাচনে সহিংস পরিবেশ সৃষ্টি না হয়। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকেও সংলাপের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আহ্বান এবং সবার সঙ্গে কথা বলে সমস্যার সমাধান করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের কর্মসূচিতে বাধা না দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশ অবশ্যই ইতিবাচক; তবে নির্দেশটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। বস্তুত আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যে কোনো সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণই শ্রেয়। সমস্যাগুলো যদি আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা যায় এবং সেখানে সমাধানের পথ খোঁজা হয়, তাহলে দেশের রাজনীতিতে সংঘাত, সংঘর্ষ ও নৈরাজ্য হ্রাস পাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দেশ শুধু রাজনৈতিক হানাহানির কারণে পিছিয়ে থাকবে, তা কারও জন্য কাম্য হতে পারে না।

অনেকে মনে করেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার সম্পর্ক শত্রুতায় পর্যবসিত হওয়ায় গণতন্ত্র ও দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি হুমকির মুখে পড়েছে। আমরা দেখছি, গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশের দুই বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে বৈরী সম্পর্ক চলছে, তা দেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে। দেশে সমঝোতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হলে এ অবস্থার অবসান ঘটবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশোধপরায়ণতার রাজনীতি পরিহার করে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করবে, এটাই প্রত্যাশা জনগণের। সেই পথেই রাজনৈতিক দলগুলি হাঁটবে, এমনটাই কাম্য।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত ৯ মাসে দেশে রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে মোট ৩৮৭টি। এতে নিহত হয়েছেন ৫৮ জন এবং আহত হয়েছেন পাঁচ হাজার ৪০০ জন। এ পরিসংখ্যান সঠিক হয়ে থাকলে তা উদ্বেগজনক বৈকি। আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় নির্বাচনসহ রাজনৈতিক কারণে দেশের প্রায় সব জেলায় এসব সহিংস ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে, বিশেষ করে আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তেমনটি ঘটলে তা হবে দেশ ও জনগণের জন্য অশুভ ও অকল্যাণকর, যা বলাই বাহুল্য। বস্তুত এরই মধ্যে এ লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় উভয় দলের রাজনীতিকদের শুভবুদ্ধির উদয় হওয়া জরুরি।

বর্তমানে বিশ্ব একটি অর্থনৈতিক সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। কোভিড পরিস্থিতি মোকাবিলার মধ্যেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে, এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণের অবকাশ নেই। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। অথচ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুভবুদ্ধি উদয়ের কোনো লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে না। বিষয়টি হতাশাজনক ও দুঃখজনক বলে মনে করি।

এমন এক পরিস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে যে কোনো সমস্যা সমাধানের রাজনৈতিক দলগুলোর দৃশ্যমান উদ্যোগকেই শ্রেয় বলে মনে করি আমরা। বস্তুত পরস্পরের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলো যদি আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা যায় এবং সেখানে সমাধানের পথ খোঁজা হয়, তাহলে রাজনীতিতে সংঘাত, সংঘর্ষ ও নৈরাজ্য হ্রাস পেতে বাধ্য। তবে আলোচনায় বসলে ‘বিচার মানি, কিন্তু তালগাছটা আমার’Ñদলগুলোর এহেন মনোভাব পরিহার করতে হবে।

যদিও অনেকে মনে করেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার সম্পর্ক বৈরিতায় পর্যবসিত হওয়ায় দেশে গণতন্ত্র ও উন্নয়ন হুমকির মুখে পড়েছে। গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশের দুই বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে বৈরী সম্পর্ক চলছে, তা দেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে। দেশে সমঝোতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হলে এ অবস্থার অবসান ঘটবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজনৈতিক দলগুলো যদি প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধপরায়ণতার রাজনীতি পরিহার করে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে উন্নয়ন আরও বেগবান হবে বলে মনে করি।

সবার মনে রাখতে হবে, সংঘাত-সহিংসতার পথ ধরে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে দেশে গণতন্ত্র বিপন্ন হতে পারে। আর এতে কেবল সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম এবং দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ সরকারের রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাছাড়া সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন উৎপাদনশীল খাত ও রপ্তানিমুখী শিল্প ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ায় এসব শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার শ্রমিকের ভাগ্য হয়ে পড়বে অনিশ্চিত। সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম না হলে বিনিয়োগ ও উন্নয়নে কাক্সিক্ষত সাফল্য আসবে না। এসব বিষয় মাথায় রেখে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে বৃহত্তর রাজনৈতিক দলগুলোকে সহনশীলতার পরিচয় দেখাতে হবে, যা জনগণ প্রত্যাশা করে।

আমরা মনে করি আগামী নির্বাচনমুখী সব ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতির অবসান ও উন্নয়নের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম বিরাজমান বিভাজন দূর করতে হবে। এজন্য আস্থা ও আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর যদি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস থাকে, তবে ‘বিচার মানি, কিন্তু তালগাছ আমার’Ñএ পথ পরিহার করতে হবে। অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আলাপ-আলোচনার মধ্যমে সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দ্রুত সমঝোতার পথে এগিয়ে যাবে বলেই প্রত্যাশা।

মুক্ত লেখক

সাবেক জনসংযোগ কর্মকর্তা, বিইউএফটি