নির্মাণকাজে দেওয়া ঋণ ৩৫ বছরে ফেরত নেবে অর্থ বিভাগ

পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন

ইসমাইল আলী: বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করা হচ্ছে পদ্মা সেতু। এতে ব্যয় হচ্ছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। তবে এ অর্থ অনুদান নয় বরং ঋণ হিসেবে সেতু বিভাগকে দিচ্ছে অর্থ বিভাগ। মূলত প্রতি বছর উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ ঋণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ঋণের এ অর্থ ৩৫ বছরে ফেরত দিতে হবে সেতু বিভাগকে। পাশাপাশি সুদ গুনতে হবে বছরে এক শতাংশ হারে।
অর্থ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আজ এ-সংক্রান্ত চুক্তি সই করবে সরকারের দুই বিভাগ। যদিও কোনো প্রকল্পে অর্থ বিভাগের ঋণ দেওয়ার এটিই প্রথম উদাহরণ। তাই ঋণের অর্থ ফেরত নেওয়ার ঘটনাও এটি প্রথম। তবে ঋণের প্রভাবে পদ্মা সেতুর টোলের হার বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যমতে, প্রাথমিকভাবে দাতাদের সহায়তায় পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। এজন্য ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে ঋণ চুক্তিও সই করা হয়। সে সময় প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকার চার হাজার ২৫৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা সরবরাহের কথা ছিল।
প্রকল্প ব্যয়ের বাকি ১৬ হাজার ২৪৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা বা ২৩৭ কোটি ডলার চার সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ১২০ কোটি ডলার, এডিবির ৬১ দশমিক ৫০ কোটি ডলার, জাইকার ৪১ দশমিক ৫০ কোটি ডলার ও আইডিবির ১৪ কোটি ডলার দেওয়ার জন্য কথা ছিল। বৈদেশিক এ ঋণের অর্থ সুদসহ পরিশোধ করতে হতো সেতু বিভাগকে। আর সরকারি তহবিল অনুদান হিসেবেই প্রদানের কথা ছিল।
যদিও দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগসহ নানা জটিলতায় দাতাদের ঋণ বাদ দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালে জুনে চূড়ান্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। তবে তিন বছর বিলম্বে নির্মাণ শুরু হওয়ায় দুই দফায় প্রকল্প ব্যয় বেড়ে গেছে প্রায় ৯ হাজার ৬৮৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা। তবে এখন পুরো প্রকল্প ব্যয়ই ঋণ দিচ্ছে অর্থ বিভাগ।
সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুতে প্রদত্ত এ ঋণ পরিশোধের উপায় নির্ধারণে ২০১৫ সালের জানুয়ারি অর্থ বিভাগকে অনুরোধ করে চিঠি দেয় সেতু কর্তৃপক্ষ। এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আহ্বানের অনুরোধ করা হয়।
সে সময় অর্থ বিভাগে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছিল, পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রাথমিকভাবে দাতা সংস্থার ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। তাদের ঋণের শর্ত, সুদের হার, পরিশোধ পদ্ধতি ও মেয়াদকাল নির্ধারিত ছিল। তবে দাতাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের পর সেতুটি নির্মাণে অর্থ বিভাগ ঋণ দিচ্ছে। এ ঋণ পরিশোধের কোনো শর্ত, মেয়াদকাল বা পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে ঋণ পরিশোধের প্রক্রিয়া নিয়ে ভবিষ্যতে জটিলতা দেখা দিতে পারে। জটিলতা এড়াতে পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থ বিভাগের প্রদত্ত ঋণ পরিশোধের পদ্ধতি নির্ধারণ করা দরকার। সে অনুপাতে সেতুটি উদ্বোধনের আগে সেতুর টোলের হারও পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। এজন্য অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আহ্বানের অনুরোধ করা হচ্ছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার মাধ্যমে সরকারের দুই বিভাগ সেতুটি নির্মাণে প্রদত্ত ঋণ পরিশোধের উপায় নির্ধারণ করে। এক্ষেত্রে ৩৫ বছরে সেতু বিভাগকে এ ঋণ পরিশোধ করতে হবে। আর ঋণের সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে এক শতাংশ। এজন্য দুই পক্ষ আজ চুক্তি সই করবে।
জানতে চাইলে সেতু বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে কোনো প্রকল্পে ঋণ প্রদানের এটিই প্রথম উদাহরণ। তাই অর্থ বিভাগকে ঋণ পরিশোধের উদাহরণও এটি প্রথম। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকে ঋণ পরিশোধ শুরু করা হবে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। আর আগামীতে বড় প্রকল্পে অর্থ বিভাগ অর্থায়ন করলে পদ্মা সেতুর মডেল অনুসরণ করা হবে।
সেতু বিভাগের তথ্যমতে, পদ্মা সেতু প্রকল্পের মূল অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১২ হাজার ১৩৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, নদী শাসনে আট হাজার ৭০৭ কোটি ৮১ লাখ ও এ দুই অংশের পরামর্শক ব্যয় ৩৮৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। আর মাওয়া ও জাজিরায় সংযোগ সড়ক নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে এক হাজার ২৯০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, সার্ভিস এরিয়া-২তে ২০৮ কোটি ৭১ লাখ ও এগুলোর পরামর্শক ব্যয় ১৩৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।
যদিও জমি অধিগ্রহণ, ভ্যাট ও কর হার বৃদ্ধি এবং নির্মাণ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে দুই দফা ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর বাইরে মাওয়া প্রান্তে নদী শাসনের আওতা বেড়ে যাওয়ায় সেক্ষেত্রে বাড়তি অর্থ ব্যয় হয়েছে। আর নকশা জটিলতার কারণে সেতুটির ২২টি পিলারে একটি করে পাইল বেড়ে গেছে। এছাড়া জাজিরা প্রান্তের ফেরিঘাট স্থানান্তরে ২০০ কোটি ব্যয় হবে। এতে আরেক দফা ব্যয় বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
সেতু বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, টোলের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সেতুর ঋণ পরিশোধ করছে সেতু বিভাগ। একইভাবে টোলের মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থ থেকে পদ্মা সেতুর ঋণও পরিশোধ করা হবে। এজন্য ২০১০ সালে সেতুটির বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের সময় প্রকল্প ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়। সে সময় আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে সেতুটিতে গাড়ি চলাচলের সম্ভাব্য সংখ্যাও নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি দাতাদের ঋণ পরিশোধ ও বঙ্গবন্ধু সেতুর টোলের হারের ওপর ভিত্তি করে পদ্মা সেতুর সম্ভাব্য টোলের হার নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে এখন সে প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, তিন বছর বিলম্বে কাজ শুরু করায় প্রকল্প ব্যয় বেড়ে গেছে। আর নির্মাণকাজ শেষ হতে বিলম্ব হওয়া ও নকশা জটিলতায় এ ব্যয় আরও বাড়বে। পাশাপাশি সেতুতে চলাচলকারী গাড়ির সংখ্যাও বাড়বে। এ অবস্থায় ঋণ পরিশোধের বার্ষিক পরিমাণের ওপর নির্ভর করবে টোলের হার। এসব বিষয়ে ভিত্তিতে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে টোলের হার পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। তবে প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে এখন টোলের হার বেশি হবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
উল্লেখ্য, গত বছর নভেম্বরে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে নকশা জটিলতায় তা সাত মাস বাড়িয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। তবে জুন পর্যন্ত কাজ হয়েছে মাত্র ৭১ শতাংশ। এজন্য বর্ধিত সময় শেষ হওয়ায় আগেই অতিরিক্ত ৩১ মাস সময় চায় পদ্মা সেতু নির্মাণে নিয়োজিত ঠিকাদার চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানি। এক্ষেত্রে ২০২১ সালের ২৬ জুন পর্যন্ত সময় চাওয়া হয়েছিল। যদিও ঠিকাদারের প্রস্তাব মেনে নেয়টি সেতু বিভাগ। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চিঠি চালাচালি চলছে।

 

সর্বশেষ..